Published : 24 Feb 2026, 12:05 PM
ইন্টারনেট একসময় ছিল সীমানাহীন এক মুক্ত আকাশ। তবে বর্তমান ভূ-রাজনীতি, তথ্যের সার্বভৌমত্ব ও প্রযুক্তির জাতীয়করণ সেই আকাশকে ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত করে ফেলছে। বিশ্বজুড়ে উন্মুক্ত ইন্টারনেটের ধারণাটি এখন অস্তিত্বের সংকটে।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান লিখেছে, ইরান থেকে রাশিয়া বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলো এখন অত্যাধুনিক সেন্সরশিপ প্রযুক্তির সহায়তায় আগের চেয়ে অনেক সহজে নিজেদের জনগণকে বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। ইন্টারনেটের এ জাতীয়করণ কেবল তথ্যকেই বাধার মুখে ফেলছে না, বরং তা হয়ে উঠছে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন আড়াল করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে সহিংসতার জেরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে বাংলাদেশজুড়ে সংঘাত-সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে পরদিন রাতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ হয়ে যায়। এর ১০ দিন পর মোবাইল ইন্টারনেট ও ৫দিন পর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা ফিরেছিল।
জানুয়ারিতে ইরানে ইন্টারনেট পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন বা ব্ল্যাকআউট ছিল। ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী সপ্তাহে সরকারি বাহিনীর হাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেখতে পারেননি ইরানীরা। দেশটির ভেতরকার কোনো প্রমাণ যেমন ছবি, ভিডিও বা কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান বাইরের বিশ্বকে জানাতেও পারেননি তারা।
ইরানের বিক্ষোভকারীদের ওপর সামরিক যান চালিয়ে দেওয়া বা ঘর থেকে টেনে বের করে পরিবারের সদস্যদের গুলি করার মতো ভয়াবহ ঘটনার কোনো তথ্যই দেশটির বাইরে পাঠানো সম্ভব ছিল না তাদের জন্য।
বর্তমানে ইরান যা করছে তা হচ্ছে ‘স্প্লিন্টারনেট’ বা খণ্ডিত ইন্টারনেট ব্যবস্থা, যা এখন লাখ লাখ মানুষের কাছে এক রূঢ় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাশিয়ার অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চলের মানুষ তাদের মোবাইল ফোনে কেবল সরকারের অনুমোদিত ইন্টারনেটের সীমিত সংস্করণ ব্যবহার করতে পারেন। গুগল ও গার্ডিয়ানের মতো বিশ্বের অধিকাংশ ওয়েবসাইট বন্ধ করে রেখেছে চীনের ‘গ্রেট ফায়ারওয়াল’।
মিয়ানমারের জান্তা সরকারও নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক ইন্টারনেট শাটডাউন বা বন্ধ রাখার পরীক্ষা চালিয়েছে, ঠিক যেমনটি সম্প্রতি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষও করেছে।
বিগত প্রায় দুই দশক ধরে কোনো দেশ যেন এভাবে ইন্টারনেটকে খণ্ডিত করতে না পারে সেজন্য বিশ্বজুড়ে এক প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রচেষ্টার মূল ভিত্তি ছিল সেন্সরশিপ বা সরকারি নিয়ন্ত্রণ এড়ানোর জন্য তৈরি বিভিন্ন ‘সারকামভেনশন টুল’ বা সফটওয়্যার।
এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কোনো দেশের জন্য ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করা যেমন আর্থিক দণ্ডবহুল ছিল, তেমন কঠিনও। ফলে কোনো সরকার যদি তাদের জনগণকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাই তবে তাদের নিজেদের ও তাদের আর্থিক বিভিন্ন কোম্পানিকেও বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হত।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অনেক ‘সফট পাওয়ার’ বা সাংস্কৃতিক বা কূটনৈতিক প্রভাব উদ্যোগের মতো এ প্রোগ্রামটিও নিখুঁত ছিল না। প্রকল্পটি নৈতিকভাবে জটিল এবং অনেক সময় অন্যান্য দেশের সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। তবু এটি ইন্টারনেটের যে কাঠামো আমরা আজ দেখি, তার একটি ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
বর্তমানের অনলাইন জগত বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির দখলে এবং অবৈধ কনটেন্ট ও ভুল তথ্যে সয়লাব। এরপরও তা এমন এক কাঠামো, যেখানে লন্ডন থেকে যেসব তথ্য বা আইডিয়া পাওয়া যায় তার প্রায় সবই দিল্লি, জোহানেসবার্গ বা সাও পাওলো বা বাংলাদেশ থেকেও পাওয়া সম্ভব।
তবে এ চিত্রটি দ্রুত বদলে যেতে পারে। একদিকে রয়েছে মার্কিন তহবিলের বিষয়, যা বর্তমানে কমেছে বা ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্বার্থে এমনভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা মার্কিন বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণের বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অন্যদিকে রয়েছে সেন্সরশিপ বা তথ্য নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তির ক্রমাগত বিস্তার, যা দিন দিন আরও উন্নত হচ্ছে এবং বিদেশের বাজারে এর প্রচার বাড়ছে। যার মধ্যে চীনের বিভিন্ন কোম্পানির বিক্রি করা এমন সব ডিভাইস রয়েছে যা পাকিস্তান, মিয়ানমার ও ইথিওপিয়াসহ অন্যান্য দেশের সরকারকে তাদের দেশে ইন্টারনেটের তথ্য আসা-যাওয়ার ওপর অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সক্ষমতা দিয়েছে।
ধারণা করা হয়, এ ধরনের প্রযুক্তিই ইরানের বর্তমান ইন্টারনেট শাটডাউন বা ব্ল্যাকআউটের মূল ভিত্তি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সেন্সরশিপ প্রযুক্তি যখন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে ঠিক সেই সময়েই এ নিয়ন্ত্রণ ঠেকানোর জন্য তৈরি প্রোগ্রাম বা উদ্যোগগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
এ সমস্যা নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের কাছে এর ঝুঁকি অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেছেন, “সরকার যখন রাস্তায় কতজন মানুষকে হত্যা করছে সেই জবাবদিহিতা থেকে বাঁচতে চায় তখনই তারা ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়।”
‘স্প্লিন্টারনেট’ বা খণ্ডিত ইন্টারনেট ব্যবস্থা গড়ে তোলা মোটেও সহজ কাজ নয়। কারণ ইন্টারনেটের গঠনই এমন যে তা বিকেন্দ্রীভূত ও গভীরভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল এক নেটওয়ার্ক।
তবে ইরানের সাম্প্রতিক উদাহরণ থেকে দেখা যায়, বিষয়টি এখন অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠছে। রাশিয়াও বেশ কয়েক বছর ধরে ইন্টারনেটে এ ধরনের দেয়াল তৈরির চেষ্টা করছে এবং অন্যান্য স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাও একই লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ প্রযুক্তি আরও সহজলভ্য হয়ে উঠবে।
ইউরোপসহ গোটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার এখন ‘সার্বভৌম ডেটা’, ‘সার্বভৌম এআই’ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘সার্বভৌম ইন্টারনেট’-এর ধারণাকে উৎসাহিত করছে।
পাশাপাশি অবকাঠামোকে জাতীয়করণের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে, যেমন, যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের স্বাস্থ্যগত তথ্য বা হেলথ রেকর্ড কেবল যুক্তরাজ্যের ডেটা সেন্টারেই সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা।
বিশ্বের অধিকাংশ ডেটার নিয়ন্ত্রক বা কাস্টোডিয়ান হিসেবে পরিচিত মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্রমাগত স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রেক্ষাপটে এমনটি গ্রহণযোগ্য লক্ষ্য বলে মনে হতে পারে।
তবে সমস্যা হল, কোনো ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরাচারী যদি শাসন ক্ষমতায় আসে তবে এ পদ্ধতিটি কেবল এক দস্যুর বদলে অন্য দস্যুকে বসানোর ঝুঁকি তৈরি করে। ইরান যেভাবে তাদের ইন্টারনেট পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছে, তাদের মূল ভিত্তি ছিল বছরের পর বছর ধরে নিজেদের অবকাঠামো জাতীয়করণের প্রচেষ্টা।
যখন কোনো দেশের সব ডেটা বা তথ্য সে দেশের কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে তখন ইরানের মতো ইন্টারনেট ‘শাটডাউন’ করা অনেক বেশি সহজ হয়ে যায়।
ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে যারা ডিজিটাল স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছেন তারা এখন ইউরোপের দ্বারস্থ হচ্ছেন। তাদের আশা, যুক্তরাষ্ট্র যেসব কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন হয়ত এর হাল ধরবে এবং সেন্সরশিপ বিরোধী প্রযুক্তিতে অর্থায়ন করবে।
তবে অন্যান্য অনেক দায়িত্বের চাপে ইউরোপের এই খাতে ব্যয় করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ বা সদিচ্ছা আছে কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতের তুলনায় বিষয়টি হয়ত গৌণ।
তবে বর্তমানে যে তথ্যবহুল বিশ্বের সঙ্গে আমরা পরিচিত, তথ্যের সেই অভিন্ন ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে এই নিবন্ধটি লেখা হয়েছে এবং পাঠক এটি পড়ছেন তা আজ চরম ঝুঁকির মুখে।