Published : 30 Apr 2026, 11:52 AM
গর্ভধারণ রোধে এবার পুরুষদের জন্যও আসতে চলেছে কার্যকর জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিজ্ঞানীরা হরমোনমুক্ত একটি বড়ি উদ্ভাবন করেছেন, যার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
প্রায় ১৭০ বছর ধরে পুরুষদের জন্য কেবল কনডমই একমাত্র অস্থায়ী সমাধান হিসেবে থাকলেও এই নতুন আবিষ্কার জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ম্যাগাজিন পপুলার মেকানিক্স।
প্রায় ৭৫ শতাংশ নারীর ধারণা, গর্ভধারণ রোধে নারী-পুরুষ উভয়েরই সমান দায়িত্ব থাকা উচিত। তবে এই `যৌথ দায়িত্বের’ বিষয়টি বাস্তবের চেয়ে কল্পনায় বেশি দেখা যায়। কারণ বর্তমানে বাজারে থাকা জন্মনিয়ন্ত্রণের বেশিরভাগ পদ্ধতিই নারীদের জন্য তৈরি।
আসলে, পুরুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে গবেষণা এতটাই পিছিয়ে যে, বাজারে তাদের জন্য অনুমোদিত পদ্ধতি কেবল দুটি; কনডম ও ভ্যাসেকটমি।
তবে সাম্প্রতিক এক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা চিকিৎসা গবেষণা পুরুষদের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে আরও সহজলভ্য করে তুলতে পারে, যা প্রায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত।
এ গবেষণা সংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি ২০২৫ সালে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘কমিউনিকেশনস মেডিসিন’-এ প্রকাশ পেয়েছে।
গবেষণায় ‘ইওরচয়েস থেরাপিউটিকস’-এর তৈরি হরমোনমুক্ত পুরুষ জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির সহনশীলতা ও ‘বায়ো-অ্যাভেইলেবিলিটি’ বা শরীরে এ ওষুধের জমা হওয়ার মাত্রা পরীক্ষা করা হয়েছে।
গবেষণায় ৩২ থেকে ৫৯ বছর বয়সী ১৬ জন সুস্থ পুরুষ অংশ নিয়েছেন। বড়িটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকায়, তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রজনন সক্ষমতা যাতে ঝুঁকির মুখে না পড়ে সেজন্য কেবল যাদের ‘ভ্যাসেকটমি’ করা আছে তাদেরই এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
‘ওয়াইসিটি-৫২৯’ নামের নতুন ওষুধটি শুক্রাণু উৎপাদন ও নিঃসরণ বন্ধ করার মাধ্যমে কাজ করে। গবেষণার সময় অংশগ্রহণকারীদের দুটি দলে ভাগ করে ওষুধের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা দেওয়া হয়েছে।
শুরুর দিকে তারা খালি পেটে এ বড়ি সেবন করেন। পরবর্তীতে গবেষকরা প্রতিটি দল থেকে কয়েকজনকে বেছে নিয়ে ভারী নাশতার পর ওষুধটি সেবন করান, যাতে দেখা যায় খাবারের পুষ্টিগুণ এ ওষুধের সহনশীলতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে কি না।
গবেষণায় উঠে এসেছে, বড়িটি শরীরের জন্য বেশ সহনশীল; অংশগ্রহণকারীদের হৃদস্পন্দন, রক্তের গুণাগুণ বা টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রায় কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ গবেষণার প্রধান লেখক নাদজা মানোওয়েটজ বলেছেন, ‘ওয়াইসিটি-৫২৯’ পুরুষদের যৌন ইচ্ছা বা মেজাজের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। ওষুধটি নারীদের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির তুলনায় অনেক আলাদা। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী কোনো না কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন।
এ ট্রায়ালটি ‘ওয়াইসিটি-৫২৯’ এর ওপর করা আগের গবেষণাগুলোরই ধারাবাহিকতা। আগের গবেষণায় ইঁদুর ও প্রাইমেটদের (বানর জাতীয় প্রাণী) ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, ছয় সপ্তাহ পর এ ওষুধের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে কেটে যায় এবং প্রজনন সক্ষমতা আগের অবস্থায় ফিরে আসে, যার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।
বর্তমানে বড়িটি গর্ভধারণ রোধে কতটা কার্যকর সেই তথ্য সংগ্রহ করছে ‘ইওরচয়েস থেরাপিউটিকস’। তবে অন্যান্য জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির মতো এ ওষুধও যৌনবাহিত রোগ ঠেকাতে পারে না।
পুরুষদের এ জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়িটি শরীরের জন্য কতটা সহনশীল তা বেশ আশাব্যঞ্জক হলেও ‘ওয়াইসিটি-৫২৯’ এর সফলতা অন্য এক বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে; পুরুষরা কি আসলে এই বড়ি সেবনে আগ্রহী হবেন?
‘ইওরচয়েস থেরাপিউটিকস’ এর সিইও আকাশ বক্সী বলেছেন, এর উত্তর ইতিবাচক বলেই মনে হচ্ছে।
“বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে বারবার দেখা গেছে, পুরুষরা গর্ভধারণ রোধের দায়িত্ব তাদের সঙ্গীর সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান। তবে তাদের কাছে স্থায়ী নয় এমন বিকল্প মাত্র একটিই আছে, কনডম, যা ১৭০ বছরের পুরানো। এ ক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবন অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল।
“তথ্য বলছে, পুরুষরা হরমোনমুক্ত খাবার বড়ি বা ওরাল কন্ট্রাসেপ্টিভ বেশি পছন্দ করেন। সেই হিসেবে ‘ওয়াইসিটি-৫২৯’ স্বাস্থ্যসেবার এমন একটি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে, যা গত দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে স্থবির হয়ে আছে।”