Published : 26 May 2026, 10:08 AM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যেন মানবজাতির প্রতিপক্ষ না হয়ে প্রগতির হাতিয়ার হয় সেই আহ্বান জানিয়েছেন পোপ চতুর্দশ লিও।
৪২ হাজারেরও বেশি শব্দের এক বিশেষ দলিলে তিনি এআই’কে মানুষের সমকক্ষ ভাবার ভুল ধারণা নিয়ে সতর্ক করেন এবং এর অনৈতিক ব্যবহার ঠেকাতে বিশ্বনেতাদের কঠোর নীতিমালা তৈরির তাগিদ দিয়েছেন।
তবে সতর্ক বার্তার পাশাপাশি পোপ লিও প্রযুক্তিটিকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মানবকল্যাণে ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
সোমবার পোপ লিও নিজের প্রথম ‘পেপাল এনসাইক্লিক্যাল’ প্রকাশ করেছেন, যা ক্যাথলিক চার্চের প্রায় ৪০০ বছরের পুরানো এক ঐতিহ্য। যার মাধ্যমে কোনো বিশেষ বিষয়ের ওপর চার্চ তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত প্রকাশ করে।
এ দলিলে পোপ লিও সতর্ক করে বলেছেন, “এ ধরনের বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের বুদ্ধিমত্তার সমকক্ষ ভাবাটা মস্ত বড় ভুল ধারণা। এসব সিস্টেম কেবল মানুষের বুদ্ধিমত্তার কিছু নির্দিষ্ট কার্যকারিতাকে অনুকরণ বা নকল করে মাত্র।
“আর এমনটা করতে গিয়ে এরা প্রায়শই গতি ও গণনাসক্ষমতার দিক থেকে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যায়, যা অনেক ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাস্তব সুবিধাও বয়ে আনে।
“প্রচলিত এআই কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় না, এদের কোনো দেহ নেই, এরা আনন্দ বা বেদনা অনুভব করে না, সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এরা পরিপক্ক হয়ে ওঠে না এবং ভালোবাসা, কাজ, বন্ধুত্ব বা দায়িত্ববোধের প্রকৃত অর্থ কী তা এরা ভেতর থেকে উপলব্ধি করতে পারে না।
“এদের কোনো নৈতিক বিবেকও নেই। ফলে এরা ভালো ও মন্দের বিচার করতে পারে না, কোনো পরিস্থিতির অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করতে পারে না বা নিজের কাজের ফলাফলের জন্য কোনো দায়ভার বহন করে না।
“এরা কেবল মানুষের ভাষা, আচরণ ও বিশ্লেষণমূলক দক্ষতা অনুকরণ, সহানুভূতি এবং বোঝাপড়ার অভিনয়ও করতে পারে। তবে এরা নিজেরা কী তৈরি করছে তা এরা বোঝে না। কারণ এদের মধ্যে সেই আবেগীয়, পারস্পরিক সম্পর্ক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব রয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষ প্রজ্ঞায় ও জ্ঞানে বিকশিত হয়।”
পোপ লিও মার্কিন এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস্টোফার ওলাহ্-এর উপস্থিতিতে এমন বক্তব্য পেশ করেছেন।
তিনি বলেছেন, “ন্যায়বিচার ধরে রাখতে ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার নেতিবাচক বা বিকৃত প্রভাবগুলোকে ঠেকাতে পারে এমন উপযোগী নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা বা আইনি কাঠামো তৈরি করা জরুরি।”
তিনি এ বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন যে, সম্পদ এরইমধ্যে খুব সীমিত কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে এবং তা যেন আরও বেশি একচেটিয়া রূপ না নেয় তা নিশ্চিত করা এখন সম্পূর্ণভাবে বিভিন্ন দেশের সরকারের দায়িত্ব।
এ একই ধারায় তিনি আরও বলেছেন, বিশ্বনেতাদের অবশ্যই এমনটা নিশ্চিত করতে হবে যেন ভবিষ্যতে অস্ত্র বা যুদ্ধ সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত মানুষই নেয়, কোনো এআই নয়।
ডিজিটাল যুগের উপযোগী এক ‘শিক্ষামূলক জোট’ গড়ে তোলারও আহ্বান জানিয়েছেন পোপ লিও, যা তরুণ প্রজন্মকে এআই সম্পর্কে সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে ও সত্য সন্ধানের প্রতি তৈরি হওয়া এক ধরনের ‘উদাসীনতা’ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করবে।
পাশাপাশি, আইনি নীতিমালার মাধ্যমে তরুণদের এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি ‘সহিংস বা মর্যাদাহানিকর’ কনটেন্ট, অনলাইন ব্ল্যাকমেইলিং ও যৌন নিপীড়ন থেকে সুরক্ষিত রাখার তাগিদও দিয়েছেন পোপ লিও।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের প্রযুক্তি এবং এর থেকে আসা যে কোনো মুনাফা যেন নিয়মতান্ত্রিক বা গণহারে চাকরিচ্যুতির অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। বদলে এআইয়ের কারণে যেসব শ্রমিকের চাকরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তাদের জন্য পুনরায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান সুরক্ষার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।
তবে এআইয়ের সার্বিক অস্তিত্বের বিরুদ্ধে পোপ লিও তার এই মন্তব্য করেননি। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, এআইকে যেন ‘মানবতার শত্রু বা প্রতিপক্ষ কোনো শক্তি’ হিসেবে দেখা না হয়।
তিনি বলেছেন, এআইকে যদি সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা যায় তবে তা ‘সব দিকেই সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে’।
এরই ধারাবাহিকতায় গেল ফেব্রুয়ারিতে ভ্যাটিকান সিটি ‘ট্রান্সলেটেড’ নামের এক ভাষা পরিষেবা সরবরাহের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে, যার উদ্দেশ্য ‘পবিত্র মাস’-এ উপস্থিত হওয়া পুণ্যার্থীদের জন্য এআইচালিত লাইভ অনুবাদের সুবিধা দেওয়া।