Published : 22 Dec 2025, 10:43 AM
২০২৫ সালের চাকরির বাজারে কর্মী ছাঁটাই বড় এক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ফলে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে অনেক বড় বড় কোম্পানি।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘চ্যালেঞ্জার’ ও ‘গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাস’-এর তথ্য অনুসারে, এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫৫ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পেছনে দায়ী ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
২০২৫ সালজুড়ে মোট ১১ লাখ ৭০ হাজার কর্মী ছাঁটাই হয়েছে, যা ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারীর পর কর্মী ছাঁটাইয়ের সর্বোচ্চ সংখ্যা। ওই বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ২২ লাখ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছিল বিভিন্ন কোম্পানি।
চ্যালেঞ্জারের তথ্য অনুসারে, অক্টোবরে এক লাখ ৫৩ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়োগকর্তারা। নভেম্বরে ছাঁটাই হয়েছে ৭১ হাজারেরও বেশি কর্মী, যার মধ্যে ৬ হাজারেরও বেশি ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে এআইকে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে যখন মুদ্রাস্ফীতির কারণে নাভিশ্বাস উঠছে, শুল্কের কারণে খরচ বাড়ছে ও বিভিন্ন কোম্পানি ব্যয় কমানোর পথ খুঁজছে তখন এআই তাদের সামনে আকর্ষণীয় ও স্বল্পমেয়াদী সমাধান হিসেবে হাজির হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
‘ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ বা এমআইট’র নভেম্বরে এক গবেষণায় উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের ১১ দশমিক ৭ শতাংশ কাজ এখন এআই দিয়েই করা সম্ভব। ফলে অর্থায়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য পেশাদার খাতে বেতন বাবদ প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা যেতে পারে।
সবাই অবশ্য এমনটি মানতে রাজি নন যে, ব্যাপকহারে কর্মী ছাঁটাইয়ের পেছনে আসল কারণ কেবল এআই। ‘অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট’-এর এআই কর্মসংস্থান বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক ফ্যাবিয়ান স্টেফানি বলেছেন, বিভিন্ন কোম্পানির জন্য কর্মী ছাঁটাইয়ের কেবল একটি উসিলাও হতে পারে এআই।
“অনেক কোম্পানি যারা মহামারীর সময়ে খুব ভালো ব্যবসা করেছিল তারা তখন স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি কর্মী নিয়োগ করেছিল। ফলে বর্তমানের এসব ছাঁটাই আসলে কেবল এক বাজার সংশোধন বা বাড়তি কর্মী কমানোর প্রক্রিয়া হতে পারে।
“বিষয়টি অনেকটা এমন লোকদের চাকরি থেকে বের করে দেওয়া যাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা বা ভবিষ্যৎ ছিল না কোম্পানিগুলোর। এখন ‘আমরা দুই-তিন বছর আগে ভুল হিসাব করেছিলাম’ এমনটি স্বীকারের বদলে এখন দায় চাপানোর জন্য বলির পাঁঠা খুঁজে পেয়েছে তারা এবং বলছে ‘এসব কিছু এআইয়ের কারণেই হচ্ছে’।”
২০২৫ সালে যেসব বড় কোম্পানি নিজেদের ছাঁটাই ও পুনর্গঠন কৌশলের অংশ হিসেবে এআইয়ের কথা উল্লেখ করেছে সেসব কোম্পানির নাম দেখে নিন–
অ্যামাজন
অক্টোবরে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন ই কমার্স জায়ান্ট আমাজন। কোম্পানিটি নিজেদের কর্পোরেট পর্যায়ের ১৪ হাজার পদ বাদ দিয়েছে। কারণ নিজেদের ‘সবচেয়ে বড় লক্ষ্য’ বা প্রজেক্টগুলোতে বিনিয়োগ করতে চায় তারা, যার মধ্যে অন্যতম এআই।
মাইক্রোসফট
২০২৫ সালজুড়ে মোট প্রায় ১৫ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে মার্কিন সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফট। কোম্পানিটির সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুসারে, গত জুলাইয়ে ৯ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই তালিকায় রেখেছে তারা।
কোম্পানিটির সিইও সাত্যিয়া নাদেলা কর্মীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বার্তায় লিখেছেন, কোম্পানিকে ‘নতুন যুগের জন্য’ তাদের ‘লক্ষ্য বা মিশনকে নতুনভাবে সাজাতে’ হবে। এরপর ভবিষ্যতে এআইয়ের গুরুত্বের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন তিনি।
সেলসফোর্স
সেপ্টেম্বরে বিশ্বের অন্যতম ক্লাউড-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম সেলসফোর্স-এর সিইও মার্ক বেনিঅফ নিশ্চিত করেছেন, এআইয়ের সহায়তায় নিজেদের প্রতিষ্ঠান থেকে চার হাজার কাস্টমার সাপোর্ট কর্মীকে ছাঁটাই করেছে তারা।
“এই সংখ্যা নয় হাজার থেকে কমিয়ে পাঁচ হাজারে নামিয়ে এনেছি আমরা। কারণ আমাদের এখন কম জনবল প্রয়োজন।”
আইবিএম
বিশ্বের অন্যতম সুপরিচিত প্রযুক্তি কোম্পানি আইবিএম-এর সিইও অরবিন্দ কৃষ্ণা গত মে মাসে বলেছেন, তাদের মানবসম্পদ বিভাগের কয়েকশ কর্মীর জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে এআই চ্যাটবট।
নভেম্বরে বিশ্বজুড়ে তাদের মোট কর্মীর এক শতাংশ ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে কোম্পানিটি, যার ফলে প্রায় তিন হাজার কর্মী চাকরি হারাতে পারেন।
ক্রাউডস্ট্রাইক
এ বছেরের মে মাসে সাইবার নিরাপত্তা সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ক্রাউডস্ট্রাইক’ ঘোষণা করেছিল, নিজেদের মোট কর্মীর পাঁচ শতাংশ বা পাঁচশ কর্মীকে ছাঁটাই করছে তারা। এ ছাঁটাইয়ের সরাসরি এআইকে দায়ী করেছে কোম্পানিটি।
ক্রাউডস্ট্রাইক’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জর্জ কার্টজ সিকিউরিটিজ ফাইলিং-এর এক মেমোতে লিখেছেন, “সবসময়ই আমাদের পরিচালনার মূল ভিত্তি এআই। আমাদের কর্মী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তাকে কমিয়ে দিচ্ছে ও যে কোনো আইডিয়া থেকে দ্রুত পণ্য তৈরিতে আমাদের সাহায্য করছে এআই, যা আমাদের বাজারে পণ্য পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে সহজ, গ্রাহকদের জন্য আরও ভালো ফলাফল নিশ্চিত করছে। আমাদের পুরো ব্যবসার ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে এআই।”
ওয়ার্কডে
ফেব্রুয়ারিতে এ বছরের প্রথম কোম্পানির মধ্যে একটি হিসেবে নিজেদের মোট কর্মীর আট দশমিক পাঁচ শতাংশ ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে এইচআর প্ল্যাটফর্ম ‘ওয়ার্কডে’। ফলে প্রায় এক হাজার ৭৫০ জন কর্মী চাকরি হারান। এআইতে আরও বিনিয়োগের লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নিয়েছে কোম্পানিটি।
‘ওয়ার্কডে’-এর সিইও কার্ল এসচেনবাখ বলেছেন, এআইতে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে ও কোম্পানির প্রয়োজনীয় তহবিল ও সম্পদ খালির জন্যই এ ছাঁটাই জরুরি ছিল।