Published : 07 Sep 2025, 08:09 PM
গুগলকে তিনশ ৪৫ কোটি ডলার জরিমানা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি খাতে প্রতিযোগিতাবিরোধী কার্যক্রম চালানোর অভিযোগে এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
গত এক দশকে ইউরোপের প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে গুগলের বিরোধে চতুর্থ দফায় এটি বড় ধরনের জরিমানা।
এ নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিষয়টি, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প একে ‘অন্যায্য’ ও ‘বৈষম্যমূলক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি সরাসরি ইইউ-এর সঙ্গে কথা বলবেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জরিমানার প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আমেরিকান সৃজনশীলতাকে এভাবে বাধা দেওয়া যাবে না। যদি এটি চলতে থাকে তবে আমি বাধ্য হব সেকশন ৩০১ কার্যক্রম শুরু করতে, যাতে অন্যায্য জরিমানাগুলো বাতিল করা যায়।”
১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে যদি সেটি মার্কিন বাণিজ্যের ওপর ‘অন্যায্য’ বা ‘অযৌক্তিক’ বাধা সৃষ্টি করে।
এ নিয়ে প্রতিবেদনে রয়টার্স লিখেছে, ইউরোপীয় কমিশনের পদক্ষেপটির সূত্রপাত হয়েছিল ইউরোপিয়ান পাবলিশার্স কাউন্সিলের করা এক অভিযোগ থেকে। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “আমি এ বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কথা বলব।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করিয়ে দিয়েছেন, এর আগে তিনি ইউরোপের ওপর বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করেছিলেন এবং সতর্ক করে বলেছেন, বিগ টেকের বিরুদ্ধে ইইউর যে কোনো পদক্ষেপের জবাবে তিনি আবারও পাল্টা ব্যবস্থা নেবেন।
অন্যদিকে গুগল বলেছে, তারা জরিমানার বিরুদ্ধে আপিল করবে। তবে ইউরোপীয় কমিশন স্পষ্ট করেছে, গুগল যদি স্বার্থসংঘাত নিরসনে ব্যর্থ হয় তবে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, গুগলের বিরুদ্ধে এই মামলা দেখাচ্ছে ডিজিটাল বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আটলান্টিকের দুই পাশেই উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে এবং ইইউ প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করছে।
ইউরোপীয় কমিশন শুরুতে সোমবার জরিমানা ঘোষণার পরিকল্পনা করেছিল। তবে ইউরোপীয় বাণিজ্য কমিশনার মারোস সেফকোভিচ আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এতে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় গাড়ির ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করতে পারে। সেই কারণে শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বদলে শুক্রবার জরিমানার ঘোষণা দেন ইইউ অ্যান্টিট্রাস্ট কমিশনার টেরিজা রিবেরা।
কমিশনের অভিযোগ, গুগল ইচ্ছে করে নিজের অনলাইন বিজ্ঞাপন প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যাতে তাদের এডএক্স এক্সচেঞ্জ বিজ্ঞাপন চেইনের কেন্দ্রীয় জায়গায় আধিপত্য বজায় রাখতে পারে। এর ফলে গুগল বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে উচ্চ ফি আদায় করতে পেরেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশন গুগলকে নির্দেশ দিয়েছে, তারা যেন অবিলম্বে এই ‘স্ব-অগ্রাধিকারমূলক’ কার্যক্রম বন্ধ করে এবং স্বার্থসংঘাত নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়। এর জন্য কোম্পানিকে ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে গুগলকে জানাতে হবে তারা কীভাবে এই নির্দেশ মানতে চায়। পরবর্তী ৩০ দিন সময় পাবে সেই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য।
এক বিবৃতিতে ইইউ অ্যান্টিট্রাস্ট কমিশনার টেরিজা রিবেরা বলেন, “গুগলকে এখন একটি বাস্তবসম্মত সমাধান আনতে হবে, নতুবা আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করব না। ডিজিটাল বাজার মানুষের সেবা করার জন্য, আর তা বিশ্বাস ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে। বাজার ব্যর্থ হলে জনস্বার্থে প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের দায়িত্ব।”
গুগলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও গ্লোবাল হেড অফ রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স লি-অ্যান মুলহল্যান্ড এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইউরোপীয় কমিশনের অ্যাডটেক সার্ভিস সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ‘ভুল’ এবং গুগল এর বিরুদ্ধে আপিল করবে।
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি অন্যায্য জরিমানা চাপানো হয়েছে, যা ইউরোপের হাজার হাজার ব্যবসার জন্য লাভজনক হওয়া কঠিন করে তুলবে।
মুলহল্যান্ড আরও বলেন, “বিজ্ঞাপন ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জন্য সার্ভিস দেওয়া কোনোভাবেই প্রতিযোগিতা-বিরোধী নয়। আর আমাদের সার্ভিসের বিকল্পও আগে কখনো এত বেশি ছিল না।”
কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক অ্যাঞ্জেলা মিলস ওয়েড বলেছেন, “শুধু জরিমানা গুগলের অ্যাডটেকের অপব্যবহার বন্ধ করবে না। শক্তিশালী ও নির্ধারিত প্রয়োগ ছাড়া গুগল এটিকে কেবল ব্যবসার খরচ হিসেবে ধরে নেবে এবং এআই যুগে তাদের আধিপত্য আরও বাড়বে। এতে অসৎ প্রতিযোগিতা চলমান থাকবে এবং সংবাদমাধ্যম ও প্রকাশনা সংস্থাগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে।”
ফিউচার অফ টেক ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এবং ইউসিএল ল’সের অনারারি প্রফেসর কোরি ক্রাইডার কমিশনকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আজ ইউরোপ আইনের শাসন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে বিষয়টি পরিষ্কার—শুধু জরিমানা নয়, গুগলকে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া তাদের একচেটিয়া ক্ষমতা শেষ হবে না। এটিই ইউরোপীয় ব্যবসার জন্য ১২ হাজার কোটি ইউরোর বাজার উন্মুক্ত করবে এবং আমাদের ধুঁকতে থাকা গণমাধ্যম খাতকে বাঁচাতে পারবে।”
এদিকে, গুগল আগামী ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে একটি পৃথক মামলার ট্রায়ালে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের মতে, কোম্পানি অনলাইন বিজ্ঞাপন প্রযুক্তিতে অবৈধ মনোপলি ধরে রেখেছে।
২০২৪ সালে গুগলের বিজ্ঞাপন থেকে আয় হয়েছে ২৬ হাজার চারশ ৬০ কোটি ডলার, যা তাদের মোট আয়ের ৭৫.৬ শতাংশ। এটি বিশ্বের প্রধান ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সার্চ সার্ভিস, জিমেইল, গুগল প্লে, গুগল ম্যাপস, ইউটিউব, গুগল অ্যাড ম্যানেজার, অ্যাডমব এবং অ্যাডসেন্স।