Published : 01 Jun 2026, 04:13 PM
পৃথিবীতে যদি এমন কোনো স্থাপত্য থেকে থাকে, যা কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে তবে তা নিশ্চিতভাবেই গিজার গ্রেট পিরামিড, যা মানুষের কল্পনা ও আকাশছোঁয়া আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য নিদর্শন।
রয়টার্স লিখেছে, প্রাচীন মিশরের ‘ওল্ড কিংডম’ বা প্রাচীন সাম্রাজ্যের আমলে তৈরি হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কত সভ্যতার উত্থান-পতন হল। তবে এ পিরামিড সময়ের চাকা পেরিয়ে একভাবেই অটল দাঁড়িয়ে রয়েছে।
গবেষকেরা এখন পিরামিডের এই বিস্ময়কর স্থায়িত্বের অন্যতম কারণ খুঁজে পেয়েছেন। প্রায় ৪ হাজার ৬০০ বছর আগে ফারাও খুফুর সমাধি হিসেবে নির্মিত এ পিরামিডের ভেতরের গাঠনিক নকশা বা কাঠামো এমনভাবে তৈরি হয়েছিল, যা ভূমিকম্পের বিধ্বংসী সক্ষমতা বা শক্তি অনায়াসে সহ্য করতে পারে।
পিরামিডের এ গাঠনিক সক্ষমতা পরীক্ষা করতে বিজ্ঞানীরা ‘সিসমোমিটার’ ব্যবহার করেছেন, যা ভূমিকম্প পরিমাপে ব্যবহৃত হয়। এ যন্ত্রের সাহায্যে পিরামিডের ভেতরে ও আশপাশে মোট ৩৭টি জায়গায় ‘অ্যাম্বিয়েন্ট ভাইব্রেশন’ বা পারিপার্শ্বিক কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে।
এ কম্পন প্রাকৃতিক শক্তি ও মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের ফলে প্রতিনিয়ত তৈরি হওয়া এক ধরনের মৃদু ব্যাকগ্রাউন্ড কম্পন। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, পিরামিডটি আকারে বড় ও ভেতরে জটিল নকশার হওয়া পরও এসব কম্পনের বিরুদ্ধে এর পুরো কাঠামোটি চমৎকার ও সমানভাবে স্থিতিশীল প্রতিক্রিয়া দেখায়।
মিশরের রাজধানী কায়রোর ঠিক পাশেই গিজা নামের স্থানে এ পিরামিডটি অবস্থিত। বড় আকারের চুনাপাথরের ব্লক দিয়ে তৈরি এ পিরামিডের ভুমির প্রতিটি বাহু প্রায় ৭৫৫ ফুট ও তা প্রায় ১৩ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত।
নির্মাণের সময় পিরামিডটি উচ্চতায় ছিল প্রায় ৪৮০ ফুট বা ১৪৭ মিটার। তবে যুগের পর যুগ ধরে প্রাকৃতিক ক্ষয় ও কয়েক শতাব্দী আগে এর ওপরের মসৃণ চুনাপাথরের আস্তরণটি অন্য ভবনের নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে খুলে নেওয়ার কারণে, বর্তমানে এর উচ্চতা এসে ঠেকেছে প্রায় ৪৫৫ ফুট বা ১৩৮.৫ মিটারে।
এরপরও প্রায় ৩ হাজার ৮০০ বছর ধরে এটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থাপত্য।
বিজ্ঞানীরা পিরামিডের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছেন, যা একে ভূমিকম্প প্রতিরোধী করে তুলেছে। যেমন, এর ভিত্তি বা নিচের অংশটি অত্যন্ত চওড়া ও এর ভরকেন্দ্র বেশ নিচের দিকে। এর চারপাশের জ্যামিতিক গঠন নিখুঁতভাবে সুষম।
পিরামিডের নিচের দিক থেকে ওপরের দিকে ভর বা ওজন ক্রমান্বয়ে কমেছে। এর ভেতরের কক্ষ বা চেম্বারগুলোর জটিল ও উন্নত নকশা ভূমিকম্পের তীব্র কম্পনকে শুষে নিয়ে এর ঝাঁকি কমিয়ে দিয়েছে। পিরামিডটি কোনো নরম মাটির ওপর নয়, বরং প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা শক্ত ও মজবুত চুনাপাথরের ভিত্তির ওপর নির্মিত।
বৃহস্পতিবার গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ।
গবেষণার প্রধান লেখক ও মিশরের ‘ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড জিওফিজিক্স’-এর সিসমোলজিস্ট মোহামেদ আল-গাবরি বলেছেন, “এসব উপাদান একসঙ্গে মিলে পিরামিডটিকে সুষম ও সুসংহত এক কাঠামোয় রূপ দিয়েছে।”
ওই একই প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র সিসমোলজিস্ট ও এ গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক আসেম সালামা প্রাচীন মিশরীয়দের প্রশংসা করে বলেছেন, “প্রাচীন মিশরের নির্মাতাদের যে স্থাপত্যের স্থিতিশীলতা, মজবুত ভিত্তি তৈরি, নিখুঁত ওজন বণ্টন এবং ওপরের চাপ নিচে স্থানান্তরের বিষয়ে চমৎকার বাস্তব জ্ঞান ছিল তা এখন স্পষ্ট।”
গবেষকরা পিরামিডের ভেতরে যেসব কম্পন রেকর্ড করেছেন এর ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্ক বিশ্লেষণ করে বলছেন, যে কোনো ধরনের যান্ত্রিক চাপ বা ঝাঁকুনি এর পুরো কাঠামোতে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পিরামিডের কোনো নির্দিষ্ট অংশ অতিরিক্ত চাপের মুখে ভেঙে পড়ে না।
গবেষক আসেম সালামা প্রাচীন মিশরীয়দের এ কৌশল সম্পর্কে বলেছেন, “তারা যে পিরামিডটিকে বিশেষভাবে ভূমিকম্প প্রতিরোধের উদ্দেশ্যেই তৈরি করেছিলেন, তা আমি জোর দিয়ে বলতে দ্বিধাবোধ করব। তবে আমার মনে হয়, তারা এমন কিছু স্থাপত্য ও ভূ-প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি করতে পেরেছিলেন, যা প্রাকৃতিকভাবেই এ কাঠামোটিকে দীর্ঘকাল টিকে থাকার মতো এক অসাধারণ সক্ষমতা এনে দিয়েছিল।”
অবশ্য প্রাচীন মিশরীয়রা এ কৌশল একদিনে শেখেনি। যুগের পর যুগ ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ভুলের মধ্য দিয়ে এমনটা আয়ত্ত করেছিল তারা। গিজার গ্রেট পিরামিডের আগে নির্মিত কিছু ত্রুটিপূর্ণ পিরামিডই এর বড় প্রমাণ।
গবেষকেরা পিরামিডের ভেতরের বিভিন্ন সুড়ঙ্গ, আশপাশের শক্ত পাথর, মাটি ও প্রধান সমাধিকক্ষ হিসেবে পরিচিত ‘কিংস চেম্বার’ থেকে ভূমিকম্পের তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
তারা বলছেন, পিরামিডের যত ওপরের দিকে যাওয়া যায়, কম্পনের তীব্রতা তত বাড়ে, যা যে কোনো উঁচু ভবনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ঘটনা। তবে তারা অদ্ভুত এক বিষয় লক্ষ্য করেছেন। কিংস চেম্বারের ঠিক ওপরে নির্মিত পাঁচটি বিশেষ কক্ষের ভেতরে কম্পনের এ তীব্রতা অনেকখানি কমেছে। যদিও তা পিরামিড কাঠামোর বেশ উঁচুতে অবস্থিত।
এর ব্যাখ্যায় সিসমোলজিস্ট মোহামেদ আল-গাবরি বলেছেন, “এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, এসব বিশেষ কক্ষ ভূমিকম্পের বিধ্বংসী শক্তিকে শুষে নিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। ফলে পিরামিডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর অন্যতম কিংস চেম্বার অতিরিক্ত ঝাঁকুনি থেকে রক্ষা পায়।”
এ অঞ্চলে নিকট অতীতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের মধ্যে ১৮৪৭ ও ১৯৯২ সালের ভূমিকম্প দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ দুটি ভূমিকম্পেই হাজার হাজার ঘরবাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ১৯৯২ সালের ভূমিকম্পে প্রায় ৫৬০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
তবে এত বড় বিপর্যয়ের পরও গিজার এ গ্রেট পিরামিডের গায়ে সামান্য আঁচড়ও লাগেনি।
এ গ্রেট পিরামিডটি বিশালাকার এক কমপ্লেক্স বা স্থাপত্য এলাকার অংশ। এর আশপাশেই রয়েছে অন্যান্য পিরামিড ও মানুষের মাথা ও সিংহের শরীরওয়ালা ‘গ্রেট স্ফিংস’। প্রাচীনকাল থেকেই এ পুরো এলাকাটি দেখার জন্য বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ দর্শনার্থীর ভিড় জমে আসছে।
সিসমোলজিস্ট মোহামেদ আল-গাবরি পিরামিডের প্রশংসা করে বলেছেন, “গ্রেট পিরামিড কেবল প্রকৌশলবিদ্যার এক অসাধারণ সাফল্যই নয়, বরং তা মানুষের কল্পনা ও শিল্পের এক গভীর নিদর্শন। এর নিখুঁত জ্যামিতিক সুসামঞ্জস্য, বড় আকার ও চমৎকার অনুপাত একে এমন এক চিরন্তন সৌন্দর্য দিয়েছে, যা ৪ হাজার ৬০০ বছর পরেও আমাদের মনে বিস্ময় জাগিয়েছে।”
এর পেছনের বিশাল কর্মযজ্ঞের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “এর বাহ্যিক সৌন্দর্যের বাইরেও যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে তা হচ্ছে, পিরামিডের প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট বা প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা। এ ধরনের স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করতে প্রায় ২০ বছর সময় লেগেছিল।
“এজন্য প্রয়োজন ছিল সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য, জটিল মালামাল সরবরাহের ব্যবস্থা ও হাজার হাজার দক্ষ শ্রমিক, প্রকৌশলী ও প্রশাসকদের মধ্যে নিখুঁত সমন্বয়।”
এ বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল হাজার হাজার মানুষের কাজের তদারকি করা, বিশেষায়িত শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, প্রতিদিন তাদের খাবারের জোগান নিশ্চিত করা ও বড় আকৃতির সব পাথরের ব্লক এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার লজিস্টিকস সামাল দেওয়া।
আল-গাবরি বলেছেন, “লক্ষ্য, বিজ্ঞান, নিয়মানুবর্তিতা ও দৃঢ় সংকল্প একসঙ্গে মিশলে মানব সভ্যতা কী করতে পারে এই পিরামিড আমাদের সেটাই মনে করিয়ে দিয়েছে।
তার সঙ্গে একমত পোষণ করে গবেষক আসেম সালামা বলেছেন, “মিশরীয়রা সত্যিই মহাকালের বুকে টিকে থাকার মতোই এক অমর কীর্তি গড়ে গেছেন।”