Published : 04 Mar 2026, 12:10 PM
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার এখন কেবল ভবিষ্যতের কল্পনা নয়, বরং রূঢ় বাস্তবতা। বর্তমানে বিশ্বে প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীগুলো তাদের অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপকভাবে এআই ব্যবহার করছে।
বিবিসি লিখেছে, সামরিক বাহিনীতে রসদ সরবরাহ সহজ করা থেকে শুরু করে বড় ধরনের গোয়েন্দা তথ্য নিমেষেই বিশ্লেষণ করাতে এআইয়ের পদচারণা বাড়ছে।
তবে বিতর্ক দানা বাঁধছে যুদ্ধের ময়দানে ‘প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার ক্ষেত্রে এআইয়ের ভূমিকা নিয়ে। নেটো থেকে শুরু করে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন পর্যন্ত সবখানেই হচ্ছে এআইয়ের ব্যবহার।
কিন্তু সামরিক বাহিনীতে কীভাবে এআই ব্যবহৃত হয়?
নানাভাবেই সামরিক বাহিনীতে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন, রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা সহজ করা বা বড় সংখ্যাক তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার বেশি হয়।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেইন ও নেটো এখন মার্কিন কোম্পানি ‘প্যালান্টির’-এর এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কোম্পানিটি সরকারি গ্রাহকদের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতে ও সামরিক উদ্দেশ্যে ডেটা অ্যানালিটিক্স টুল সরবরাহ করে থাকে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ কোম্পানির সঙ্গে ২৪ কোটি পাউন্ডের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
গেল বছরের শেষদিকে প্যালান্টিরের এআইচালিত প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম ‘মাভেন’কে নেটোতে একীভূত করার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছিল বিবিসি।
এ সফটওয়্যারটি স্যাটেলাইট ডেটা থেকে শুরু করে গোয়েন্দা রিপোর্ট পর্যন্ত বড় ধরনের সামরিক তথ্যভাণ্ডার একসঙ্গে করার কাজে ব্যবহৃত হয়।
প্যালান্টির-এর যুক্তরাজ্য শাখার প্রধান লুইস মোসলে বলেছেন, “এসব তথ্য পরবর্তীতে ক্লড-এর মতো বাণিজ্যিক এআই সিস্টেমের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়, যা উপযোগী ক্ষেত্রে আরও দ্রুত, দক্ষ ও শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।”
তবে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএমও মাঝেমধ্যে ভুল করতে পারে, তথ্য বানিয়েও বলতে পারে, যাকে এআইয়ের ভাষায় বলে ‘হ্যালুসিনেশন’।
নেটোর ‘টাস্ক ফোর্স মাভেন’-এর চিফ ডেটা অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল অ্যামান্ডা গুস্তাভ বলেছেন, এ প্রক্রিয়ায় মানুষের তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ সবসময় থাকে। তারা সবসময় একজন মানুষকে এ প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখেন এবং এআই কখনোই মানুষের হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।
অ্যানথ্রপিকের মতো অটোনমাস মারণাস্ত্রের ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞার পক্ষে নয় প্যালান্টির। তবে তাদেরও ধারণা, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একজন মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি।
তবে ‘ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড’-এর অধ্যাপক মারিয়ারোসারিয়া তাদেও বলেছেন, পেন্টাগন থেকে অ্যানথ্রপিক বেরিয়ে যাওয়ায় এখন সবচেয়ে ‘নিরাপত্তা সচেতন পক্ষটিই’ আলোচনা থেকে বাদ পড়ে গেল।
“বিষয়টি সত্যিই বড় এক সমস্যা।”
জার্মানির ‘পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফ্রাঙ্কফুর্ট’-এর এআই ও সাইবার বিশেষজ্ঞ টমাস রেইনহোল্ড বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনী এখন এআই ব্যবহারের প্রতিযোগিতায় মেতেছে। তবে এ প্রযুক্তিতে এরইমধ্যে অনেক বিনিয়োগ করে সবার চেয়ে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র।
“এআই এরইমধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, নজরদারি ব্যবস্থা, স্বচালিত প্ল্যাটফর্ম, লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা, সাইবার প্রতিরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের পূর্বাভাস দেওয়ার কাজে জড়িয়ে। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এক্ষেত্রে সবার আগে এ প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে।
“তবে এ প্রবণতা এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ কোনো সামরিক বাহিনীই অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে থাকতে চায় না।”
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুসারে, জানুয়ারির শুরুতে কারাকাস থেকে তৎকালীন ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ধরার দুঃসাহসিক অভিযানের অংশ হিসেবে ক্লড ব্যবহার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
রেইনহোল্ড বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানে এআই ব্যবহার শুরু করলেও তা এখনও তাদের সব সিস্টেম ও পরিকল্পনার সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত হয়নি।
অন্যদিকে, পূর্ব ইউক্রেইনের রণক্ষেত্রে এআই সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাশিয়া ও ইউক্রেইন উভয় পক্ষই লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, ড্রোন নিয়ন্ত্রণ ও জ্যামিং প্রতিরোধে এআই ব্যবহার করছে। মানুষের চেয়ে দ্রুত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে এআই।
অ্যাক্সিওস-এর প্রতিবেদনে অনুসারে, আরও তিনটি এআই ল্যাব পেন্টাগনের সঙ্গে আলোচনা করছে, তাদের বিভিন্ন মডেলের ওপর সামরিক বাহিনীর কতটুকু নিয়ন্ত্রণ থাকবে তা নিয়ে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সঙ্গে ওপেনএআই, গুগল ও এক্সএআই-এরও চুক্তি রয়েছে।