Published : 12 Jan 2026, 12:05 PM
ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে মানুষ, তদন্তে এমন তথ্য উঠে আসার পর নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি কিছু ‘হেলথ সামারি’ বা স্বাস্থ্য বিষয়ক সংক্ষিপ্ত তথ্য সরিয়ে নিয়েছে গুগল।
মার্কিন সার্চ জায়ান্টটি বলেছে, তাদের ‘এআই ওভারভিউস’ অত্যন্ত ‘সহায়ক’ ও ‘নির্ভরযোগ্য’। টুলটি মূলত জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বা প্রশ্নের ওপর প্রয়োজনীয় তথ্যের এক সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ দেয়।
তবে সার্চ রেজাল্টের একদম উপরে দেখানো এসব সারসংক্ষেপের কিছু অংশ ভুল স্বাস্থ্য তথ্য দিয়েছিল। ফলে ব্যবহারকারীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে গার্ডিয়ান।
পত্রিকাটির তদন্তে এক বিশেষ ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা, যেটিকে ‘বিপজ্জনক’ ও ‘উদ্বেগজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন তারা। লিভার বা যকৃতের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সম্পর্কে এমন কিছু ভুল তথ্য দিয়েছিল গুগল, যা পড়ে লিভারের গুরুতর রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তিও নিজেকে সুস্থ ভেবে ভুল করতে পারতেন।
তদন্তে দেখা গেছে, ‘লিভার ব্লাড টেস্টের স্বাভাবিক সীমা কত?’ লিখে সার্চ করলে গুগল বিপুল পরিমাণ সংখ্যা বা ডেটা সামনে হাজির করছিল। তবে সেইসব তথ্যের সঙ্গে কোনো সঠিক প্রেক্ষাপট ছিল না এবং রোগীর জাতীয়তা, লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয় বা বয়সের ভিন্নতা অনুসারে তথ্যের পরিবর্তন হতে পারে, তা মোটেও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গুগলের ‘এআই ওভারভিউস’ যেসব মানকে স্বাভাবিক বলছে, বাস্তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষার সঙ্গে এর আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকতে পারে। এসব সারসংক্ষেপের কারণে গুরুতর অসুস্থ রোগীরাও ভুলবশত ভেবে বসতে পারেন যে তাদের পরীক্ষার রিপোর্ট ঠিক আছে। ফলে পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া বা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শ নেওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন তারা।
গার্ডিয়ানের তদন্তের পর ‘লিভার ব্লাড টেস্টের স্বাভাবিক সীমা কত? ও ‘লিভার ফাংশন টেস্টের স্বাভাবিক সীমা কত?’ এমন বিষয় লিখে সার্চ করলে আগে যেসব এআই সারসংক্ষেপ আসত সেগুলো সরিয়ে নিয়েছে গুগল।
এ বিষয়ে গুগলের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “সার্চ রেজাল্ট থেকে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য সরিয়ে ফেলার বিষয়ে আমরা আলাদা করে কোনো মন্তব্য করি না। যেসব ক্ষেত্রে এআই ওভারভিউস সঠিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে ব্যর্থ হয় সেখানে আমরা এর সার্বিক উন্নতির জন্য কাজ করি। এ ছাড়া আমাদের নীতিমালা অনুসারে যথাযথ ব্যবস্থা নিই।”
যকৃতের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা দাতব্য সংগঠন ‘ব্রিটিশ লিভার ট্রাস্ট’-এর জনসংযোগ ও নীতিমালা পরিচালক ভ্যানেসা হেবডিচ বলেছেন, “বিষয়টি চমৎকার সংবাদ। আমরা আনন্দিত যে, এমন পরিস্থিতিতে নিজেই এআই ওভারভিউস সরিয়ে নিয়েছে গুগল।
“তবে, প্রশ্নটি একটু ঘুরিয়ে করার ক্ষেত্রে এখনও বিভ্রান্তিকর এআই তথ্য চলে আসতে পারে। এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি অন্যান্য স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য ভুল ও অস্পষ্ট হতে পারে এই ভেবে আমরা এখনও উদ্বিগ্ন।”
বিশ্বের সার্চ ইঞ্জিন বাজারের ৯১ শতাংশই এখন গুগলের দখলে। কোম্পানিটি বলেছে, গার্ডিয়ান যেসব নতুন উদাহরণের বা ভুল তথ্যের কথা উল্লেখ করেছে সেগুলো খতিয়ে দেখছে তারা।
শুরুতে গুগলের কাছে গার্ডিয়ান যেসব উদাহরণের কথা তুলে ধরেছিল সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রে এখনও এআই সারসংক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। যার মধ্যে ক্যান্সার ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্যের সারসংক্ষেপও রয়েছে, যেগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ভুল’ ও ‘সত্যি সত্যিই বিপজ্জনক’ বলে বর্ণনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এসব এআই সারসংক্ষেপ কেন এখনও আছে– এমন প্রশ্নের জবাবে গুগল বলেছে, এগুলোতে সুপরিচিত ও নির্ভরযোগ্য উৎসের লিংক রয়েছে। কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি সে বিষয়েও এতে মানুষকে সচেতন করা হয়েছে।
গুগলের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমাদের নিজস্ব চিকিৎসক দল এসব তথ্য পর্যালোচনা করে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। তারা লক্ষ্য করেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই এসব তথ্য ভুল ছিল না ও নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন ওয়েবসাইটের তথ্যের সঙ্গে সেগুলোর মিল রয়েছে।”
কোম্পানিটি বলেছে, ‘এআই ওভারভিউস’ কেবল সেইসব প্রশ্নের ক্ষেত্রেই প্রদর্শিত হয় যেখানে উত্তরের মান সম্পর্কে কোম্পানিটির আত্মবিশ্বাস থাকে। নিয়মিত বিভিন্ন ক্যাটেগরির তথ্যের ওপর তাদের এসব সারসংক্ষেপের গুণমান পরিমাপ ও পর্যালোচনা করে গুগল।
এদিকে, ‘সার্চ ইঞ্জিন জার্নাল’-এর এক নিবন্ধে সিনিয়র লেখক ম্যাট সাউদার্ন বলেছেন, “সার্চ রেজাল্টের র্যাংকিংয়ে সবার উপরে ‘এআই ওভারভিউস’ দেখানো হয়। বিষয়টি স্বাস্থ্য সম্পর্কিত হলে সেখানে যে কোনো ভুলের গুরুত্ব বা প্রভাবও অনেক বেশি।”