Published : 03 Mar 2026, 03:50 PM
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা দেখাল। নিজেদের উদ্ভাবিত উন্নত প্রযুক্তির মিসাইল ও ড্রোনের বিশাল ভাণ্ডার ব্যবহার করে ইরান কেবল পাল্টা আক্রমণই করছে না, বরং আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকেও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন সাইট ইন্টারেস্টিং ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিবেদনে লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান দ্বন্দ্বে ইরান তাদের পাল্টা আক্রমণ অব্যাহত রাখতে নিজেদের দেশে তৈরি বিপুল পরিমাণ মিসাইল ও ড্রোনের ব্যবহার করছে।
মার্কিন-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরান বাহিনীর ব্যবহৃত সব অস্ত্র নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদ করেছে, পেরিয়েছে দীর্ঘ দূরত্ব। এসব অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্যাট্রিয়ট’ এবং ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’ ও ‘অ্যারো’র মতো উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের এ পাল্টা হামলার কৌশলটি স্তরভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যা তাদের প্রচলিত বিমান বাহিনীর শক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে তৈরি হয়েছে। এ কৌশলের অংশ হিসেবে নিজেদের বিভিন্ন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রকে বিভিন্ন সুরক্ষিত জায়গায় ছড়িয়ে রেখেছে ইরান, যাতে ক্রমাগত হামলার মধ্যেও সেগুলো সচল থাকে।
ইরানের এ পাল্টা হামলার কৌশলটি স্তরভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যা তাদের প্রচলিত বিমান বাহিনীর শক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে তৈরি হয়েছে
ব্যালিস্টিক মিসাইলের ভাণ্ডার
ইরানের পাল্টা আঘাতের মূল ভিত্তি স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল। এসব অস্ত্র এই অঞ্চলের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোতে দ্রুত হামলা চালানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
● স্বল্প পাল্লায় নিখুঁত লক্ষ্যভেদ: দ্রুততম পাল্টা হামলার জন্য সাধারণত ‘ফাতাহ-১১০’, ‘জোলফাগার’ ও ‘কিয়াম-১’-এর মতো মিসাইল ব্যবহার করে ইরান। এসব মিসাইল সলিড জ্বালানিতে চলে, ফলে এগুলো সহজেই বহনযোগ্য। অল্প সময়ে এগুলো মোতায়েন ও উৎক্ষেপণ করা যায়, যা শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার হাতে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ায় সময় বাঁচিয়ে দেয়।
● মধ্যম পাল্লার সক্ষমতা: আরেকটু বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ইরান ‘খোররামশাহর’, ‘ইমাদ’ ও ‘গাদার’ সিরিজের মিসাইল মোতায়েন করে। এর মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী খোররামশাহর মিসাইলটি দেড় হাজার কেজি ওজনের বড় যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে পারে এবং দুই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
● ‘ফাত্তাহ’ সিরিজের মতো নতুন মডেলগুলোতে রয়েছে ‘ম্যানুয়েভারেবল রিএন্ট্রি ভেহিকল’ প্রযুক্তি, যা মিসাইলটিকে লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছানোর শেষ মুহূর্তে নিজের গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা দেয়। ফলে শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একে আটকে দেওয়া বা ধ্বংস করা কঠিন। এসব মিসাইলের গতি শব্দের চেয়ে ১৩ থেকে ১৫ গুণ এবং এগুলোর পাল্লা প্রায় এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার।
এ মধ্যম পাল্লার ব্যবস্থাগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান কার্যকরভাবে পুরো ইসরায়েল এবং কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট বিবিন্ন সামরিক স্থাপনাকে নিজেদের হামলার সীমানার মধ্যে নিয়ে এসেছে।
ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন
ব্যালিস্টিক মিসাইলের পাশাপাশি ইরান ক্রুজ মিসাইল ও ‘ওয়ান ওয়ে’ অ্যাটাক ড্রোন বা আত্মঘাতী ড্রোন মোতায়েন করেছে। এসব অস্ত্র শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দিশেহারা বা অকেজো করে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়।
● ক্রুজ মিসাইল: ‘পাভেহ’, ‘সুমার’ ও ‘হোভেইজেহ’-এর মতো মিসাইলগুলো খুব নিচ দিয়ে ও ভূ-প্রকৃতির ভাঁজ অনুসরণ করে উড়ে যায়। ফলে রেডারের চোখ ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া সম্ভব, যা সফলভাবে আঘাত হানার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
● লয়টারিং মিউনিশন ড্রোন: দীর্ঘ সময় ধরে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইরানের প্রধান হাতিয়ার ‘শাহেদ’ ড্রোন। এর উন্নত ইঞ্জিন আড়াই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব পেরতে পারে এবং ৫০ কেজি ওজনের যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে সক্ষম।
সাধারণত এসব ড্রোন একসঙ্গে অনেকগুলো বা ঝাঁক বেঁধে উৎক্ষেপিত হয়। এতে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সুযোগে ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো সহজেই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
কৌশলগত গভীরতা ও স্থায়িত্ব
ইরানের সামরিক কৌশল তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। দেশটির মাটির নিচে ‘মিসাইল সিটি’ নামে পরিচিত বিশাল এক সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক রয়েছে, যেখানে তারা নিজেদের মিসাইল ও উৎক্ষেপণ যন্ত্রগুলো লুকিয়ে রাখে। এসব সুরক্ষিত টানেল থেকে কার্যক্রম পরিচালনার ফলে আকাশপথে হামলা চালিয়ে নিজেদের উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করা হলেও ইরান পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, নিজেদের এই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সামরিক কাঠামো ব্যবহার করছে ইরান, যাতে তারা কেবল একবার নয়, বরং বিরতিহীনভাবে পাল্টা জবাব দিয়ে যেতে পারে।
নিজেদের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল শক্তির সঙ্গে ড্রোন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলোর জন্য যুদ্ধের খরচ এবং ঝুঁকি সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে ইরান। যার মাধ্যমে এ সংঘাতকে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েছে দেশটি।