Published : 21 Jun 2026, 03:20 PM
মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতি কি আসলেই কমে যাচ্ছে? গেল বছরের এক গবেষণার এমন চাঞ্চল্যকর দাবিকে এবার সরাসরি নস্যাৎ করে দিলেন একদল বিজ্ঞানী, যার মধ্যে রয়েছেন দুজন নোবেলজয়ীও।
তারা বলেছেন, রহস্যময় ‘ডার্ক এনার্জি’র প্রভাবে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি স্তিমিত হওয়া তো দূরের কথা, বরং তা প্রতিনিয়ত আরও বাড়ছে।
তারার এক বিশেষ ধরনের বিস্ফোরণের ডেটা বা তথ্য নতুনভাবে বিশ্লেষণ করে গবেষক দলটি বলেছে, মহাবিশ্ব আসলেই দ্রুততর গতিতে প্রসারিত হচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এ তত্ত্বটির ওপর ভিত্তি করেই মূলত ১৯৯০-এর দশকে ‘ডার্ক এনার্জি’র মতো রহস্যময় মহাজাগতিক শক্তির অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে।
গেল বছরের গবেষণায় উঠে এসেছিল, মহাবিশ্বের এ প্রসারণের গতি আর বাড়ছে না, যা সে সময় মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের মৌলিক ধারণাকেই একরকম চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এ মাসে ‘রয়াল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’র ‘মান্থলি নোটিসেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত নতুন গবেষণার প্রধান গবেষক ও ইংল্যান্ডের ‘ইউনিভার্সিটি অফ সাউদাম্পটন’-এর জ্যোতির্পদার্থবিদ ব্রোডি পপোভিক বলেছেন, “মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি দিন দিন বাড়ছে।
“মহাবিশ্ব সম্পর্কে এমন অনেক কিছুই এখনও আমাদের অজানা, যা জানার জন্য আমরা দারুণ উৎসুক। তবে আমাদের অনুমান, আমরা একদম সঠিক পথেই এগোচ্ছি।”
এ গবেষণাটি হয়েছে নোবেলজয়ী দুই বিজ্ঞানীসহ একদল গবেষকের হাত ধরে, যেখানে মহাবিশ্বের বিশাল দূরত্ব পরিমাপের জন্য ‘টাইপ ওয়ান-এ সুপারনোভা’ নামের এক বিশেষ ধরনের তারা বিস্ফোরণের দুটি ভিন্ন ডেটাসেট ব্যবহার করেছেন তারা।
এ ধরনের সুপারনোভা ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ বা শ্বেত বামন নামের তারার ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি হয়, যা আসলে কম থেকে মাঝারি ভরের কোনো তারার জীবনচক্রের শেষ মুহূর্তের ঘন এক রূপ।
সবকটি বিস্ফোরণের উজ্জ্বলতা প্রায় একই রকম হওয়ার কারণে মহাবিশ্বের গঠন উন্মোচনে এ বিশেষ ধরনের সুপারনোভা গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রমাণ মিলেছে। পৃথিবী থেকে এদের দূরত্বভেদে উজ্জ্বলতার তারতম্য ঘটে, যেমন কাছে থাকলে বেশি উজ্জ্বল আর দূরে থাকলে তা আবছা দেখায়।
এ বৈশিষ্ট্যের কারণেই জ্যোতির্বিজ্ঞানে এদেরকে মহাজাগতিক দূরত্বের মাইলফলক বা নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব সুপারনোভার উজ্জ্বলতা পরিমাপ করে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গতির পরিবর্তন বা ওঠানামা নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে পারেন।
মহাকাশে আলোর ভ্রমণের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়। ফলে মহাবিশ্বের দূরবর্তী কোনো বস্তুর দিকে তাকানো মানে আসলে সুদূর অতীতের দিকে তাকানো।
প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর আগে ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল এবং তখন থেকেই প্রতিনিয়ত প্রসারিত হয়ে চলেছে।
পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথম প্রকাশ করেছিলেন, এ প্রসারণের গতি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, যার পেছনে ডার্ক এনার্জির অদৃশ্য ও রহস্যময় শক্তি কাজ করছে বলে ধারণা রয়েছে।
মহাবিশ্বের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে আছে সাধারণ পদার্থ, যেমন তারা, গ্রহ, গ্যাস, ধূলিকণা ও পৃথিবীর পরিচিত সবকিছু। তেমনই রয়েছে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি। সাধারণ পদার্থ মহাবিশ্বের মোট উপাদানের কেবল ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, ছায়াপথ ও তারার ওপর নিজের মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে পরিচিত ডার্ক ম্যাটার প্রায় ২৭ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। আর ডার্ক এনার্জির পরিমাণ আনুমানিক ৬৮ শতাংশ।
তবে ২০২৫ সালে একই বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণার লেখকেরা দাবি করেছিলেন, ডার্ক এনার্জি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা মহাবিশ্বের প্রসারণের গতিকে বাড়ানো বন্ধ করে দিয়েছে।
নতুন এ গবেষণার সহ-লেখক ও ২০১১ সালে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি বেড়ে যাওয়ার যৌথ আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিদ্যায় নোবেলজয়ী মেরিল্যান্ডের ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র জ্যোতির্পদার্থবিদ অ্যাডাম রেইস বলেছেন, “মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস পরিমাপের জন্য টাইপ ওয়ান-এ সুপারনোভা হচ্ছে সবচেয়ে সেরা মাধ্যম। আর এর সূত্র ধরেই ১৯৯৮ সালে প্রথম প্রমাণ মিলেছিল, ডার্ক এনার্জির কারণে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি দিন দিন বাড়ছে।
“গত এক দশক ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ইয়নসেই ইউনিভার্সিটি’র একটি গবেষক দল দাবি করে আসছে, যেসব তারা একপর্যায়ে বিস্ফোরিত হয় এদের বয়স বিবেচনায় রেখে সুপারনোভার দূরত্ব নতুনভাবে পরিমাপ করা উচিত। তাদের মতে, বয়সের প্রভাব বা ‘এজ ইফেক্ট’ মহাবিশ্বের গতি বেড়ে যাওয়ার প্রমাণকে অনেকটাই বদলে দিতে পারে।
“আমাদের গবেষণায় গত এক দশকে মহাবিশ্ব বিজ্ঞানীদের ব্যবহৃত সবচেয়ে বড় সুপারনোভা ডেটাসেটগুলো বিশ্লেষণ করে এ কথিত ‘বয়সের প্রভাব’-এর কোনো প্রমাণ মেলেনি।”
অন্যদিকে, সিউলে অবস্থিত ‘ইয়নসেই ইউনিভার্সিটি’র জ্যোতির্পদার্থবিদ ইয়ং-উক লি ২০২৫ সালের ওই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি এখন তার দলের দেওয়া তথ্যকেই জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন।
লি’র দাবি, “নতুন গবেষণার মূল বিভিন্ন যুক্তিতে গুরুতর পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে বা এ গবেষণায় এমন কিছু উপসংহার টেনেছে, যা তাদের নিজেদের যুক্তির সঙ্গেই অসঙ্গতিপূর্ণ।”
এদিকে, নিজেদের কাজের পদ্ধতি ও মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি বেড়ে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী নতুন গবেষণার বিজ্ঞানীরা।
ডার্ক এনার্জির প্রকৃত ভৌত রূপ বা উৎস আসলে কী তা এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে বড় রহস্য। সম্প্রতি চিলিতে সচল হওয়া ‘ভেরা রুবিন অবজারভেটরি’ ও আগামী অগাস্টে উৎক্ষেপণের অপেক্ষায় থাকা ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ’-এর মতো আধুনিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এ বিষয়ে নতুন কোনো আলোর দিশা দেখাতে পারে।
গবেষক পপোভিক বলেছেন, “আমরা আশা করছি ভেরা রুবিন ও ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ থেকে আমরা যেসব নতুন তথ্য পাব তা ডার্ক এনার্জির আসল রহস্য উন্মোচনে আমাদের আরও একধাপ এগিয়ে দেবে।”