Published : 09 May 2026, 05:08 PM
রাশিয়ায় ইন্টারনেটের ওপর সরকারের ক্রমাগত কড়াকড়ি ও সেন্সরশিপের কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন দেশটির ক্ষুদ্র ও অনলাইননির্ভর উদ্যোক্তারা।
রয়টার্স লিখেছে, জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ ও ভিপিএন ব্যবহারের ওপর রাশিয়ার বিধিনিষেধের ফলে একদিকে যেমন গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতির মুখে পড়ছে কোটি কোটি ডলারের ডিজিটাল বাণিজ্য।
রাশিয়ার কুকুরের পোশাক ব্যবসায়ী নাতালিয়া কুকোভিনেটসকে তার গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বারবার মেসেজিং অ্যাপ বদলাতে হচ্ছে। ক্রেমলিনের ক্রমাগত ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের মুখে যেসব অনলাইননির্ভর ব্যবসা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে নাতালিয়ার কোম্পানিটি তাদেরই একটি।
এ বছর রাশিয়াজুড়ে জনপ্রিয় অ্যাপ টেলিগ্রামের ওপর বিধিনিষেধ, ভিপিএন ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি ও নিরাপত্তার অজুহাতে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে।
এ অনিশ্চিত ইন্টারনেট বিভ্রাট ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এক চরম ভোগান্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে ঝুঁকির মুখে পড়েছে কয়েকশ কোটি ডলারের ডিজিটাল বাণিজ্য।
সরকার টেলিগ্রামের রাশ টেনে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও তা এখনও দেশটির অন্যতম শীর্ষ যোগাযোগ মাধ্যম। ২০২২ সালে রুশ কর্তৃপক্ষ ইনস্টাগ্রাম ও গেল ফেব্রুয়ারিতে হোয়াটসঅ্যাপ নিষিদ্ধ করার পর থেকে নাতালিয়ার ব্র্যান্ড ‘ওয়াগ’ন টেলস’-এর পণ্য বিক্রির একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে টেলিগ্রাম।
মস্কোতে নিজের কারখানায় দাঁড়িয়ে কুকোভিনেটস বলেছেন, “গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে টেলিগ্রামই এখন আমাদের সব।”
অ্যাপটিতে কুকুরপ্রেমীদের জন্য নকশা করা টুপি ও পোশাক তৈরি করেন তিনি।
‘শান্তি, বন্ধুত্ব, কুকুরছানা’ লেখা নিজের তৈরি টি-শার্ট পরা অবস্থায় তিনি বলেছেন, “এখন নতুন অনুরোধ বা অর্ডার ট্র্যাক করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। ভিপিএন ছাড়া তা কাজই করে না, আর প্রায়ই কোনো নোটিফিকেশন আসে না।”
এ সংকটে তিনি একা নন। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সের তথ্য অনুসারে, দেশটির প্রায় ২৯ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি কোম্পানি ও এক কোটি ৪১ লাখ ফ্রিল্যান্সার ব্যবসার কাজে বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করেন।
এরপরও মস্কোতে টানা কয়েকদিন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না বলে এ সপ্তাহে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ক্রেমলিন।
মার্চেও রাশিয়ার রাজধানীতে প্রায় তিন সপ্তাহ ইন্টারনেট পরিষেবা বিঘ্নিত হয়েছিল এবং দেশের অন্যান্য প্রান্তেও নিয়মিত এমনটা করা হচ্ছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছেন, নিরাপত্তার খাতিরে ইন্টারনেটের ওপর এমন বিধিনিষেধ জরুরি। তবে সরকারের এ নীতি দেশটির ব্যবসায়ী মহলের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে।
স্বাধীন জরিপ সংগঠন ‘লেভাদা’র মার্চের এক জরিপ অনুসারে, রাশিয়ার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন এ কড়াকড়ি তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
‘গ্রাহকরা চিৎকার শুরু করে দিয়েছিল’
মস্কোর রেস্তোরাঁ ‘স্ক্রেপকা’ বলেছে, এপ্রিলে ইন্টারনেটের ওপর কড়াকড়ির কারণে তৈরি এক কারিগরি জটিলতায় তারা ইস্টার উৎসবের ঐতিহ্যবাহী আইসড কেকের অসংখ্য অনলাইন অর্ডার প্রসেস করতে ব্যর্থ হয়।
রেস্তোরাঁটির ম্যানেজার দারিয়া তেরেরিনা বলেছেন, “টেলিগ্রাম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রাহকরা ক্ষোভে চিৎকার শুরু করে দিয়েছিল, যা আমাদের কোম্পানির সুনামের জন্য বড় ক্ষতি।”
ইন্টারনেটের ওপর এ ধরনের বিধিনিষেধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে কোনো সরকারি তথ্য নেই।
তবে ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্টারনেট ট্রেড কোম্পানিজ’ নামের এক শিল্প সংগঠনের মার্চের হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রাশিয়ায় প্রায় ১৫ হাজার ৩৭৪ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য ও সেবা বিক্রি হয়েছে।
মস্কোভিত্তিক প্রপার্টি কোম্পানি ‘ডিএনএ রিয়ালটি’র প্রধান আন্তন বেলিখ বলেছেন, “শহরের প্রাণকেন্দ্রে থাকলে আমি মেসেজগুলো অনেক পরে পাই। সব মিলিয়ে বড় অসুবিধার তৈরি করছে। ক্লায়েন্টরা তাদের আয় হারাচ্ছে, যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত আমরা ও আমাদের ক্লায়েন্ট উভয় পক্ষই আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছি।”
তবে এসব পদক্ষেপ সোভিয়েত আমলের দমনমূলক তথ্য নিয়ন্ত্রণের পুনরাবৃত্তি– এমন সমালোচনা ক্রেমলিন বাতিল করে বলেছে, এসব ব্যবস্থা কেবল সাময়িক।
অদূর ভবিষ্যতে মেসেজিং অ্যাপগুলোর ব্যবহার স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা খুব কমই দেখা যাচ্ছে। রুশ কর্তৃপক্ষ বর্তমানে টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালাচ্ছে।
পাশাপাশি ‘ম্যাক্স’ নামে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এক মেসেজিং অ্যাপ প্রচার করছে রাশিয়া। অনেক রুশ নাগরিক অ্যাপটি ব্যবহারে বেশ শঙ্কিত এবং তা ডাউনলোড করতে অস্বীকার করছেন।