১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ডার্ক এনার্জি, ভিনগ্রহের রহস্য খুঁজতে রওনা হচ্ছে নাসার নতুন টেলিস্কোপ

হাজার হাজার নতুন গ্রহ আবিষ্কার এবং আমাদের সৌরজগতের মতো অন্যান্য গ্রহ ব্যবস্থার প্রথম পরিসংখ্যানগত শুমারি প্রদান করবে রোমান টেলিস্কোপ।

ডার্ক এনার্জি, ভিনগ্রহের রহস্য খুঁজতে রওনা হচ্ছে নাসার নতুন টেলিস্কোপ
এ প্রকল্পটির বাজেট প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 Aug 2026, 07:09 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:00 PM

মহাবিশ্বের দুই বড় রহস্য ডার্ক এনার্জি ও ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধান এবং সৌরজগতের বাইরের নতুন গ্রহের খোঁজে নতুন স্পেস টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণ করতে যাচ্ছে নাসা।

হাবল ও জেমস ওয়েবের উত্তরসূরি ৪০০ কোটি ডলারের এ পর্যবেক্ষণাগারটি ফ্লোরিডা থেকে স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন হেভি’ রকেটে করে মহাকাশে পাঠানো হবে।

এর প্যানারমিক ভিউ ও দ্রুত জরিপ চালানোর সক্ষমতা মহাবিশ্বের গঠন, বিবর্তন ও আইনস্টাইনের অভিকর্ষ তত্ত্ব পুনরায় পরীক্ষায় বিজ্ঞানীদের নতুন দুয়ার উন্মোচন করবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

প্রাথমিক সময়সূচির চেয়ে প্রায় নয় মাস আগেই রোববার ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন হেভি রকেটে করে ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ’ উৎক্ষেপিত হবে।

এ প্রকল্পটির বাজেট প্রায় ৪০০ কোটি ডলার।

১৯৯০ সালে উৎক্ষেপিত হাবল ও ২০২১ সালের জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের উত্তরসূরি হিসেবে কাজ করবে ন্যান্সি গ্রেস রোমান। আগের দুটি টেলিস্কোপের জ্ঞানকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে নতুন পর্যবেক্ষণাগার রোমান টেলিস্কোপের।

নতুন এ টেলিস্কোপটির সমান সক্ষমতায় মহাবিশ্বের গঠন, উপাদান ও বিবর্তন নিয়ে এমনভাবে গবেষণার সুযোগ আগে কখনো সম্ভব হয়নি।

বিচিত্র, দুর্লভ ও অস্বাভাবিকতার খোঁজে

মেরিল্যান্ডে নাসার ‘গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার’-এর ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান’-এর জ্যেষ্ঠ প্রকল্প বিজ্ঞানী জুলি ম্যাকএনরি বলেছেন, “রোমানের বিস্তৃত পরিধি আমাদের বিচিত্র, দুর্লভ ও অদ্ভুত সব উপাদান খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।

“মহাকাশের বড় এলাকা দ্রুত ও কার্যকরভাবে জরিপের সক্ষমতার সঙ্গে চমৎকার দক্ষতা ও সংবেদনশীলতার এক অসাধারণ সংমিশ্রণ ঘটেছে রোমানের প্রধান যন্ত্রটিতে।”

টেলিস্কোপটির মূল জরিপ সম্পন্ন হতে এক বছরেরও বেশি সময় লাগবে।

তিনি বলেছেন, “এ জরিপে প্রায় দুইশ কোটিরও বেশি ছায়াপথ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। যার মাধ্যমে আমাদের মহাবিশ্বের গঠন, যেমন তারা, ছায়াপথ ও ছায়াপথপুঞ্জ কীভাবে বেড়েছে ও বিবর্তিত হয়েছে তা অনুসূলন করা সম্ভব হবে।

“সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাবিশ্ব কীভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে, আমরা তা-ও পরিমাপ করব। আর এগুলোই হবে ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি ও মহাবিশ্বের মূল কাঠামোর মৌলিক রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি।”

প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর আগের মহাবিস্ফোরণ বা ‘বিগ ব্যাং’-এর মাধ্যমে মহাবিশ্ব তৈরি হয় এবং তারপর থেকেই তা ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে।

১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা প্রকাশ করেছেন, এ সম্প্রসারণের গতি মূলত বাড়ছেই, আর এর নেপথ্য কারণ হিসেবে ‘ডার্ক এনার্জি’ নামের এক অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

মহাবিশ্বের উপাদানের মধ্যে রয়েছে দৃশ্যমান পদার্থ, যেমন তারা, গ্রহ, গ্যাস, ধূলিকণা ও পৃথিবীর পরিচিত বস্তুসমূহ। পাশাপাশি রয়েছে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি, যাদের ভৌত প্রকৃতি এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে অজানা।

সাধারণ পদার্থ মহাবিশ্বের মোট উপাদানের কেবল ৫ শতাংশের মতো। ছায়াপথ ও তারার ওপর অভিকর্ষ প্রভাবের কারণে শনাক্ত হওয়া ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ প্রায় ২৭ শতাংশ। আর বাকি প্রায় ৬৮ শতাংশ জুড়ে রয়েছে ডার্ক এনার্জি।

রোমান টেলিস্কোপের বিজ্ঞান দলের সদস্য ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট ডালাস’-এর বিশ্বতত্ত্ববিদ মুস্তাফা ইশাক বলেছেন, “মূল প্রশ্ন হচ্ছে, ডার্ক এনার্জি কি মহাশূন্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্য, যা সময়ের সঙ্গে অপরিবর্তিত থাকে নাকি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়?

“ডার্ক এনার্জি স্পেকট্রোস্কোপিক ইনস্ট্রুমেন্ট বা ডিইএসআই-এর সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে ডার্ক এনার্জির সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

“তবে মহাবিশ্বের এ সম্প্রসারণ কি এটাই নির্দেশ করে যে, মহাজাগতিক পরিসরে আমাদের অভিকর্ষ তত্ত্বের সংশোধন প্রয়োজন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই আধুনিক মহাবিশ্বতত্ত্বের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।”

আইনস্টাইনের তত্ত্ব

১৯১৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রকাশ করেন, যা অভিকর্ষ বলের ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং আজও এ তত্ত্ব আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি।

‘গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং’ নামের বিশেষ এক প্রক্রিয়ার সাহায্যে আলো কীভাবে বস্তুর মাধ্যমে বেঁকে যায় ও ছায়াপথগুলো কীভাবে একসঙ্গে অবস্থান করে তা চিহ্নিত করবে ন্যান্সি গ্রেস রোমান।

মুস্তাফা ইশাক বলেছেন, “এসব পরিমাপের মাধ্যমে আমরা পরীক্ষা করতে পারব যে আইনস্টাইনের তত্ত্ব কোটি কোটি আলোকবর্ষ জুড়েই কার্যকর রয়েছে নাকি অভিকর্ষ তত্ত্বে কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে।

“এমনটা জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক একটি প্রশ্নের উত্তর দেবে। প্রশ্নটি হচ্ছে, মহাজাগতিক পরিসরে পুরো মহাবিশ্ব কোন নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছে?”

পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৩৫০টিরও বেশি ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ বা বহির্গ্রহ আবিষ্কার করেছেন।

রোমান টেলিস্কোপটি এসব বহির্গ্রহের খোঁজে এযাবৎকালের অন্যতম বিস্তৃত অনুসন্ধান চালাবে। হাজার হাজার নতুন গ্রহ আবিষ্কার এবং আমাদের সৌরজগতের মতো অন্যান্য গ্রহ ব্যবস্থার প্রথম পরিসংখ্যানগত শুমারি প্রদান করবে রোমান টেলিস্কোপ।

এ ছাড়া তুলনামূলক আমাদের সৌরজগতের কাছাকাছি থাকা কিছু বহির্গ্রহের সরাসরি ছবি তোলার নতুন প্রযুক্তিও দেখাবে।

উৎক্ষেপণ ও রকেট থেকে আলাদা হওয়ার পর টেলিস্কোপটি ‘ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ২’ নামের স্থানে রওনা হবে, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ১৬ লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

এ দূরত্ব পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বের চার গুণ। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপটিও একই কক্ষপথে অবস্থান করছে, যেখানে হাবল টেলিস্কোপ রয়েছে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে।

রোমানের প্রাথমিক মিশনটি পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। তবে নাসা বলেছে, টেলিস্কোপটিতে আরও অতিরিক্ত পাঁচ বছর চলার মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে রোমান টেলিস্কোপের বাজেট কমানো বা পুরোপুরি বন্ধ করার চেষ্টা করা হলেও মার্কিন কংগ্রেস সেই অর্থায়ন ধরে রেখেছিল।

নাসার প্রথম প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ন্যান্সি গ্রেস রোমানের নামানুসারে এ টেলিস্কোপটির নামকরণ হয়েছে। ২০১৮ সালে ৯৩ বছর বয়সে মারা যান এই বিজ্ঞানী।

আরও পড়ুন…

উৎক্ষেপণ অপেক্ষায় হাবলের শতগুণ শক্তিশালী টেলিস্কোপ 'রোমান'