Published : 07 Jun 2026, 03:11 PM
ক্যারিবীয় সাগরের নীল জলরাশিতে ঘেরা ছোট্ট এক বিন্দুর মতো দ্বীপরাষ্ট্র, কুরাসাও। জনসংখ্যা মাত্র দেড় লাখ, আয়তনে আমাদের রাজধানী ঢাকার প্রায় অর্ধেক।
একসময় স্প্যানিশ ঔপনিবেশিকরা অবজ্ঞা করে এ দ্বীপের নাম দিয়েছিল ‘আইলা ইনুতিলেস’ বা ‘অকেজো দ্বীপ’। কারণ সেখানে ছিল না কোনো সোনাদানা কিংবা মিঠা পানির উৎস। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই ‘অকেজো’ তকমা ঝেড়ে ফেলে কুরাসাও এখন বিশ্ব ফুটবলের নতুন বিস্ময়।
গত নভেম্বরে জ্যামাইকার বিপক্ষে ড্র করে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো কোয়ালিফাই করে কুরাসাও। জনসংখ্যা আর আয়তনে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট দেশগুলোর একটি হিসেবে বিশ্বকাপে খেলবে তারা। আর তাদের এই আকাশছোঁয়া স্বপ্নের সারথি হিসেবে নেপথ্যে জড়িয়ে গেছে লাল-সবুজের বাংলাদেশের নামও।

২০২৬ বিশ্বকাপকে পাখির চোখ করে এগোচ্ছে কুরাসাও। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে একসময় অনেক পেছনে থাকলেও, বর্তমানে তারা বড় বড় পরাশক্তিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। ডাচ কিংবদন্তি কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের স্পর্শে বদলে গেছে দলটি। ইউরোপের বিভিন্ন নামী লিগে খেলা কুরাসাওয়ান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের এক সুতোয় গেঁথেছেন তিনি।
কুরাসাওয়ের এ যাত্রা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন এক বিশ্লেষণে বলেছে, “কুরাসাও ফুটবল এখন আর কেবল আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; ডাচ শৃঙ্খলা এবং আধুনিক কৌশলের মিশেলে তারা উত্তর আমেরিকার ফুটবলে এক নতুন শক্তির উত্থান ঘটিয়েছে।”
কুরাসাও যখন মাঠে দৌড়ায়, তখন তাদের গায়ে থাকে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ‘অ্যাডিডাস’-এর জার্সি। নীল রঙের সেই দৃষ্টিনন্দন জার্সির পরতে মিশে আছে বাংলাদেশের সামিউর রেজার নামও। তিনি পড়াশোনা করেছেন জার্মানির হোখশুলে নিডাররাইনে। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি ডিজাইন, টেক্সটাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসা ও প্রযুক্তি শিক্ষার জন্য পরিচিত।

জার্মানির হার্জোগেনাউরাখে অবস্থিত অ্যাডিডাসের সদর দপ্তরে ‘অ্যাপারেল ডেভেলপার’ হিসেবে কাজ করেন সামিউর। কুরাসাওয়ের ২০২৪-২৫ মৌসুমের হোম কিট, অ্যাওয়ে কিট এবং প্রি-ম্যাচ জার্সির ‘ফেব্রিক ডেভেলপমেন্ট’ ও ‘প্যাটার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং’ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
ঢাকার সন্তান সামিউর জানান, একটি জার্সির নকশা কেবল রঙ আর অঙ্কনের বিষয় নয়, এতে জড়িয়ে থাকে সূক্ষ্ম বিজ্ঞান। সমুদ্র উপকূলীয় আর্দ্র আবহাওয়ায় ফুটবলাররা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারেন, সেজন্য জার্সির কাপড়ের মান ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো- যেমন: ঘাম শোষণ ক্ষমতা ও বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা হয়েছে।
ফুটবল ওয়েবসাইট ‘সকারবাইবেল’ কুরাসাওয়ের নতুন জার্সির প্রশংসা করে লিখেছে, “কুরাসাওয়ের নতুন কিটগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে দ্বীপটির সংস্কৃতির এক চমৎকার মেলবন্ধন দেখা যাচ্ছে, যা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে।”

নেদারল্যান্ডসের হয়ে তিনটি ভিন্ন মেয়াদে কোচের দায়িত্ব পালন করা ডিক অ্যাডভোকাট এখন কুরাসাওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন। ডাচ সংবাদমাধ্যম এনওএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “কুরাসাওয়ের ফুটবলারদের মধ্যে যে প্রতিভা আমি দেখেছি, তা অবিশ্বাস্য। আমরা কেবল বিশ্বকাপে খেলতে চাই না, সেখানে লড়াই করতে চাই।”
বাছাইপর্বে বার্বাডোজ ও সেন্ট লুসিয়ার মতো দলগুলোকে হারানো কুরাসাও তাদের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ডাচ ‘টোটাল ফুটবল’ দর্শনের সঙ্গে ক্যারিবীয় শক্তির এই সংমিশ্রণই তাদের মূল হাতিয়ার।
আসছে ১৪ জুন যখন হিউস্টনের সবুজ ঘাসে কুরাসাওয়ের ফুটবলাররা নামবে, তখন গ্যালারিতে হয়তো বাংলাদেশের পতাকা থাকবে না। কিন্তু ফুটবলারদের গায়ে জড়ানো নীল জার্সিতে অদৃশ্য অক্ষরে খোদাই করা থাকবে বাংলাদেশের নাম। ফুটবল যে সীমানা মানে না, কুরাসাও আর সামিউর রেজার এ গল্প যেন তারই উদাহরণ।