Published : 18 Mar 2026, 01:12 PM
ভারতের ৩০ হাজার কোটি ডলারের আউটসোর্সিং শিল্প এখন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত কয়েক দশকে লাখ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করা এ খাতটি বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ঝড়ে টালমাটাল অবস্থায় পড়েছে।
বিবিসি লিখেছে, শেয়ার বাজারে ধস, কর্মী নিয়োগে মন্দা ও মার্কিন ভিসার বাড়তি খরচ সব মিলিয়ে ভারতীয় আইটি জায়ান্টরা এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন।
এর মূল কারণ এআই নিয়ে আতঙ্ক। বিনিয়োগকারীরা ভয় পাচ্ছেন, এআই হয়ত ভারতের ঐতিহ্যবাহী ‘আউটসোর্সিং’ মডেলটিকে পুরোপুরি বদলে দেবে, যা দেশটির প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলারের ব্যাক অফিস শিল্পের মূল ভিত্তি।
শেয়ার বিক্রির এই হিড়িক প্রচলিত সফটওয়্যার ও আইটি শেয়ারের বৈশ্বিক দরপতনেরই অংশ। এটি শুরু হয়েছিল সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তৈরি বাজার অস্থিরতার আগেই। আর ভারতের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গত সাড়ে তিন দশকে ভারতের সফটওয়্যার শিল্প লাখ লাখ ‘হোয়াইট কলার’ বা দক্ষ পেশাজীবীর কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। ফলে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও ক্রয়সক্ষমতাওয়ালা এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয়েছে।
গেল ৩০ বছর ধরে বেঙ্গালুরু, হায়দ্রাবাদ ও গুরুগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে অ্যাপার্টমেন্ট, গাড়ি ও রেস্তোরাঁর যে বিশাল চাহিদা তৈরি হয়েছে এর পেছনে মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে এ শিল্পটি।
এ বছর ভারতের শীর্ষ ১০টি সফটওয়্যার কোম্পানি নিয়ে গঠিত ‘নিফটি আইটি ইনডেক্স’ প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে, যার ফলে বিনিয়োগকারীরা হাজার হাজার কোটি ডলারের সম্পদ হারিয়েছেন।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে এ শেয়ার বিক্রির ধস শুরু হয় যখন অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল ক্লড এজেন্ট নতুন এক টুল উন্মোচন করে। তাদের দাবি, টুলটি আইনগত সহায়তা, কমপ্লায়েন্স ও ডেটা প্রসেসিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারে। বিষয়টি ভারতের আইটি খাতের সেই ব্যবসায়িক মডেলে আঘাত হেনেছে, যা অনেক জনশক্তির ওপর নির্ভরশীল।
এরপর আতঙ্ক আরও বাড়ে যখন অনেক উদ্যোক্তারা সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রথাগত বিভিন্ন আইটি পরিষেবা বিলুপ্ত হতে পারে।
ভারতের কিছু প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, এআই এন্ট্রি-লেভেল বা শুরু দিকের প্রায় ৫০ শতাংশ পেশাজীবী চাকরি কমিয়ে দিতে পারে।
এ অস্থিরতার মধ্যেও ভারতের আইটি জায়ান্টরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের মতে, এ ভয়টি একটু বেশিই বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। তবে তারা বলেছে, এআই নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করলেও আগের কাজের পদ্ধতিতে যে কাঠামোগতভাবে বদল ঘটবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ‘জেফ্রিস’ বলেছে, “ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজের ধরন এখন পরামর্শ ও বাস্তবায়নের দিকে ঝুঁকে পড়বে। তবে অ্যাপ্লিকেশন ম্যানেজড সার্ভিসেস বা যেখান থেকে আয়ের ২২ থেকে ৪৫ শতাংশ আসে সেখানের আয়ের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।”
আগে ভারতীয় আইটি কোম্পানিগুলো ব্যাংক বা তেল কোম্পানির মতো গ্রাহকদের সফটওয়্যার চালানো, রক্ষণাবেক্ষণ করা, বাগ বা ভুল সংশোধন বা আপডেটের জন্য যে নিয়মিত ফি পেত তা এখন কমে যাবে। কারণ এখন গ্রাহকদের মনোযোগ নিয়মিত ছোটখাটো কাজের বদলে ‘কনসাল্টিং’ বা পরামর্শের দিকে ঘুরবে।
জেফরিস-এর মতে, বিষয়টি আয়ের প্রবৃদ্ধি ও নতুন কর্মী নিয়োগের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। তারা চরম এক পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়ে বলেছে, আগামী পাঁচ বছরে ভারতের বিভিন্ন আইটি কোম্পানির আয় তিন শতাংশ কমতে এবং ২০৩১ সালের পর এই খাতে আর কোনো প্রবৃদ্ধি বা উন্নতি নাও থাকতে পারে।
তবে সব দৃষ্টিভঙ্গিই নেতিবাচক নয়।
বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘জেপি মরগান চেজ’ বিভিন্ন আইটি কোম্পানিকে ‘প্রযুক্তি বিশ্বের প্লামার’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, এআই জটিল বিভিন্ন কাজকে দ্রুত করবে এবং সফটওয়্যার কোড লিখতে পারলেও এআই টুলগুলো আইটি কোম্পানিগুলোর মতো গ্রাহকের প্রয়োজন অনুসারে নিখুঁত সেবা দিতে পারবে এমনটি ভাবা ‘ভুল বা অতি সরলীকরণ’।
তাদের ধারণা, একে অপরকে সরিয়ে দেওয়ার বদলে ‘এআই টুল নির্মাতা’ ও ‘আইটি পরিষেবা বিভিন্ন কোম্পানির’ মধ্যে অংশীদারিত্ব বাড়বে, যা কাজের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে।
ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম আইটি কোম্পানি ‘ইনফোসিস’-এর সিইও সলিল পারেখ এ মতকে সমর্থন করে বলেছেন, এআই তাদের মতো কোম্পানিগুলোর জন্য সুযোগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ পুরানো বিভিন্ন সিস্টেমকে আধুনিক এবং এআই টুল ব্যবহার করতে গ্রাহকদের সাহায্যের জন্য তারাই উপযোগী।
ইনফোসিস-এর তথ্যমতে, জেনারেটিভ এআই হয়ত ফ্রন্ট-এন্ড ডেভেলপার ও পরীক্ষকদের মতো প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি কমিয়ে দিতে পারে। তবে বিপরীতে ডেটা অ্যানোটেটর, এআই ইঞ্জিনিয়ার ও এআই লিডের মতো প্রায় ১৭ কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে।

বিশ্লেষকদের মধ্যে বর্তমানে এই ইতিবাচক ধারণাটি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
এইচএসবিসি তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলেছে, সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোই হবে বিশ্বজুড়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোয় এআই ছড়িয়ে দেওয়ার মূল মাধ্যম।
‘সফটওয়্যার উইল ইট এআই’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে এইচএসবিসি দাবি করেছে, আইটি পরিষেবা কোম্পানিগুলোই আসলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এআইয়ের ব্যবহার নিশ্চিত করবে।
তাদের মতে, বড় আকারের বিভিন্ন এআই সিস্টেম ‘স্বভাবগতভাবেই ত্রুটিপূর্ণ’। এগুলো ইমেজ তৈরির প্রোগ্রামের মতো কাজের জন্য উপযোগী হলেও বড় বড় কোম্পানির মূল সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্মকে পুরোপুরি হটিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে না।
এইচএসবিসি আরও বলেছে, “এন্টারপ্রাইজ-লেভেলের বিভিন্ন সফটওয়্যার গত কয়েক দশকে এমনভাবে উন্নত হয়েছে যে এগুলো এখন প্রায় নির্ভুল, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য।
“এ গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন মেধা সম্পদ ইন্টারনেটের উন্মুক্ত তথ্য ব্যবহার করে এআইকে শেখানো সম্ভব নয়।”
তাদের মতে, বিভিন্ন আইটি কোম্পানি যে ধরনের কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ ‘সফটওয়্যার আর্কিটেকচার’ বা কাঠামো তৈরিতে বিশেষজ্ঞ এআই সেই তুলনায় এখনও কয়েক দশক পিছিয়ে আছে।
তবে এরপরও জীবনের এই একবার আসা প্রযুক্তিগত পরিবর্তন থেকে আইটি কোম্পানিগুলো একেবারে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পারবে না।
জেপি মরগানের মতে, এর সঠিক প্রভাব ঠিক কতটা হবে তা পরিমাপ করা কঠিন। তবে এই শিল্পের বিভিন্ন স্তরে এরইমধ্যে এর ঢেউ বা প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করেছে।
ভারতের সফটওয়্যার লবিয়িং গ্রুপ ‘ন্যাসকম’-এর মতে, আইটি শিল্প এরইমধ্যে এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালটি গুরুত্বপূর্ণ এক মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। কারণ এ বছরই প্রযুক্তি খাত এআই নিয়ে কেবল পরীক্ষানিরীক্ষা করার পর্যায় পেরিয়ে সরাসরি তা ব্যবহারে নেমেছে।
তবে ২০২৫ সালে আইটি শিল্পের মোট সাড়ে ৩১ হাজার কোটি ডলার আয়ের মধ্যে এআই প্রজেক্টগুলো থেকে আয় হয়েছে কেবল ১০ হাজার কোটি ডলার। এ ছাড়া, এই খাতের সামগ্রিক আয় এ বছর কেবল ছয় শতাংশ বাড়তে পারে, যা আগের সেই সোনালী সময়ের ‘ডাবল ডিজিট’ বা বড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম।
অন্যদিকে, কর্মী নিয়োগের গতিও বেশ ধীর থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালে মোট কর্মীর সংখ্যা কবল ২.৩ শতাংশ বাড়তে পারে।
ন্যাসকম-এর তথ্য অনুসারে, এআইয়ের কারণে বিভিন্ন আইটি কোম্পানির বিলিং পদ্ধতিও (ক্লায়েন্টের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার নিয়ম) দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে কত ঘণ্টা কাজ করা হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে অর্থ নেওয়া হত। তবে এখন কাজের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে বিল করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট যে, স্বল্প মেয়াদে এই পরিবর্তনের ধাক্কা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।
কেবল প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জই নয়, ভারতের জন্য শুল্ক সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও যুক্তরাষ্ট্রে ভিসার বিধিনিষেধ অনেক বেড়েছে। ভারতের বিভিন্ন আইটি কোম্পানির জন্য সবচেয়ে বড় বাজার এই যুক্তরাষ্ট্র।
‘মুডিস অ্যানালিটিক্স’-এর তথ্য অনুসারে, নতুন ভিসা ফির কারণে ভারতের শীর্ষ আইটি কোম্পানির পরিচালনা ব্যয় প্রায় ১০ কোটি থেকে ২৫ কোটি ডলার বেড়ে যেতে পারে, যা তাদের মোট আয়ের প্রায় ১ শতাংশের সমান।
এসব চ্যালেঞ্জ ভারতের এ গুরুত্বপূর্ণ আইটি খাতের জন্য প্রবল প্রতিকূলতা তৈরি করেছে, যা ভারতের মোট সেবা রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ দখল করে আছে।