Published : 28 Jun 2026, 10:15 AM
অবিশ্বাস্য, অকিল্পনীয়, অভাবনীয় কিংবা আরও বেশি কিছু! ফুটবলীয় রোমাঞ্চের চূড়ান্ত রূপ ফুটে উঠল যেন গ্রুপ পর্বের শেষ দিনটির শেষ সময়ে। দুই দলের লড়াইয়ে মিশে ছিল তিন দলের সম্ভাবনা। ড্রয়ের পথে থাকা ম্যাচ ৯০ মিনিট শেষে হুট করেই টগবগ করে ফুটে উঠল উত্তেজনায়। পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকল দলগুলির ভাগ্য। ৯৩তম মিনিটে আলজেরিয়ার গোলে বিদায়ের দুয়ারে পৌঁছে গেল অস্ট্রিয়া, জেগে ওঠল ইরানের আশা। ৯৫তম মিনিটে বদলি হিসেবে নামানো হলো সাশা কালাইজিচকে। পরের মিনিটেই ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার এই ফরোয়োর্ডের হেডের গোলে অস্ট্রিয়া আদায় করে নিল নকআউটের টিকেট। ছিটকে গেল ইরান।
ক্যানসাস সিটিতে বিশ্বকাপের ‘জে’ গ্রুপে ৩-৩ গোলে ড্র হয় আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচ।
নকআউট নিশ্চিত করতে দুই দলেরই প্রয়োজন ছিল স্রেফ ড্র। দুই দলের সতর্ক কৌশলে ম্যাড়ম্যাড়ে ম্যাচ হবে কি না, এমন কৌতূহল ছিল অনেকের। শেষ পর্যন্ত ড্র-ই হলো, তবে
মহানাটকের পর।
প্রথমার্ধে দুই দল সমতায় ছিল ১-১ গোলে। দ্বিতীয়ার্ধের ১৫ মিনিটের মধ্যে হয়ে যায় ২-২। এরপর একটু ভাটা পড়েছিল ম্যাচের গতিতে। ড্রয়ের ভাগ্য তারা মেনে নিয়েছিল বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু শেষ সময়ের ওই রোমাঞ্চ ম্যাচটিকে করে তুলল স্মরণীয়।
মার্কো আর্নাউতোভিচের গোলে অস্ট্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার পর দুর্দান্ত গোলে আলজেরিয়াকে সমতায় ফেরান রাফিক বেলঘালি। পরে আফ্রিকার দলটির বড় তারকা রিয়াহ মাহরেজ পরে করেন দুটি গোল। অস্ট্রিয়ার গোল করেন মার্সেল জাবিতজার ও কালাইজিচ।
মাঠে না থেকেও এই ম্যাচে প্রবলভাবে ছিল ইরান। ড্র ছাড়া অন্য কোনো ফল হলেই তারা নকআউটে চলে যেত। মেক্সিকোতে তাদের অনুশীলন করার কথা ছিল এ দিন। কিন্তু দিনের অন্য ম্যাচে ডিআর কঙ্গো-উজবেকিস্তান লড়াইয়ে ফলাফলের অপেক্ষায় থাকায় তারা অনুশীলনের সময়সূচী পরিবর্তন করে। এরপর যখন সেই ম্যাচের ফলাফল ইরানের পক্ষে যায়নি, কঙ্গো ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পেয়ে যায়, তখন অনুশীলন বাতিল করে তারা তাকিয়ে ছিল আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচে। সেখানেও শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গী বিদায়ের যন্ত্রণা।
গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে নকআউটে যাওয়া অস্ট্রিয়া খেলবে স্পেনের বিপক্ষে, সেরা তৃতীয় দলগুলির একটি আলজেরিয়ার প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। আগেই গ্রুপ সেরা হওয়া নিশ্চিত করা আর্জেন্টিনা এ দিন ৩-১ গোলে হারায় জর্ডানকে। নকআউটে তাদের প্রতিপক্ষ এবারের আসরের চমক কেইপ ভার্ড।
ক্যানসাস সিটিতে ম্যাচের শুরুতে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমিয়ে তোলে ম্যাচ। দশম মিনিটে থ্রো-ইন থেকে দারুণভাবে বল ধরেও অনেক ওপর দিয়ে মেরে দেন ইব্রাহিম মাজা। ২০ বয়সী এই মিডফিল্ডার বারবারই হানা দিচ্ছিলেন অস্ট্রিয়ার রক্ষণে।
২০ মিনিটের পর খেলায় নিয়ন্ত্রণ নেয় আলজেরিয়া। ২৮তম মিনিটে এগিয়ে যায় তারা। নিজেদের অর্ধ থেকেই ডেভিড আলাবার একটি চমৎকার লম্বা বলে সময়মতো ছুটে যান আর্নাউতোভিচ। টাচটা খুব ভালো ছিল না, কিন্তু লুকা জিদানের বদলে একাদশে ফেরা আলজেরিয়ার গোলরক্ষক উসামা বনবত খুব একটা তৎপর ছিলেন না। আলতো টোকায় অস্ট্রিয়ান স্ট্রাইকার বিশ্বকাপে প্রথম গোলের স্বাদ পান ৩৭ বছর বয়সে।
গোল পরিশোধে মরিয়া আলজেরিয়া আক্রমণের ধার বাড়ায়। বল নিয়ে ভেতরে ঢুকে দুজনকে কাটিয়েও সাইড নেটে মেরে দেন মাজা। ৪০তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ফারেস শেইবির গোলা পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ৪২তম মিনিটে কাছ থেকে মাজার ভলি আটকে দেন অস্ট্রিয়ার গোলকিপার আলেকসান্দা শ্লাগা।
৪৫তম মিনিটে অস্ট্রিয়ার একজনকে ছিটকে বাঁদিক দিয়ে বক্সে ঢুকে আরও দুজনকে এগিয়ে বাঁ পায়ের শটে বল জালে জড়ান বেলঘালি।
৫৫তম মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে কনরাড লাইমারের পাসে বক্সের ঠিক মাথা থেকে শটে গোলকিপারকে পরাস্ত করেন জাবিতজার। মিনিট পাঁচেক পরই আবার সমতা ফেরায় আলজেরিয়া। দারুণ গোছানো আক্রমণ থেকে হুসেম আওয়াহ বল বাড়ান ক্সের মাঝে। দ্রুতগতিতে ছুটে ফাঁকা থেকে বল ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন মাহরেজ। বিশ্বকাপে তার প্রথম গোল এটি।
এরপর ৯০ মিনিটের আগে েআর ততটা উত্তেজনা ছড়ায়নি। শেষে গিয়ে জমে ওঠে আবার। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগে ফাঁক গলে আবার বল বাড়ান সেই আওয়াহ। কোনাকুনি গড়ানো শটে দূরের পোস্টে বল পাঠান মাহরেজ।
অস্ট্রিয়ার বিদায় ঘণ্টা তখন বেজে গেছে বলেই মনে হচ্ছিল। কে জানত, নাটকের আরও বাকি!
৯০ মিনিট শেষে ৪ মিনিট সময় দেওয়া হলেও নষ্ট করা সময় পুষিয়ে দিতে আরেকটু বেশি সময় খেলা চালালেন রেফারি। কালাইজিচকে নামালেন অস্ট্রিয়া কোচ। শেষ বাঁশি বাজার যখন অপেক্ষা, বাঁ প্রান্ত থেকে লম্বা করে বল বাড়ানো হলো অস্ট্রিয়ার বক্সে। গোলপোস্টের পাশ দিয়ে সীমানা পার হওয়ার মুহূর্তে হেড করে বল ভেতরে রাখলেন মিশাইল গ্রেগোরিচ। সেখানে ফাঁকায় থাকা কালাইজিচ অনায়াসেই হেড করে বল জালে পাঠিয়ে বাঁধনহারা উল্লাসে মেতে উঠলেন সতীর্থদের নিয়ে।
দুই দলকে স্বস্তি দিয়ে শেষ বাঁশি বেজে গেল এরপর। যেটি ইরানের বিদায়ের সুরও।
আগের দিন মিশরের বিপক্ষে জিতে নকআউটে প্রায় উঠেই গিয়েছিল ইরান। কিন্তু মিলিমিটারের ব্যবধানে অফসাইড হওয়ায় তাদের গোল বাতিল হয়। এবার অন্য ম্যাচেও শেষ সময়ে হৃদয় ভাঙার অভিজ্ঞতা হলো যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটির।