Published : 01 Jun 2026, 05:09 PM
শব্দের গতিসীমা পেরিয়ে গেলেও তৈরি হবে না কোনো বিকট আওয়াজ, এমন অনন্য এক প্রযুক্তি নিয়ে প্রথমবারের মতো সুপারসনিক ফ্লাইট টেস্টের মুখোমুখি হচ্ছে নাসার পরীক্ষামূলক প্লেন ‘এক্স-৫৯’।
জুনের শুরুতে হতে যাওয়া এ ঐতিহাসিক পরীক্ষাটি ভবিষ্যতে শব্দহীন বাণিজ্যিক সুপারসনিক উড়ানের নতুন দুয়ার উন্মোচন করতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট আইএফএলসায়েন্স।
আসন্ন সপ্তাহগুলোতে নিজেদের সর্বশেষ এই সুপারসনিক জেটের পরীক্ষা শুরু করবে নাসা, যা অন্য যে কোনো সাধারণ সুপারসনিক জেটের মতো নয়। সুপারসনিক জেটের প্রচলিত সেই তীব্র বিকট শব্দ ছাড়াই শব্দের গতিসীমা পেরোবে ‘এক্স-৫৯’।
জেটটি গেল অক্টোবরে নিজের উদ্বোধনী ফ্লাইটের পর থেকে এরইমধ্যে ১৪ বার উড়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত যেসব পরীক্ষা চালানো হয়েছে তা ছিল প্লেনটির সাধারণ প্রকৌশল বা ইঞ্জিনিয়ারিং যাচাইয়ের জন্য। এবার জেটটি দেখাবে শব্দহীন সুপারসনিক উড়ান।
এ প্রদর্শনীতে এক্স-৫৯ প্লেনটি প্রায় ৪৩ হাজার ফুট উচ্চতায় প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজার ১৪ কিলোমিটারের চেয়েও বেশি গতিতে উড়বে। এ সময় প্লেনটির বড় মাইলফলক ও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
নাসার ‘লো বুম ফ্লাইট ডেমনস্ট্রেটর’-এর প্রজেক্ট ম্যানেজার ক্যাথি বাহম বলেছেন, “এরপর যা হতে যাচ্ছে, সেখানে এ অনন্য প্লেনটি প্রথমবারের মতো সুপারসনিক গতিতে উড়বে। এক্স-৫৯-কে যে মিশন কন্ডিশন টেস্ট পয়েন্টের জন্য ডিজাইন করেছে, আমরা এখন সেটির দিকেই এগোচ্ছি।”
সনিক বুম কী ও কীভাবে তৈরি হয়?
সনিক বুম হল বজ্রপাতের মতো এক ধরনের প্রচণ্ড শব্দ, যা কোনো বস্তু বাতাসের মধ্য দিয়ে শব্দের গতির চেয়ে দ্রুত গতিতে চলার সময় তৈরি হয়। এমনটা অনেক জোরালো শব্দশক্তির এক আকস্মিক নির্গমন, যে কারণে শব্দটা এত বিকট হয়।
সুপারসনিক প্লেন খুব একটা দেখা যায় না এবং এগুলো সাধারণত জনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে ওড়েও না। এরপরও কেউ হয়ত সনিক বুমের কথা শুনে থাকবেন।
চাবুক মারার সময় চাবুকের কানফাটানো যে আওয়াজ হয়, তা সনিক বুমের চমৎকার এক উদাহরণ হতে পারে। কারণ চাবুকের অগ্রভাগ শব্দের চেয়েও দ্রুত গতিতে চলে। তবে চাবুকের আওয়াজটি খুবই ক্ষুদ্র একটি সনিক বুম। চাবুকের অগ্রভাগের ভরবেগ কোনো জেটের মতো অত বেশি নয়।
পদার্থবিজ্ঞানের গভীর স্তর থেকে বিশ্লেষণ করলে সনিক বুমে চাপের তরঙ্গ দেখা যায়। কোনো বস্তু যখন তরল বা বায়বীয় মাধ্যমের মধ্য দিয়ে গতিশীল হয় তখন সেটি নিজের সামনে ও পেছনে চাপের তরঙ্গ তৈরি করে। এসব তরঙ্গ ওই নির্দিষ্ট মাধ্যমে শব্দের গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
একটি প্লেন যখন ধীরে ধীরে শব্দের গতির কাছাকাছি পৌঁছায় তখন তার সামনে থাকা বিভিন্ন তরঙ্গ একে অপরের সঙ্গে একদম চেপে বা সংকুচিত হয়ে যায়। বস্তুটি যখনই শব্দের গতিকে অতিক্রম করে চলে যায় তখন সেসব তরঙ্গ একসঙ্গে মিশে একটি একক ‘শকওয়েভ’ বা ধাক্কা-তরঙ্গে রূপ নেয় এবং প্রচণ্ড বিস্ফোরণ বা ‘বুম’ শব্দ তৈরি করে।
‘এক্স-৫৯’ কীভাবে সনিক বুম এড়িয়ে চলে?
শব্দের চেয়ে উচ্চ গতিতে চলমান যান ক্রমাগত সনিক বুম বা শব্দ-বিস্ফোরণ তৈরি করতে থাকে। প্লেনে থাকা যাত্রীদের জন্য তা ভ্রমণের দ্রুত মাধ্যম হলেও প্লেনের চলার পথের নিচে থাকা মানুষদের কাছে এ অবিরাম বজ্রপাতের মতো আওয়াজটি খুব বিরক্তিকর।
এ কারণেই ‘এক্স-৫৯’-এর পরীক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ প্লেনটি এমন এক বাণিজ্যিক সুপারসনিক যানের পথ সুগম করতে পারে, যা যে কোনো জায়গার ওপর দিয়ে উড়ে যাবে।
সনিক বুম এড়ানোর জন্য এক্স-৫৯-এর সেই চাপের তরঙ্গগুলোকে ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। এমনটা করার মূল রহস্যটি লুকিয়ে আছে প্লেনের চিকন ও সুচালো নাকের মধ্যে, যা ৩০.৩ মিটার মোট দৈর্ঘ্যের এ প্লেনের এক-তৃতীয়াংশ জায়গা জুড়ে রয়েছে।
‘এক্স-৫৯’কে আশা করা হচ্ছে, শিগগিরই প্লেনটি শব্দহীনভাবে ওড়ার সক্ষমতা দেখাবে। তবে প্লেনটি কোনো বাণিজ্যিক যানের হুবহু নকশা বা ব্লুপ্রিন্ট নয়, অর্থাৎ প্লেনটিতে কেবল কিছু আসন বা সিট যোগ করে দিলেই তা যাত্রীবাহী প্লেন হয়ে যাবে না।
এরপরও সুপারসনিক উড়ানের ঐতিহাসিক বিবর্তনের দিকে তাকালে এ পরীক্ষাটিকে মৌলিক বা ভিত্তিগত হিসেবে বিবেচনা করা যায়। যেমন, রকেট ইঞ্জিনচালিত ‘বেল এক্স-১’ প্লেনটি পরবর্তী সময়ে সুপারসনিক ‘কনকর্ড’ প্লেনের উন্নয়নে দিকনির্দেশণা ও তথ্য দিয়েছিল।
বাহম বলেছেন, “আমরা প্লেনটির ভবিষ্যত ফ্লাইটের দিকে যখন এগিয়ে যাচ্ছি তখন আমরা সক্ষমতার সীমানাকে আরও বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। যে মিশনের উদ্দেশ্যে প্লেনটি তৈরি হয়েছে, আমরা সেদিকেই সাহসিকতার সঙ্গে এগোচ্ছি।
“সুপারসনিক গতিতে ওড়া ও এসব মাইলফলকে পৌঁছানো কেবল অগ্রগতিই নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা অধ্যবসায়, উদ্ভাবন ও দলগত কাজের বাস্তব রূপ। প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের পরবর্তী ধাপ ও বাণিজ্যিক সুপারসনিক উড়ানের ভবিষ্যতের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।”