উদ্ভিদ ও প্রাণী যখন বেঁচে থাকার জন্য উপযোগী পরিস্থিতি বা পরিবেশ না পায় তখন এরা সুপ্তাবস্থা নামের ‘স্লিপ মোডে’ চলে যেতে পারে।
Published : 02 Apr 2025, 05:35 PM
আলো ও অক্সিজেন ছাড়াই বাল্টিক সাগরের কাদার গভীরে প্রায় সাত হাজার বছর কাটিয়ে দেওয়ার পর ক্ষুদ্র আকারের বিভিন্ন শৈবাল আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ‘স্কেলেটোনেমা ম্যারিনোই’ নামের প্রাচীন প্রজাতির এক শৈবাল হাজার হাজার বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে এবং এখনও এদের আধুনিক আত্মীয়দের মতোই এরা বেড়ে উঠতে ও সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে।
গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন ‘লিবনিজ ইনস্টিটিউট ফর বাল্টিক সি রিসার্চ ওয়ার্নমুন্ডে’ বা আইওডাব্লু-এর বিজ্ঞানীরা। ‘ফাইটোয়ার্ক’ নামে পরিচিত এক বড় প্রকল্পের অংশ হচ্ছে এ গবেষণা।
বাল্টিক সাগরের অতীতের ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন জীববৈচিত্র্যের ধরন অনুমান করতে, এর বাস্তুতন্ত্রের কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও গবেষণা এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তার ইতিহাসের দিকে নজর দেওয়ায় ‘ফাইটোয়ার্ক’ প্রকল্পের কাজ।
গবেষণার লক্ষ্য হচ্ছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের পরিবেশগত বিভিন্ন পরিবর্তন সমুদ্রকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে তা বোঝা।
ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে উদ্ভিদ ও প্রাণী পর্যন্ত অনেক জীবিত প্রাণী যখন বেঁচে থাকার জন্য উপযোগী পরিস্থিতি বা পরিবেশ না পায় তখন এরা সুপ্তাবস্থা নামের ‘স্লিপ মোডে’ চলে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
গবেষকরা বলছেন, এ সময় এরা নিজেদের বিপাককে ধীর করে দেয় এবং আরও ভাল সময়ের জন্য অপেক্ষা করে। এ ধরনের প্রাণীর মধ্যে রয়েছে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন। এরা সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে।
পানিতে বসবাসের সময় যখন এদের বেঁচে থাকার মতো পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে তখন বিশ্রামের জন্য কঠিন একটি স্তর তৈরি করে এরা। এসময় এরা পানির নীচে ডুবে যায় এবং শতাব্দী, এমনকি হাজার বছর ধরে সমুদ্রের গভীরে কাদায় সংরক্ষিত থাকতে পারে, বিশেষ করে অক্সিজেনবিহীন অঞ্চলে।
এ গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী সারাহ বলিউস বলেছেন, “এসব পলি অনেকটা টাইম ক্যাপসুলের মতো। এগুলোতে কেবল পুরানো কোষই নয়, বরং ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে পরিবেশগত পরিস্থিতি যেমন লবণাক্ততা, তাপমাত্রা ও অক্সিজেনের মাত্রা সম্পর্কেও সূত্র রয়েছে।”
এ গবেষণার জন্য বাল্টিক সাগরের ‘ইস্টার্ন গটল্যান্ড ডিপ’ নামে পরিচিত একটি এলাকায় সমুদ্রের ২৪০ মিটার গভীর থেকে কাদার নমুনা সংগ্রহ করেছেন গবেষকরা।
পলির এসব স্তর বাল্টিক সাগরের প্রায় সাত হাজার বছরের ইতিহাসকে ঢেকে রেখেছে। এসব স্তরের মধ্যে নয়টি স্তর থেকে পুরানো শৈবালকে পুষ্টি ও আলো দিয়ে ‘জাগিয়ে তুলতে’ পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। পুনরুজ্জীবিত এসব শৈবাল এদের আধুনিক প্রজাতির শৈবালের মতোই বেড়ে উঠেছে, বিভাজন ঘটেছে এমনকি সালোকসংশ্লেষণও করেছে।
বিস্ময়করভাবে এসব প্রাচীন শৈবাল প্রায় ছয় হাজার আটশ ৭১ বছর বয়সী ও এখনও বেশ সুস্থ অবস্থায় রয়েছে। আধুনিক প্রজাতির শৈবালের মতো একই হারে বেড়ে উঠেছে ও একই স্তরে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে অক্সিজেনও তৈরি করেছে এরা, যার থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, এরা এখনও পুরোপুরি কার্যকর।
জিনগত উপাদানের ছোট নমুনার সঙ্গে তুলনা করে পুনরুজ্জীবিত বিভিন্ন শৈবালের ডিএনএ নিয়েও গবেষণা করেছে গবেষণা দলটি। বিভিন্ন সময়কালের শৈবালের মধ্যে স্পষ্ট জিনগত পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।
তারা বলছেন, এর মাধ্যমে সহস্রাব্দ ধরে এসব প্রজাতি কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তারই ইঙ্গিত মিলেছে। গবেষণাটি আরও নিশ্চিত করেছে, গবেষণাগারে কাজ চলাকালীন এসব শৈবালের নমুনা দূষিত ছিল না।
এ ধরনের গবেষণাকে বলা হয় ‘পুনরুত্থান বাস্তুবিদ্যা’। যার মধ্যে প্রাচীন জীববৈচিত্র্যকে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে এরা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তা গবেষণার বিষয়টি জড়িত।
গবেষকরা বলছেন, এ ধরনের পুরানো শৈবালকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে সফলতা পাওয়ার ঘটনা বিরল।