Published : 25 Jan 2026, 03:26 PM
সময় বদলেছে, সভ্যতা এগিয়েছে তবে মানুষের আবেগ রয়ে গেছে আগের মতোই। দুই হাজার বছর আগে আগ্নেয়গিরির ছাইয়ে চাপা পড়া রোমান শহর পম্পেইয়ের এক অন্ধকার গলিতে এমন গ্রাফিতির খোঁজ মিলেছে, যা মনে করিয়ে দিয়েছে, মানুষের স্বভাব চিরকালই এক।
মার্কিন মাসিক সাময়িকী পপুলার সায়েন্স প্রতিবেদনে লিখেছে, প্রাচীন পম্পেইয়ের সবচেয়ে বেশি গ্রাফিতিওয়ালা গলি নিয়ে নতুন করে গবেষণা চালিয়েছেন তারা, যেখানে দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরানো ৭৯টি নতুন লিপি ও চিত্রের খোঁজ মিলেছে।
এসবের মধ্যে রয়েছে গ্ল্যাডিয়েটরদের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের দৃশ্য ও সেই সময়কার মানুষের লেখা প্রেমের বার্তা। পম্পেইয়ের অ্যাম্ফিথিয়েটার অঞ্চলের সঙ্গে প্রধান সড়কের সংযোগকারী ৯০ ফুট লম্বা এ গলি নিয়ে গবেষণা চালান দুইজন গবেষক। এ গলিটিই পুরো শহরের মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাফিতি এলাকা হিসেবে পরিচিত।
ইতালির নেপলসের কাছে অবস্থিত এ প্রাচীন শহরটি ৭৯ খ্রিস্টাব্দে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতে ছাইয়ের নিচে চাপা পড়েছিল। সেই আগ্নেয় ছাইয়ের আস্তরণই এসব দেয়ালচিত্রকে হাজার বছর ধরে নষ্ট হতে দেয়নি, যেন ব্যস্ত সেই শহরটির ‘জীবনকে’ সময়ের ফ্রেমে বন্দি করে রেখেছে।
এসব গ্রাফিতি ভরা গলিটি ২৩০ বছর আগেই প্রথম আবিষ্কৃত হয়। তবে এর ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে জানার জন্য সম্প্রতি ‘করিডোর ভয়েসেস’ নামে এক বিশেষ প্রকল্প শুরু করেছে প্যারিসের ‘সরবোন ইউনিভার্সিটি’ ও ‘মন্ট্রিয়ল ইউনিভার্সিটি’।
আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় গবেষকরা সেখানকার দুইশোটিরও বেশি প্রাচীন দেয়াললিখন বিশ্লেষণ করেছেন, যার মধ্যে ৭৯টি ছিল সম্পূর্ণ নতুন, যা আগে কখনো কারও নজরে আসেনি।
এ গবেষণার ফলাফল ‘দেগলি স্কাভি দো পম্পেই’ নামের এক সাময়িকীতে প্রকাশ করেছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, এত বছর পর সেখান থেকে নতুন কিছু পাওয়া যাবে তা তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল।
পুরো গলিজুড়ে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে অসংখ্য প্রেমের স্বীকারোক্তি, নানারকম ঠাট্টাবিদ্রূপ ও চমৎকার সব শিল্পকর্ম। এসব শিল্পকর্মের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াইয়ের দৃশ্য। থিয়েটারের সিঁড়ির কাছে খোদাই করা এ চিত্রে দেখা যায়, দুজন গ্ল্যাডিয়েটর একে অপরের দিকে ঢাল উঁচিয়ে ও তলোয়ার তুলে লড়াই করছেন।
খোদাই করা এ গ্ল্যাডিয়েটরদের উচ্চতা কেবল চার ইঞ্চির মতো। গবেষকরা এ কাজের শৈল্পিক মানের প্রশংসা করে বলেছেন, এমনটি সম্ভবত কোনো শিল্পীর কল্পনা নয়, বরং তিনি নিজে সরাসরি কোনো গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধ দেখে সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এ ছবি এঁকেছিলেন।
যুদ্ধরত গ্ল্যাডিয়েটরদের ছবির পাশাপাশি ওই গলির দেয়ালজুড়ে ছিল ভালোবাসার অগণিত কথা। একটি লেখায় পাওয়া গেছে, “আমি খুব তাড়াহুড়োয় আছি। বিদায়, আমার সাভা, আমাকে ভালোবাসতে ভুলে যেও না কিন্তু!” অন্য আরেকটি লেখায় ‘মেথে’ নামের একজন দাসের হৃদয়ের আকুতি ফুটে উঠেছে। সে ‘ক্রেস্টো’ নামের একজনকে ভালোবাসত ও প্রেমের দেবী ভেনাসের কাছে প্রার্থনা করেছিল যেন তারা মিলেমিশে সুখে থাকতে পারে।
এ ছাড়া আরও একটি অসমাপ্ত লেখার খোঁজ মিলেছে, যেখানে উঠে এসেছে, “এরাটো ভালোবাসে...” তবে সময়ের আবর্তে তার পরের অংশটুকু মুছে গেছে।
তবে প্রাচীন সেসব দেয়াল কেবল প্রেম আর যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল না, সেখানে ওই সমসাময়িক বিদ্রূপের উপস্থিতিও ছিল। একটি বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য ছিল, “মিচ্চিও-চ্চিও-চ্চিও, তোমার বাবা যখন মলত্যাগ করছিলেন, তুমি তার পেট কামড়ে দিয়েছিলে, দেখ এই মিচ্চিও কেমন লোক!” দুই হাজার বছর আগেও মানুষ একে অপরকে বিদ্রূপ করতে ছাড়ত না!
প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক ঘুরতে আসেন ও দেয়ালের এসব স্পষ্ট চিত্র দেখতে আসেন ইউনেস্কো স্বীকৃত এই বিশ্ব ঐতিহ্যে। তবে নতুন আবিষ্কৃত এসব অস্পষ্ট লেখাগুলো সাধারণ চোখে দেখা প্রায় অসম্ভব। ফলে গবেষকদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হয়েছে।
এ গবেষণায় শিলালিপি তত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব ও ডিজিটাল প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন গবেষকরা, বিশেষ করে ‘রিফ্লেক্ট্যান্স ট্রান্সফরমেশন ইমেজিং’ বা আরটিআই নামের এক কৌশল ব্যবহৃত হয়েছে, যা আলোর প্রতিফলনের মাধ্যমে দেয়ালের অতি সূক্ষ্ম বিভিন্ন খাঁজকেও স্পষ্ট করে তোলে।
গবেষকরা লিখেছেন, “এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য এসব গ্রাফিতিকে তাদের আদি অবস্থানের প্রেক্ষাপটে ফিরিয়ে আনা। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে প্রাচীনকালে জনসমাগমস্থলে মানুষ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে মিশতেন এবং নির্দিষ্ট এলাকায় কোন ধরনের বিষয় নিয়ে আলাপ বা গ্রাফিতি বেশি হত।”
বর্তমানে পম্পেই প্রত্নতাত্ত্বিক পার্ক কর্তৃপক্ষ এ গলিটির ওপর স্থায়ী এক ছাদ তৈরির পরিকল্পনা করছে, যাতে রোদবৃষ্টি থেকে প্রাচীন প্লাস্টারের দেয়াল সুরক্ষিত রাখা যায়।
পম্পেই প্রত্নতাত্ত্বিক পার্কের পরিচালক গ্যাব্রিয়েল জুখট্রিগেল বলেছেন, “প্রযুক্তি হচ্ছে সেই চাবিকাঠি যা আমাদের সামনে প্রাচীন বিশ্বের বন্ধ ঘরের বিভিন্ন দরজা খুলে দিচ্ছে। আমাদের দায়িত্ব সেসব ঘর সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানানো।”
পম্পেইজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ১০ হাজারেও বেশি শিলালিপি ও দেয়ালচিত্র সংরক্ষণ এবং সেগুলোর মান উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে পুরো গবেষণা দলটি।