Published : 24 May 2026, 11:55 AM
চলমান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউক্রেইনের প্রতি বিশ্ববাসীর সমর্থন কমাতে এবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্লুস্কাই-এ হানা দিয়েছে রুশ হ্যাকাররা। তারা এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ভুয়া খবর ছড়াচ্ছে বলে দাবি ব্লুস্কাইয়ের।
প্ল্যাটফর্মটির বেশ কিছু প্রভাবশালী অ্যাকাউন্ট হাইজ্যাক করে এআই প্রযুক্তির সহায়তায় ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর এ তথ্য নিশ্চিত করেছে ব্লুস্কাই কর্তৃপক্ষ ও মার্কিন গবেষকরা।
‘ক্লেমসন ইউনিভার্সিটি’র গবেষক ও ব্লুস্কাই কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদনে লিখেছে, এপ্রিল থেকে দফায় দফায় ছড়াতে থাকা এসব ভুয়া পোস্টের মধ্যে প্রায় দুই হাজার পোস্ট এরইমধ্যে প্ল্যাটফর্মটি থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
অনলাইনে ভুল তথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে রাশিয়ার এ তৎপরতাকে বড় ধরনের আগ্রাসন হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
‘ক্লেমসন ইউনিভার্সিটি’র ‘মিডিয়া ফরেনসিক হাব’-এর পরিচালক ড্যারেন লিনভিল বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে কাল্পনিক তথ্য দিয়ে তৈরি করা ভুয়া অ্যাকাউন্টের ওপর নির্ভর করার পর রাশিয়ানরা এখন ‘স্পষ্টভাবে নতুন কৌশল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে’।
“তারা সবসময়ই নতুন নতুন উপায়ের খোঁজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।”
‘ক্লেমসন ইউনিভার্সিটি’র গবেষক ও ‘ডি-টিম’ নামের একদল ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংগঠন এসব ভুয়া পোস্টের সঙ্গে মস্কোভিত্তিক সংস্থা ‘সোশাল ডিজাইন এজেন্সি’র যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে।
এ বিষয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের মন্তব্যের অনুরোধে ব্লুস্কাই বলেছে, বর্তমান সময়ে “পুরো প্রযুক্তি শিল্পেই এটা সাধারণ এক সমস্যা। এ ধরনের সমন্বিত এবং ভুয়া প্রচারণা শনাক্ত ও নস্যাৎ করতে আমরা প্রচুর সম্পদ ও শ্রম কাজে লাগাচ্ছি।”
ক্লেমসনের গবেষকরা এ হ্যাকিং অভিযানটিকে ক্রেমলিনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ কৌশলে মূলধারার নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের আদলে হুবহু নকল বা ভুয়া নিবন্ধ তৈরি করে ছড়ানো হয়।
হ্যাকারদের মূল উদ্দেশ্য থাকে যেন ফ্যাক্ট-চেকাররা এগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে এবং ভুয়া বিভিন্ন দাবি আলোচনার মাধ্যমে আরও বেশি মানুষের সামনে চলে আসে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস বলেছে, এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও ‘সোশাল ডিজাইন এজেন্সি’র পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন অনুসারে, হ্যাকাররা ব্লুস্কাইয়ের এমন সব ব্যবহারকারীকে টার্গেট করেছে যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী বা পরিচিত মুখ। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক, অধ্যাপক, জনমত জরিপকারী, একজন অ্যানিমে শিল্পী ও হলিউডের একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা।
ওই চলচ্চিত্র নির্মাতার অ্যাকাউন্টটি দখল করে এআই ব্যবহার করে তৈরি একটি ভুয়া ভিডিও পোস্ট করা হয়, যেখানে দেখানো হয়েছে, কানাডার একজন পুলিশ কর্মকর্তা ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর তীব্র সমালোচনা করছেন।
হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়া এমন কিছু অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে স্থগিত করে দিয়েছে ব্লুস্কাই কর্তৃপক্ষ, যাতে ব্যবহারকারীরা পাসওয়ার্ড রিসেট করে পুনরায় তা সচল করতে পারেন।
এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ‘বাল্টিমোর ব্যানার’-এর সাংবাদিক পামেলা উড জানতে পারেন যে তিনিও এ হামলার শিকার হয়েছেন।
উড বলেছেন, গত ২৮ এপ্রিল ছুটিতে থাকাকালীন তার অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করা হয়। কারণ, তার অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছিল, যার ক্যাপশনে মিথ্যা দাবি করে বলা হয়েছিল, গেল মাসে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নৈশভোজে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টার পেছনে ইউক্রেইনের হাত রয়েছে বলে ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’ খবর প্রকাশ করেছে।
পামেলা উড বলেছেন, “ব্লুস্কাই আমাকে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। তবে ইঙ্গিত দিয়েছে, আমার অ্যাকাউন্টটি বেদখল হয়ে থাকতে পারে। আমার অ্যাকাউন্টটি বেশ সাধারণ, কেবল নিজের প্রতিবেদনগুলোই শেয়ার করি। বেশ কিছুদিন আমি ব্লুস্কাইতে ঢুকিনি বা কিছু পোস্টও করিনি। ফলে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার বিষয়টিই সবচেয়ে যৌক্তিক মনে হচ্ছে।”
এ হ্যাকিং অভিযানের পেছনে সাধারণের চেয়ে ‘অনেক উন্নত ও চতুর কৌশল’ ব্যবহার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ‘ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ’-এর গবেষক জোসেফ বোডনার।
তিনি ক্লেমসনের এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত নন।
“সাধারণত এক্স-এর ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে হ্যাকাররা যে কোনো সাধারণ, অপরিচিত বা অদ্ভুত প্রোফাইল ছবিওয়ালা অ্যাকাউন্ট হাইজ্যাক করেছে। তবে এবার তারা মাঝারি মানের পরিচিত বা সমাজে গ্রহণযোগ্যতা আছে এমন ব্যক্তিদের টার্গেট করেছে।”
শুরুতে কেবল আমন্ত্রণের ভিত্তিতে ব্যবহার করা গেলেও ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লুস্কাই সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, বিশেষ করে এক্স-এর মালিক ইলন মাস্ক ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় সমর্থন দেওয়ার পর এ প্ল্যাটফর্মটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে।
তবে টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, এক্স-এর প্রায় ৬০ কোটি ব্যবহারকারীর তুলনায় ব্লুস্কাইয়ের ৪ কোটি ২০ লাখ ব্যবহারকারীর সংখ্যাটি এখনও বেশ কম।