Published : 24 Aug 2025, 03:37 PM
অ্যালঝেইমারে আক্রান্ত নারীদের শরীরে ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কম থাকে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
গবেষকরা বলছেন, যেসব নারীরা অ্যালঝেইমার রোগে আক্রান্ত তাদের শরীরে ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড, যেমন– ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬-এর পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। ফলে তাদের প্রতিদিনের খাবারে এসব উপাদান যথেষ্ট পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত, যাতে মস্তিষ্ক সুস্থ ও অ্যালঝেইমারের ঝুঁকি কমে।
ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড হচ্ছে দেহের দরকারি চর্বি জাতীয় উপাদান, যা সাধারণত মাছ, বাদাম, বীজ ও তেল জাতীয় খাবারে পাওয়া যায়। এটি মস্তিষ্ক, হার্ট ও শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে সহায়তা করে।
অ্যালঝেইমারে আক্রান্ত ও সুস্থ ব্যক্তিদের রক্তের নমুনা বিশ্লেষণের পর এমন পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, যেসব নারী অ্যালঝেইমারে আক্রান্ত তাদের রক্তে উপকারী চর্বি যেমন ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড সুস্থ বা অ্যালঝেইমারে আক্রান্ত নন এমন নারীদের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কম থাকে।
তবে এ কম ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা অ্যালঝেইমারে আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে দেখা যায়নি। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, শরীরে এ রোগের প্রভাব নারী ও পুরুষে সম্ভবত ভিন্ন হয়।
গবেষণাটি করেছে ‘কিংস কলেজ লন্ডন’, যা প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যালঝাইমারস অ্যান্ড ডিমেনশিয়া’তে।
এ গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ড. ক্রিস্টিনা লেগিডো-কুইগলি বলেছেন, “নারী ও পুরুষের মধ্যে এ পার্থক্যই ছিল সবচেয়ে বিস্ময়কর ও অপ্রত্যাশিত বিষয়। মানুষের দেহে ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ কম থাকা অ্যালঝাইমারের একটি কারণ হতে পারে– এমন ইঙ্গিত আমরা পেয়েছি। তবে বিষয়টি নিশ্চিতের জন্য আমাদের আরও ক্লিনিকাল ট্রায়াল প্রয়োজন।”
অ্যালঝেইমার পুরুষদের চেয়ে নারীদের মধ্যে দ্বিগুণ হারে দেখা যায়। নারীদের গড় আয়ু বেশি হওয়া, হরমোনে পার্থক্য, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ভিন্নতা ও শিক্ষা পাওয়ার সুযোগের তারতম্য– এসব সবকিছুই এ রোগের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ দৈনিক পত্রিকা গার্ডিয়ান।
সাম্প্রতিক এ গবেষণায় তিনশ ৬ জন অ্যালঝেইমার রোগী, একশ ৬৫ জন মৃদু স্মৃতিভ্রংশ বা ‘মাইল্ড কগনিটিভ ইমপেয়ারমেন্ট’-এ আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তিনশ ৭০ জন মানসিকভাবে সুস্থ মানুষের রক্তে চর্বিজাত উপাদান বা লিপিডের মাত্রা বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা।
লিপিড দুই ধরনের হতে পারে যেমন– স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত ও আনস্যাচুরেটেড বা অসম্পৃক্ত। সাধারণভাবে, সম্পৃক্ত লিপিডকে অস্বাস্থ্যকর ও অসম্পৃক্ত লিপিডকে স্বাস্থ্যকর হিসেবে ধরা হয়।
অ্যালঝেইমার রোগে আক্রান্ত নারীদের শরীরে স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত লিপিড বা চর্বির পরিমাণ বেশি এবং আনস্যাচুরেটেড বা অসম্পৃক্ত লিপিডের পরিমাণ কম মিলেছে, যা মানসিকভাবে সুস্থ নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। তবে এ ধরনের পার্থক্য পুরুষদের মধ্যে দেখা যায়নি।
গবেষক লেগিডো-কুইগলি বলেছেন, যদি এ পার্থক্যের পেছনে লিভার বা দেহের বিপাক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন দায়ী হয় তবে নারীদের মস্তিষ্কে সম্ভবত কম পরিমাণে ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড পৌঁছাচ্ছে।
“এসব লিপিডই মস্তিষ্কের খাবার। মস্তিষ্কের কাজ চালিয়ে যেতে এগুলোর প্রয়োজন।”
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ খাবার যেমন ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘদিন ধরেই হার্ট, মস্তিষ্ক ও অন্যান্য অঙ্গের জন্য উপকারী বলে পরিচিত।
২০২২ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিদের রক্তে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা বেশি থাকলে তাদের মস্তিষ্কের কাজ বা স্মৃতিশক্তি অন্যদের তুলনায় ভালো হয়।
কয়েকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বয়স্কদের ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হলেও যাদের আগে থেকেই ডিমেনশিয়া রয়েছে সেসব নারীদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বা মানসিক সক্ষমতায় উন্নতি হয়নি, অর্থাৎ রোগ ধরা পড়ার পর ওমেগা-৩ খেলে তা খুব একটা সাহায্য করে না।
লেগিডো-কুইগলি বলেছেন, এমন এক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করা উচিত যেখানে পরীক্ষা করে দেখা যাবে, কম পরিমাণ আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড যাদের শরীরে রয়েছে, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে তাদের ক্ষেত্রে ওমেগা সাপ্লিমেন্ট অ্যালঝেইমার রোগ বিলম্বিত করতে পারে কি না।
এ ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা কমে যাওয়ার বিষয়টি নারীদের ৫০ বছর বয়স থেকেই শুরু হতে পারে। ফলে নারীদের উচিত তাদের খাদ্যতালিকায় যথেষ্ট পরিমাণে ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড রাখা, যাতে মস্তিষ্ক সুস্থ থাকে।
তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, যা এএলএ, ডিএইচএ ও ইপিআর নামে পরিচিত। এএলএ পাওয়া যায় উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে, যেমন– চিয়া বীজ, ফ্ল্যাক্স বা তিসি বীজ ও আখরোট। ডিএইচএ ও ইপিআর মূলত মেলে মাছ থেকে, বিশেষ করে তেলজাতীয় মাছ থেকে।
যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস’ পরামর্শ দিয়েছে, সপ্তাহে দুইবার একশ ৪০ গ্রাম করে মাছ খাওয়া উচিত, যার মধ্যে কমপক্ষে একবার তেলজাতীয় মাছ, যেমন– স্যামন, ম্যাকারেল বা সার্ডিন থাকা দরকার, যেন শরীর যথেষ্ট ডিএইচএ ও ইপিআর পায়।
‘অ্যালঝেইমার রিচার্স ইউকে’-এর গবেষক ও এ গবেষণার সহ-অর্থদাতা ড. জুলিয়া ডাডলি বলেছেন, নারী ও পুরুষের মধ্যে অ্যালঝেইমার রোগে পার্থক্য কেন হয় তা বুঝতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেছেন, এটা জানাও জরুরি যে, জীবনধারা বা খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে কীভাবে এ রোগ ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
“রোগটি নারীদের মধ্যে কীভাবে অ্যালাদা ভাবে কাজ করে তা বোঝা গেলে ভবিষ্যতে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরামর্শ নারীদের জন্য আলাদাভাবে সাজানো সম্ভব হবে।”