Published : 02 Jun 2026, 12:01 PM
পাখিদের মধ্যে হস্তমৈথুন বা স্বমেহন আচরণটি কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়, বরং এমনটা এদের প্রাকৃতিক ও সুস্থ আচরণ বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, খাঁচায় বন্দী পাখিদের চেয়ে বন্য বা মুক্ত পাখিদের মধ্যে এ প্রবণতা আরও বেশি। পাখিদের এ স্বাভাবিক আচরণ বন্ধ করতে হরমোন থেরাপি বা অস্ত্রোপচারের মতো কৃত্রিম বাধা দেওয়া উচিত নয়। কারণ তা পাখিদের জন্য উল্টো ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
গবেষকরা পশু চিকিৎসকদের অনুরোধ করেছেন, তারা যেন উদ্বিগ্ন পাখিমালিকদের আশ্বস্ত করেন যে, পাখিদের এমন আচরণ মোটেও ক্ষতিকর নয়।
একইসঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছেন, পাখিদের এমন আচরণ থামাতে খাঁচায় বসার ডাল সরিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে হরমোন থেরাপি বা অস্ত্রোপচারের মতো যেসব হস্তক্ষেপ করা হলে তা পাখিদের জন্য উল্টো ক্ষতিকর হতে পারে।
এ গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে ‘প্রিস্টন ইউনিভার্সিটি অফ ল্যাঙ্কাশায়ার’-এর বিবর্তনবিষয়ক বাস্তুসংস্থানবিদ ড. ক্লো হেইস বলেছেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হল, হস্তমৈথুন বা স্বমেহন পাখিদের খাঁচায় বন্দী থাকার কারণে তৈরি হওয়া কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া নয়। পাখিদের মধ্যে এমনটা স্বাভাবিক ও সুস্থ আচরণ, যা এদের স্বাভাবিক যৌন আচরণেরই অংশ।”
গবেষকদের ধারণা ছিল, পাখিরা হয়ত হস্তমৈথুন করে না, আর যদি করেও থাকে তবে তা কেবল এদের খাঁচায় বন্দী থাকার মানসিক চাপের কারণেই করে।
তবে ড. ক্লো হেইস বলেছেন, পাখিদের এ আচরণটি বেশ সাধারণ ও স্পষ্ট।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেছেন, “আমার একটি পোষা তোতাপাখি ছিল, যা সারাক্ষণই স্বমেহন করত। আপনি যদি কখনও কোনো পাখিকে এ আচরণ করতে দেখেন তবে সে ঠিক কী করছে তা আপনি নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পারবেন।”
এ গবেষণার জন্য গবেষক দলটি পাখি বিশেষজ্ঞ ও অনলাইনে পাখি পালনকারী, প্রজননকারী ও পাখিপ্রেমী বিভিন্ন কমিউনিটির মধ্যে জরিপ চালিয়েছে।
পরে সেসব তথ্য বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন গবেষণাপত্রে প্রকাশিত বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। সব মিলিয়ে তারা খাঁচায় বন্দী ও বন্য উভয় পরিবেশের মোট ১২০টি প্রজাতির পাখির তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
জরিপে উঠে এসেছে, তোতা, হাঁস, টার্কি ও মুরগিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যে এ আচরণটি বেশ ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও খাঁচার চেয়ে বন্য পরিবেশেই এমনটা বেশি দেখা যায়। সংগৃহীত তথ্যে পুরুষ পাখিদের কথা কিছুটা বেশি উল্লেখ থাকলেও নারী পাখিরাও কোনোভাবেই এর ব্যতিক্রম নয়।
পাখিদের এ আচরণের ধরন কেমন হয় তা বর্ণনা করতে গিয়ে হেইস বলেছেন, সাধারণত পুরুষ পাখিরা এদের বসার ডাল, খেলনা, গাছের ছোট ডাল বা এদের মালিকের হাত, পা বা কাঁধের সঙ্গে ‘বেশ জোরে শরীর ঘষে’ থাকে। অন্যদিকে, নারী পাখিরা সাধারণত তাদের লেজ উঁচিয়ে সুবিধাজনক কোনো বস্তুর ওপর নিজেদের শরীরকে পেছনের দিকে চেপে ধরে।
পাখিদের এ আচরণের সময় কখনো কখনো ডানা ঝাপটানো ও এমন কিছু আওয়াজ করতে দেখা যায়, যা সাধারণত অন্য সময়ে এদের মুখ থেকে শোনা যায় না।
এর পর পাখিরা কোনো অনুশোচনা বা অপরাধবোধে ভোগে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ড. ক্লো হেইস বলেছেন, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়।
“আমি হয়ত সরাসরি ‘তৃপ্ত’ শব্দটি ব্যবহার করব না। তবে কাজটি শেষ করার পর এদের শান্ত ও কিছুটা ভিন্ন দেখায়। এমনটা এদের ভালোলাগার মাধ্যম।”
পাখিপ্রেমীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, কিছু মালিক যখন তাদের পাখিকে এ আচরণ করতে দেখেন, তখন তারা পাখিটি নিজের কোনো ক্ষতি করে ফেলছে কি না সেই ভয়ে পশু চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
এর জবাবে কিছু চিকিৎসক এই আচরণে বাধা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যার মধ্যে ছিল খাঁচার বসার ডাল বা খেলনা সরিয়ে নেওয়া এবং পাখির শরীরের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় হাত না বুলানো।
চিকিৎসার এ চরম রূপ তুলে ধরে হেইস বলেন, “খুব মারাত্মক ক্ষেত্রে, চিকিৎসকেরা পাখিদের এমন আচরণ বন্ধ করতে বিভিন্ন ওষুধ বা হরমোন থেরাপিও দিতেন। পাখিদের সম্পূর্ণ বন্ধ্যা করে দেওয়ার জন্য অস্ত্রোপচারের মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা আসলেই চরম পর্যায়ের পাগলামি।”
মালিক ও চিকিৎসকদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে হেইস বলেছেন, “চিকিৎসকদের উচিত হবে না মালিকদের এ আচরণ বন্ধের পরামর্শ দেওয়া, যতক্ষণ না তা পাখির অঙ্গ স্থানচ্যুতির মতো কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি করছে। আর এমন সমস্যা হওয়ার নজির একেবারেই নগণ্য।”
এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন’-এ।
‘ইউনিভার্সিটি অফ ল্যাঙ্কাশায়ার’-এর পশু চিকিৎসক ড. আনা বাস্টো এ গবেষণার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন না। তিনি বলেছেন, এ প্রতিবেদনটি পশু চিকিৎসকদের পাখি মালিকদের আরও ভালো পরামর্শ দিতে সাহায্য করবে।
“গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ এবং পাখিরা কেন ও কীভাবে এমন আচরণ করে সে সম্পর্কে আরও সার্বিক ধারণা পাওয়ার ক্ষেত্রে গবেষণাটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।”
‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র বিবর্তনবিষয়ক জীববিজ্ঞানী ও এ গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক ড. মাটিল্ডা ব্রিন্ডল বলেছেন, গবেষণাটি বিজ্ঞান জগতের সেই ক্রমাগত গবেষণার তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করল, যা প্রমাণ করেছে প্রাণীজগতে বংশবৃদ্ধি ছাড়াও অন্য কারণেও এমন যৌন আচরণ ঘটে থাকে।