Published : 31 Mar 2026, 02:32 PM
বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো গণছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে দায়ী করছে। আগে যেখানে অতিরিক্ত কর্মী বা খরচ কমানোর কারণ উঠে আসত, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে প্রযুক্তির দোহাই।
তবে এ অজুহাতের আড়ালে আসলে কি খরচ বাঁচানো নাকি বিনিয়োগকারীদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা চলছে, তা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিতে ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাই এখন বাৎসরিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তের পেছনে কেবল নির্বাহীদের দেওয়া ব্যাখ্যাগুলো বদলে গেছে।
আগে দক্ষতা বাড়ানো, অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ বা ম্যানেজমেন্টের বাড়তি স্তর কমানোর মতো গৎবাঁধা কথা বলা হলেও এখন এসব ব্যাখ্যার জায়গা দখল করেছে এআই।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গুগল, অ্যামাজন, মেটা’র মতো বড় কোম্পানির পাশাপাশি ‘পিন্টারেস্ট’ ও ‘অ্যাটলাসিয়ান’-এর মতো ছোট কোম্পানিও কর্মী কমানোর পরিকল্পনা বা সতর্কবার্তা দিয়েছে।
তাদের দাবি, এআইয়ের অগ্রগতির ফলে এখন অনেক কম মানুষ দিয়ে আগের চেয়ে বেশি কাজ করা সম্ভব হচ্ছে।
জানুয়ারিতে মেটা প্রধান মার্ক জাকারবার্গ বলেছেন, “আমার মনে হয় ২০২৬ সাল হতে যাচ্ছে এমন এক বছর যখন এআই আমাদের কাজের ধরনকে নাটকীয়ভাবে বদলে দিতে শুরু করবে।”
এরপর থেকে তার কোম্পানি শয়ে শয়ে কর্মী ছাঁটাই করেছে, যার মধ্যে গত সপ্তাহেই সাতশ জন বাদ পড়েছেন। মেটার অধীনে রয়েছে ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ।
এ বছর এআইয়ের পেছনে খরচ প্রায় দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছে মেটা। কোম্পানির একজন মুখপাত্র বলেছেন, এখনও নিজেদের ‘অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলোতে’ নতুন কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে তারা।
তবে কোম্পানির ভেতরের দুইজন ব্যক্তি বলেছেন, আগামী মাসগুলোতে আরও কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি, কোম্পানির অনেক বিভাগেই বর্তমানে নতুন কর্মী নিয়োগ কার্যক্রম বা ‘হায়ারিং ফ্রিজ’ চলছে।
‘আমি সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকতে চেয়েছিলাম’
আর্থিক প্রযুক্তি কোম্পানি ‘ব্লক’-এর প্রধান জ্যাক ডরসি তার লক্ষ্যের ব্যাপারে আরও সরাসরি কথা বলেছেন।
‘ক্যাশঅ্যাপ’, ‘স্কয়ার’ ও ‘টাইডাল’-এর মতো প্ল্যাটফর্ম চালানো কোম্পানিটি প্রায় অর্ধেক কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। গেল মাসে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে ডরসি বলেছেন, “কর্মী ছাঁটাই কেবল দক্ষতা বাড়ানোর বিষয় নয়।
“ইন্টেলিজেন্স টুলস বা বুদ্ধিমত্তাওয়ালা বিভিন্ন প্রযুক্তি একটি কোম্পানি গঠন ও পরিচালনার সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে... আমাদের তৈরি করা বিভিন্ন টুল ব্যবহার করে অনেক ছোট দল এখন আগের চেয়ে বেশি এবং আরও নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে।”
ডরসির ধারণা, আগামী এক বছরের মধ্যে ‘বেশিরভাগ কোম্পানিই’ এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।
“আমি কেবল সময়ের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকতে চেয়েছি।”
তবে ডরসির এ যুক্তিতে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সমালোচকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গত দুই বছরে তিনি অন্তত দুইবার বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই করেছেন। তবে তখন একবারও এআইয়ের কথা উল্লেখ করেননি।
টেক ইনভেস্টর টেরেন্স রোহান অনেক কোম্পানির বোর্ড মেম্বার হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বলেছেন, খরচ কমানো বা বিনিয়োগকারীদের খুশি করার কথা বলার চেয়ে এআইয়ের উন্নতির অজুহাত দেওয়াটা শুনতে অনেক ভালো শোনায়।
“ব্লগ পোস্টে এআইয়ের কথা উল্লেখ করলে তা বেশ ইতিবাচক দেখায়। অন্তত আপনাকে এমন কোনো ‘ভিলেন’ মনে হয় না, যে কি না কেবল খরচ বাঁচানোর জন্য মানুষকে ছাঁটাই করছে।”
তবে রোহান বলেছেন, এ কথার পেছনে যে কোনো ভিত্তি নেই তা কিন্তু নয়। তার বিনিয়োগ করা কিছু কোম্পানি এখন এমন কোড ব্যবহার করছে, যার ২৫ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত তৈরি করেছে এআই।
এমনটি সফটওয়্যার ডেভেলপার, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ও প্রোগ্রামারদের মতো পেশার জন্য বড় হুমকির সংকেত। অথচ এক সময় মনে করা হত, এসব পেশা মানেই উচ্চ বেতন ও নিশ্চিত ক্যারিয়ার।
পরামর্শক কোম্পানি ‘বেইন’-এর টেকনোলজি প্র্যাকটিস প্রধান অ্যান হোকার সাম্প্রতিক এ ছাঁটাই প্রসঙ্গে বলেছেন, “একদিকে যেমন আলোচনার ধরন পাল্টাচ্ছে, অন্যদিকে আমরা সত্যিই উৎপাদনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে শুরু করেছি।
“বর্তমানের নেতারা দেখছেন, এসব টুল এখন এতটাই দক্ষ হয়ে উঠেছে যে অনেক কম মানুষ দিয়েই আগের সমান কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব।”
‘শৃঙ্খলা’র বার্তা দিয়ে ৬৫ হাজার কোটি ডলার ব্যয়
এআইয়ের কারণে কর্মী ছাঁটাই হওয়ার আরও একটি কারণ রয়েছে, যার সঙ্গে কোডিং টুল বা চ্যাটবটের কারিগরি দক্ষতার কোনো সম্পর্ক নেই।
অ্যামাজন, মেটা, গুগল ও মাইক্রোসফট এ চার কোম্পানি মিলে আগামী বছরে এআইয়ের পেছনে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
এ মোটা অংকের খরচের ধাক্কা দেখে বিনিয়োগকারীরা যাতে ভড়কে না যান, সেজন্য এসব কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা এখন খরচ কমানোর সহজ উপায় খুঁজছেন। তাদের নজর পড়েছে কর্মীদের বেতনের ওপর, যা সাধারণত যে কোনো টেক কোম্পানির সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত।
আর এসব কোম্পানি এ সম্পর্কের কথা খুব একটা গোপনও করছে না।
ফেব্রুয়ারিতে অ্যামাজন বলেছে, তারা আগামী বছর এআই খাতে ২০ হাজার কোটি ডলার খরচ করবে, যা বড় বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে সর্বোচ্চ।
একই সময়ে কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা বলেছেন, তারা মোটা অংকের খরচ সামাল দিতে কোম্পানির অন্যান্য খাতে ‘দক্ষতা বাড়ানো’ ও ‘ব্যয় সংকোচন’ চালিয়ে যাবেন।
গেল বছরের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার কর্পোরেট কর্মীকে ছাঁটাই করেছে অ্যামাজন।
এদিকে, ২০২৩ সালে ১২ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পর থেকে আরও কয়েক দফায় ছোট ছোট ছাঁটাই প্রক্রিয়া চালিয়েছে গুগল। ফেব্রুয়ারিতে নিজেদের এআই বিনিয়োগ পরিকল্পনা আলোচনার সময় বিনিয়োগকারীদেরও একই ধরনের আশ্বাস দিয়েছে মার্কিন সার্চ জায়ান্টটি।
কোম্পানিটির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা আনাত আশকেনাজি বলেছেন, “বিনিয়োগের জন্য আমরা কোম্পানির ভেতর থেকে যত বেশি মূলধন সাশ্রয় করতে পারব, ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগের চাকা তত দ্রুত ঘোরানো সম্ভব হবে।”
অ্যামাজনের ৩০ হাজার কর্পোরেট কর্মীর পেছনে হওয়া ব্যয় তাদের এআই বিনিয়োগের তুলনায় খুব সামান্য হলেও রোহান বলছেন, এসব বড় কোম্পানি এখন খরচ কমানোর কোনো সুযোগই হাতছাড়া করতে চায় না।
বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর এ ছাঁটাই প্রসঙ্গে রোহান বলেছেন, “তারা এখন প্রতিটি ইঞ্চিতে হিসেব করে খেলছে। কোম্পানিকে যদি সামান্য একটুও টিউন করা যায় তবে সেটিই তাদের জন্য সহায়ক।”
এদিকে, হোকার বলেছেন, কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের একটি সংকেত দেওয়া হয়। যেহেতু এআই তৈরির খরচ ‘বিশাল ও বাস্তব’ ফলে ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বোঝানো হয়, নির্বাহীরা চোখ বন্ধ করে কাড়িকাড়ি অর্থ খরচ করছেন না।
“বিষয়টি ‘শৃঙ্খলা’ দেখানোর মতো। হয়ত কর্মী ছাঁটাই করে মোটা অংকের ওই অর্থের খুব একটা হেরফের হবে না তবে সামান্য নগদ অর্থ তৈরি করাও বর্তমানে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।”