Published : 07 Mar 2026, 10:33 AM
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এখন কেবল তেল বা সামরিক ঘাঁটিই নয়, ডেটা সেন্টারগুলোও সরাসরি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারে ইরানের ড্রোন হামলা বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তাকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
রোববার দেশটির অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস বা এডব্লিউএস ডেটা সেন্টারগুলোতে ইরান ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর পরপরই আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, এ সপ্তাহের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যাংকিং, পেমেন্ট, এন্টারপ্রাইজ ও ভোক্তা সেবাগুলোয় বিভ্রাট দেখা দিয়েছে।
কোম্পানিগুলো তড়িঘড়ি করে নিজেদের সার্ভার অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ায় অনেক সেবা এরইমধ্যে সচল হয়েছে। তবে প্রতিদিন ব্যবহৃত এসব পরিষেবার এ স্থবিরতা থেকে ইঙ্গিত মেলে, ডিজিটাল অবকাঠামো এখন এক কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
গেল সপ্তাহে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে পাল্টা আক্রমণ চালায় তেহরান। তাদের এ হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সামরিক ঘাঁটি, তেল ও গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র এবং বিভিন্ন ডেটা সেন্টার।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বর্তমানে ২০০টিরও বেশি এমন কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে সাশ্রয়ী জ্বালানি ও জমি সুবিধার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যামাজন বা গুগলের মতো বড় মার্কিন কোম্পানিগুলো অনেক বিনিয়োগ করেছে।
পরামর্শক কোম্পানি ‘হিলকো গ্লোবাল’-এর ভূ-রাজনৈতিক ইউনিটের নির্বাহী পরিচালক প্যাট্রিক জে মারফি বলেছেন, “ইরান ও তাদের মিত্ররা অতীতে বিভিন্ন তেল ক্ষেত্রকে লক্ষ্যবস্তু করলেও এই সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডেটা সেন্টারে হামলর মানে, এগুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত করা হচ্ছে।”
গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো
সোমবার এডব্লিউএস বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের দুটি স্থাপনা সরাসরি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে এবং বাহরাইনেও একটি স্থাপনা কাছাকাছি হওয়া অন্য একটি হামলার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বলেছে, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সহায়তার অপরাধে’ বাহরাইনের ওই স্থাপনাটি ইরানের ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর’ বা আইআরজসি টার্গেট করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে এডব্লিউএস সার্ভার ব্যবহারকারী বিভিন্ন কোম্পানিকে পরিষেবা সচল রাখতে দ্রুত অন্য অঞ্চলের সার্ভারে স্থানান্তরিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন পরিষেবাকে ‘বিঘ্নিত’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল এডব্লিউএস।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেটা সেন্টারের কৌশলগত গুরুত্বকে ক্রমাগতভাবে স্বীকার করে নিচ্ছে বিভিন্ন দেশের সরকার। যুক্তরাষ্ট্র এগুলোকে তাদের ১৬টি ‘গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাতের’ অন্তর্ভুক্ত করেছে।
এদিকে, যুক্তরাজ্য ২০২৪ সালে এগুলোকে ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও এগুলোকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। ইউরোপসহ বিশ্বের আরও অনেক দেশ এখন ডেটা সেন্টারকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ড্রোন যুদ্ধের উত্থান বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল জীবন সচল রাখা এসব অবকাঠামোর নিরাপত্তার বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
‘হিলকো গ্লোবাল’-এর মারফি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন ডেটা সেন্টারকে ইরানের লক্ষ্যবস্তু করার মানে, এখন থেকে অন্য সরকারগুলোও তাদের জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনায় জ্বালানি কেন্দ্র, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, পানি শোধনাগার এবং পরিবহন হাবগুলোর পাশাপাশি ডেটা সেন্টারগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
এ যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে ডেটা সেন্টারগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে সিএনবিসি’র মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি এডব্লিউএস, মাইক্রোসফট ও গুগল।
আইনজীবী সংগঠন ‘হোগান লাভেলস’-এর অবকাঠামো ও জ্বালানি দলের পার্টনার স্কট টিন্ডাল বলেছেন, গত কয়েক দিনে অনেক ডিজিটাল পরিষেবা পুনরায় চালু করা হলেও ইরানি ড্রোন হামলার কারণে এখন একাধিক অঞ্চলে ডেটা ব্যাকআপ রাখা এবং বিকল্প ব্যবস্থার দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হতে পারে।
তিনি আরও বলেছেন, ‘অভিজ্ঞ ডেটা সেন্টার অপারেটররা’ আগে থেকেই বিস্তারিত ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করে থাকেন তবে সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেগুলোকে সম্ভবত ‘পুনরায় পর্যালোচনা’ করতে হবে।