Published : 16 Feb 2026, 12:00 PM
একঘেয়ে প্রোফাইল ব্রাউজিং আর অন্তহীনভাবে ফোনের স্ক্রিন ডানে-বায়ে সোয়াইপ করতে গিয়ে অনেকে ক্লান্ত। আবার অনেকে জনপ্রিয় বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপে হাজারো মানুষের ভিড়েও একাকী। প্রযুক্তির দুনিয়ায় এখন মনের মতো সঙ্গী খুঁজে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
কিন্তু এআইয়ের মাধ্যমে ডেটিংয়ের এই নতুন দুনিয়া মানুষের একাকীত্ব দূর করতে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। যন্ত্রের ছোঁয়ায় কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব রক্ত-মাংসের মানুষের সেই কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসা?
ব্রিটিশ দৈনিক পত্রিকা গার্ডিয়ান লিখেছে, বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপ আপনাকে ব্যবহার করছে, আপনার সঙ্গে ডেটিং প্রোফাইলগুলো মিথ্যা বলছে, আর যৌনতা এখন প্রায় সেকেলে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই যখন অবস্থা তখন একবার ভেবে দেখতেই পারেন এআই কি সত্যিই আপনাকে ভালোবাসা খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে?
কয়েকজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও লন্ডনের সাহসী কিছু মানুষের জন্য এর উত্তর হচ্ছে ‘হয়ত’।
না, বিষয়টি কোনো মানুষের ‘সেক্সি’ কম্পিউটার ভয়েসের প্রেমে পড়ার গল্প নয়। সত্যি বলতে কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করে ডেটিংয়ের বিষয়টি বেশ কিছুদিন ধরেই প্রচলিত। গত কয়েক বছরে নিজেদের সেবার মান বাড়াতে মেশিন লার্নিং ও এআইয়ের বিভিন্ন ফিচার যোগ করেছে বড় বড় ডেটিং প্ল্যাটফর্ম।
রোবটচালিত এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন বা গতানুগতিক ডেটিংয়ের প্রতি ক্লান্তি এবং ক্রমাগত একাকীত্বের সংকট নতুন একদল স্টার্টআপকে উৎসাহিত করেছে এসব ডেটিং অ্যাপ তৈরিতে। প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে একটু ভিন্নভাবে কাজে লাগাতে চাইছে এসব কোম্পানি।
২৮ বছর বয়সী জেসমিন তিন বছর ধরে সিঙ্গেল থাকার পর এআইচালিত ডেটিং অ্যাপ ‘ফেইট’ ডাউনলোড করেছেন। তার মতে, ‘হিঞ্জ’ বা ‘টিন্ডার’-এর মতো জনপ্রিয় বিভিন্ন অ্যাপে সবকিছুই বড্ড ‘একঘেয়ে’, বিশেষ করে একই আলাপচারিতার বারবার পুনরাবৃত্তি।
জেসমিন বলেছেন, “আমি ভাবলাম, কেন সাইন-আপ করে নতুন কিছু চেষ্টা করে দেখব না? এজেন্টিক এআই ব্যবহারের বিষয়টি বেশ দারুণ। আর পৃথিবী তো এখন এ পথেই এগোচ্ছে, তাই না?”
গত বছরের মে মাসে যাত্রা শুরু করেছে লন্ডনভিত্তিক স্টার্টআপ ‘ফেইট’। নিজেদেরকে বিশ্বের প্রথম ‘এজেন্টিক এআই ডেটিং অ্যাপ’ হিসেবে দাবি করেছে স্টার্টআপটি। যার মূল আকর্ষণ ‘ফেইট’ নামের এক এআই ব্যক্তিত্ব, যা ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে বা ইন্টারভিউ নেওয়ার মাধ্যমে অ্যাপে যোগ করে।
এ এআই ব্যবহারকারীর স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও জীবনের কঠিন সময়গুলো সম্পর্কে জানতে চায়। এরপর কোনো রকম ‘সোয়াইপ’ বা ডানে-বামে সোয়াইপ ছাড়াই সরাসরি পাঁচটি সম্ভাব্য ম্যাচ বা সঙ্গীর নাম প্রস্তাব করে।
ব্যবহারকারী চাইলে তাদের আলাপচারিতার সময় কোচ বা পরামর্শদাতা হিসেবেও কাজ করে ‘ফেইট’। জেসমিনের কাছে এ সুবিধাটি বেশ কার্যকর মনে হলেও অন্য একজন ব্যবহারকারীর মতে এ ছিল ‘ভীতিকর’ ও অনেকটা সায়েন্স ফিকশন সিরিজ ‘ব্ল্যাক মিরর’-এর গল্পের মতো।
‘ফেইট’-এর প্রতিষ্ঠাতা রাকেশ নাইডু এ অ্যাপের ‘কোচিং’ বা পরামর্শ দেওয়ার সক্ষমতাটির বিষয়ে নিজের ফোনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখন চ্যাটিং বা আলাপচারিতার ক্ষেত্রে আমি নিজেকে একটু অসহায় বোধ করছি। আমার মনে হচ্ছে আমি যথেষ্ট আকর্ষণীয় বা অর্থপূর্ণ কথা বলতে পারছি না। আমার এমন কিছু গভীর প্রশ্ন দরকার, যা মানুষের ভেতরের আসল রূপটি উন্মোচন করতে সাহায্য করবে।”
তার ফোন থেকে কৃত্রিম এক নারী কণ্ঠ উত্তর দিল, “আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি, রাকেশ। এখানে কয়েকটি আইডিয়া দিচ্ছি। যেমন তোমার কি এমন কোন শখের কাজ আছে, যা নিয়ে তুমি খুব উৎসাহী তবে খুব বেশি মানুষ তা জানেন না?”
২৮ বছর বয়সী নাইডু বলেছেন, তিনি ‘ফেইট’ তৈরি করেছেন টিন্ডার, বাম্বল বা হিঞ্জ-এর মতো বিশ্বের বড় বড় ডেটিং প্ল্যাটফর্মের সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য। তার মতে, এসব অ্যাপ ব্যবহারকারীদের অতিবাহিত সময়ের ওপর ভিত্তি করে অর্থ আয় করে এবং ‘মানুষকে একাকী রাখার মাধ্যমেই মূলত মুনাফা লুটছে’।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ‘সিচ’ থেকে শুরু করে ‘কিপার’-এর মতো আরও অনেক স্টার্টআপ বাজারে এসেছে। তাদের আশা, এআইয়ের নতুন সব ফিচার ব্যবহার করে এ বিশাল প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারবে তারা।
অনেক সংখ্যাক তথ্য বিশ্লেষণ করার জন্য এআইয়ের সক্ষমতাকে কাজে লাগায় ‘সিচ’। তারা ব্যবহারকারীদের উৎসাহিত করতে বলে, “আমাদের বিস্তারিত তথ্য দিন, পছন্দের চুলের রং থেকে শুরু করে কোথায় পরিবার নিয়ে থাকতে চান বা আপনার প্রিয় গান সবকিছুই জানান’।
অন্যদিকে ‘কিপার’ দাবি করে, তারা এমন কাউকে খুঁজে দিতে পারে যার সঙ্গে আপনার ‘প্রকৃত জীবনসঙ্গী হওয়ার মতো বিরল সম্ভাবনা’ রয়েছে।
নাইডু বলেছেন, মূল সমস্যার একটি বড় কারণ হচ্ছে প্রচলিত বিভিন্ন অ্যাপের অ্যালগরিদম বা গাণিতিক পদ্ধতি। যেমন এক সময় টিন্ডার তাদের ব্যবহারকারীদের আকর্ষণীয়তা পরিমাপ করত ‘এলো স্কোর’ নামের এক পদ্ধতির মাধ্যমে। এ পদ্ধতিটি দাবা খেলোয়াড়দের র্যাংকিং করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
ডেটিং প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেকটা রূঢ় প্রতিযোগিতার মতো, যাদের স্কোর বেশি তাদের প্রোফাইল কেবল উচ্চ স্কোরধারীদেরই দেখানো হয়, আর কম স্কোরধারীরা কেবল নিজেদের মতোই প্রোফাইল দেখতে পান।
নাইডু বলেছেন, “এ পুরো প্রক্রিয়াটি ভাসাভাসা বা অগভীর।”
তাত্ত্বিকভাবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এআই ভিন্ন পথ দেখাতে পারে। চ্যাটবটের কাছে নিজের প্রেমজীবন নিয়ে কথা বলা কিছুটা অস্বস্তিকর মনে হলেও ‘ফেইট’ কাউকে তার উত্তরের ভিত্তিতে কোনো নম্বর দেয় না। এর বদলে, একটি ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ বা এলএলএম ব্যবহার করে এমন সব ব্যবহারকারীদের খুঁজে বের করে যাদের ব্যক্তিত্ব বা চিন্তাধারা সেই ব্যক্তির সাক্ষাৎকারের তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়।
নাইডুর মতে, এ পদ্ধতি ও এআই কোচ ব্যবহারকারীদের অকৃত্রিম এক সম্পর্ক তৈরিতে সাহায্য করে, যেখানে ‘ব্যক্তিত্বের মিল ও পারস্পরিক বিনিময়’ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
তবে এ পদ্ধতি নিয়ে কিছুটা চিন্তিত ‘ম্যাচ গ্রুপ’ বা টিন্ডার ও হিঞ্জের মালিক-এর কনসালট্যান্ট অ্যামেলিয়া মিলার।
তাদের প্রতিষ্ঠানের করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় পাঁচ হাজার ইউরোপীয় নাগরিকের ডেটিং পছন্দ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। সেখানে উঠে এসেছে, অনেক ব্যবহারকারী ভুয়া প্রোফাইল শনাক্ত করতে বা ক্ষতিকর ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করতে এআইয়ের সাহায্য নিতে আগ্রহী হলেও প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষই তাদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এআইয়ের হস্তক্ষেপের ব্যাপারে সন্দিহান।
এর বড় কারণ ভয়াবহ এক ভবিষ্যৎ কল্পনা, যেখানে হয়ত দুটি ‘এজেন্টিক এআই’ একে অপরের সঙ্গে কথা বলবে, আর আড়ালে থাকা রক্ত-মাংসের মানুষ দুটি কেবল নামমাত্র ‘শর্টকাট আইকন’ হয়ে থাকবে।
তবে এআইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা অ্যামেলিয়া মিলার এক ভিন্ন চিত্র দেখছেন। তিনি বলেছেন, অনেক ক্লায়েন্টই সম্পর্কের ছোটখাটো বা অস্বস্তিকর বিভিন্ন মুহূর্তে পরামর্শের জন্য বিভিন্ন এলএলএস বা চ্যাটজিপিটির ওপর নির্ভর করছেন। যেমন, কাউকে টেক্সট পাঠানোর আগে তা কীভাবে গুছিয়ে লিখতে হবে বা কোনো অন্তরঙ্গ প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দিলে ভালো হবে তা এআইকে জিজ্ঞেস করছেন।
“আমি প্রায়ই মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করি, বিকল্প আছে বলেই যেন তারা যন্ত্রের দিকে ঝুঁকে না পড়েন। কারণ, একজন মানুষের কাছে নিজের দুর্বলতা বা মনের কথা প্রকাশের জন্য যে সাহসের প্রয়োজন হয় প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে মানুষ এখন সেই সাহসিকতাটুকু দেখাতেও অস্বস্তি বোধ করছে।”
‘ফেইট’-এর মতো এআই কোচের আকর্ষণ এখানেই যে, এর কাছে নিজের বিচার-বুদ্ধি, আশা বা অদ্ভুত সব স্বভাবের কথা অকপটে বলা যায়। কারণ এতে কোনো সামাজিক ঝুঁকি নেই। এআই আপনাকে বিচার করবে না বা আপনার কথা মনে রেখে খোটা দেবে না। তবে বন্ধুরা তা করেন।
মিলারের ধারণা, বন্ধুদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া আসলে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দক্ষতা ঝালিয়ে নিতে সাহায্য করে।
“মানুষের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া এমন এক মাধ্যম, যার মাধ্যমে মানুষ খুব ছোট পরিসরে নিজের আবেগ বা দুর্বলতাকে প্রকাশ করার চর্চা করে। এসব ছোট পদক্ষেপই পরবর্তীতে রোমান্টিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় কোনো আবেগী মুহূর্তে নিজেকে মেলে ধরতে সাহায্য করে।”