Published : 12 Apr 2026, 11:57 AM
স্মার্টফোনের অতিরিক্ত আসক্তি মানুষের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। তবে গবেষণা বলছে, সামান্য কয়েক দিনের ডিজিটাল ডিটক্স বা ইন্টারনেট বিরতি মানুষের মনোযোগের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ও মস্তিষ্কের প্রায় ১০ বছরের জড়তা কাটিয়ে দিতে পারে।
বিশ্বজুড়ে সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব এখন স্পষ্ট। গেল মাসেই ক্যালিফোর্নিয়ার আদালত যুগান্তকারী এক মামলায় প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা ও ইউটিউবকে ৬০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
আদালত শুনেছে ওই তরুণী কীভাবে এসব প্ল্যাটফর্মের ওপর আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। নিউ মেক্সিকোর আরেকটি মামলায় আদালত রায় দিয়েছে, মেটা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অঙ্গরাজ্য ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের দায়ে তাদের সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
এসব কোম্পানি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলেও আদালতে আন্দোলনকারীদের এই জয় ও অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে নতুন সব বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করেছে।
গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, কেবল ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা ইন্টারনেট বা ডিভাইস থেকে বিরতি নেওয়া ৪৬৭ জন অংশগ্রহণকারীর মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির পাশাপাশি বয়সের কারণে হওয়া ১০ বছরের মানসিক সক্ষমতার ঘাটতি বা জড়তা কাটিয়ে তুলতেও কার্যকর ভূমিকা রাখে।
‘পিএনএএস নেক্সাস’ নামের এ গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা একটি অ্যাপের মাধ্যমে টানা দুই সপ্তাহ তাদের ফোনের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রেখেছিলেন।
অংশগ্রহণকারীরা কেবল তাদের ফোনে কল করা ও মেসেজ পাঠানোর সুবিধা পেতেন। আর ইন্টারনেটের জন্য তারা ট্যাবলেট বা ল্যাপটপের মতো অন্য ডিভাইস ব্যবহার করতে পারতেন।
গবেষকরা বলছেন, কম্পিউটারের চেয়ে ফোনের ব্যবহার অনেক বেশি ‘নেশানির্ভর ও লক্ষ্যহীন’। এ ছাড়া ফোন মানুষের রাতের আহার, হাঁটতে যাওয়া বা সিনেমা দেখার মতো সামাজিক বিভিন্ন কাজে বারবার ব্যাঘাত ঘটায়।
গবেষণায় উঠে এসেছে, অংশগ্রহণকারীদের অনলাইনে কাটানো গড় সময় ৩১৪ মিনিট থেকে কমে ১৬১ মিনিটে নেমে এসেছে। দুই সপ্তাহ শেষে তারা নিজেদের মেজাজ বা মানসিক অবস্থা, মনোযোগ দেওয়ার সক্ষমতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির কথা বলেছেন।
গবেষণার লেখকরা লিখেছেন, “এ প্রভাবটি সহজভাবে বোঝাতে গেলে বলা যায়, মনোযোগে সক্ষমতার এই ইতিবাচক পরিবর্তনটি বয়সের কারণে হওয়া ১০ বছরের মানসিক সক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করার সমান।”
যেসব অংশগ্রহণকারী পুরোপুরি দুই সপ্তাহের এ ডিটক্স মেনে চলতে পারেননি, তাদের মধ্যেও উন্নতির লক্ষণ দেখা গেছে।
এ গবেষণার অন্যতম লেখক ও ‘জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি’র মনোবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কোস্টাডিন কুশলেভ বলেছেন, “আপনাকে যে সারাজীবনের জন্য নিজেকে আটকে রাখতে হবে তা নয়। কয়েক দিনের জন্য আংশিক ডিজিটাল ডিটক্সও বেশ কার্যকর।”
গবেষণার সহ-লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ অ্যালবার্টা স্কুল অফ বিজনেস’-এর সহযোগী অধ্যাপক নোয়া কাস্তেলো বলেছেন, নিজের দৈনন্দিন জীবনে সেলফোন কতটা ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই এ গবেষণার ধারণাটি এসেছে।
“এসব প্রযুক্তি আমাদের অন্যান্য আনন্দদায়ক কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, যেমন বন্ধুদের সঙ্গে ডিনারের মতো নানা মুহূর্ত।”
সাম্প্রতিক অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টফোন থেকে অল্প সময়ের জন্য দূরে থাকাও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
গেল নভেম্বরে ‘জামা নেটওয়ার্ক ওপেন’-এ প্রকাশিত হার্ভার্ডের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, যারা এক সপ্তাহ স্মার্টফোনের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও অনিদ্রার সমস্যা গড়ে অনেকটাই কমে এসেছে।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল’-এর সহযোগী অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জন তোরোস বলেছেন, সবাই একইরকম ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। ফলে বিজ্ঞানীদের কাছে এখন মূল কাজ সামাজিক মাধ্যম কাদের ওপর সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তাদের শনাক্ত করা।
অনলাইনে থাকার ক্ষতি ঠেকাতে বিভিন্ন দেশ ও অঙ্গরাজ্যের নীতিগুলো ভিন্ন ভিন্ন হচ্ছে। ম্যাসাচুসেটস এ সপ্তাহে এমন এক বিল পাসের দিকে আরও একধাপ এগিয়ে গেছে, যা রাজ্যে ১৪ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেবে।
অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সর্বশেষ দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে যাচ্ছে।
তোরোস বলেছেন, “কারো কারো ক্ষেত্রে এই ব্যবহার অনেক বেশি, কারো ক্ষেত্রে খুব কম, আবার অনেকের জন্য বিষয়টি একদম সঠিক। ফলে কাদের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, তা শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।”
তোরোস ও তার দল বিশেষ করে ওইসব মানুষদের নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী যারা অন্যদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করে হীনম্মন্যতায় ভোগেন, যাদের ঘুমের সমস্যা আছে এবং যারা একাকীত্ব কাটাতে ইন্টারনেটের দুনিয়াকে অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছেন।