Published : 27 Jan 2026, 04:45 PM
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আসক্তি কি কেবলই অভ্যাস নাকি এর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির পরিকল্পিত কোনো ফাঁদ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে শুরু হয়েছে ঐতিহাসিক এক আইনি লড়াই।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে সামাজিক মাধ্যমে আসক্তি সংক্রান্ত ঐতিহাসিক এই মামলার বিচার শুরু হয়েছে। এ মামলায় সাক্ষ্য দিতে ডাক পড়েছে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানি প্রধানদের।
বিবিসি লিখেছে, মামলাটি দায়ের করেছেন ১৯ বছর বয়সী এক তরুণী (যাকে ‘কেজিএম’ বলা হয়েছে)। তার অভিযোগ, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা ইউটিউবের মতো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমের গঠন বা নকশা তাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত করে তুলেছে ও তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মামলায় অভিযুক্তের তালিকায় রয়েছে ইনস্টাগ্রাম ও ফেইসবুকের মূল কোম্পানি মেটা, টিকটকের মালিক বাইটড্যান্স ও ইউটিউবের মূল কোম্পানি গুগল। এদিকে, গত সপ্তাহে বাদীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করেছে স্ন্যাপচ্যাট।
লস অ্যাঞ্জেলেস সুপিরিয়র কোর্টে শুরু হওয়া আলোচিত এ মামলাটির দিকে রয়েছে পুরো বিশ্বের নজর। কারণ, এ ধরনের অসংখ্য মামলার মধ্যে এ মামলাটিই প্রথম। এ মামলার রায় যদি বাদীর পক্ষে যায় তবে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি এতদিন যে আইনি সুরক্ষা কবজ ব্যবহার করে দায় এড়িয়ে আসত তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
‘বিপজ্জনক ও আসক্তি তৈরিকারী অ্যালগরিদম’
মামলায় অভিযুক্ত সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলোর দাবি, অভিযোগকারী তরুণী এমন কোনো শক্ত প্রমাণ দিতে পারেননি, যা প্রমাণ করে, তার বিষণ্ণতা বা খাদ্যাভ্যাসের সমস্যার জন্য এসব প্ল্যাটফর্মই দায়ী।
এ মামলার বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হওয়াকে মার্কিন বিচারব্যবস্থায় এক বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের পাহাড় জমছে, যেখানে তাদের তৈরি বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যে নেশার মতো আসক্তি তৈরি করছে।
এসব কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে ‘সেকশন ২৩০’ নামের বিশেষ এক আইনের আশ্রয় নিয়ে আসছে। এ আইন অনুসারে, তাদের প্ল্যাটফর্মে অন্য কেউ কী পোস্ট করল তার জন্য কোম্পানিকে দায়ী করা যায় না।
তবে এ মামলার লড়াইটি সেখানে নয়। এ মামলায় এখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এসব অ্যাপের ডিজাইন বা গঠন নিয়ে। কীভাবে অ্যালগরিদম কাজ করবে, কখন নোটিফিকেশন আসবে ও অন্যান্য ফিচার কীভাবে মানুষকে অ্যাপ ব্যবহারে বাধ্য করবে– এসব বিষয়কেই এখানে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।
অভিযোগকারী তরুণীর আইনজীবী ম্যাথিউ বার্গম্যান বলেছেন, প্রথমবারের মতো এবারই কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোম্পানিকে সাধারণ মানুষের বা জুরির সামনে তাদের কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হচ্ছে।
“দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমেরিকা, ব্রিটেনসহ গোটা বিশ্বে এমন অসংখ্য শিশু-কিশোর রয়েছে যারা কেজিএমের মতোই ভুগছে। বিভিন্ন সামাজিক প্ল্যাটফর্ম তাদের এই বিপজ্জনক ও আসক্তি তৈরি করে এমন অ্যালগরিদম সরল ও অসচেতন শিশুদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।
“এসব কোম্পানিকে এখন সাধারণ মানুষের (জুরি) কাছে জবাব দিতে হবে যে, কেন তাদের কাছে ব্যবসার মুনাফা তরুণ প্রজন্মের জীবনের চেয়ে বেশি দামী।”
‘সান্তা ক্লারা ইউনিভার্সিটি’র আইনের অধ্যাপক এরিক গোল্ডম্যান বলেছেন, এ মামলাতে হেরে গেলে তা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম কোম্পানির জন্য ‘অস্তিত্বের সংকট’ তৈরি করতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সামাজিক মাধ্যমে দেখানো কোনো কনটেন্ট বা বিষয়ের কারণেই কারোর শারীরিক ক্ষতি হয়েছে এমনটি আদালতে প্রমাণ করা বাদীদের জন্য কঠিন হতে পারে।
তার মতে, “বাদীরা যেভাবে এ যুক্তিটিকে সামনে এনেছেন তা আইনের জগতে সম্পূর্ণ নতুন কিছু প্রশ্ন তুলেছে। প্রচলিত আইন আসলে এই ধরনের জটিল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।”
‘এতদিন বিশেষ সুবিধা পেয়ে এসেছে প্রযুক্তিখাত’
বিচারের সময় জুরিদের সামনে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নথিপত্রসহ নানা ধরনের তথ্য-প্রমাণের ডাক পড়বে। ‘ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অফ আমেরিকা’র আইনের অধ্যাপক মেরি গ্রাও লিয়ারি বলেছেন, “এসব কোম্পানি এতদিন যা কিছু প্রকাশ্যে আনতে চায়নি তার অনেক কিছুই এখন আদালতে ফাঁস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
মেটা আগে দাবি করেছিল, টিনএজারদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডজনখানেক নতুন টুল বা ফিচার চালু করেছে তারা। তবে এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেক গবেষকই।
এসব প্রযুক্তি কোম্পানি আদালতে যুক্তি দিতে পারে, ব্যবহারকারীদের যা কিছু ক্ষতি হয়েছে তার জন্য তারা দায়ী নয়, বরং অন্য ব্যবহারকারী বা থার্ড পার্টির দেওয়া কনটেন্ট দায়ী।
এ মামলার অন্যতম দিক হচ্ছে মার্ক জাকারবার্গের সাক্ষ্য। এ মামলার বিচার শুরুর দিন আদালতে হাজির হওয়ার কথা রয়েছে মেটা প্রধানের।
এর আগে, ২০২৪ সালে মার্কিন সিনেটরদের সামনে জাকারবার্গ বলেছিলেন, “কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি যে, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের কারণে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে।”
সেই একই শুনানিতে একজন সিনেটরের চাপের মুখে সেখানে উপস্থিত ভুক্তভোগী বিভিন্ন পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন জাকারবার্গ।