Published : 18 Jun 2026, 07:30 PM
তথ্য ফাঁস ঠেকাতে ও কাজের গতি বাড়ানোর অজুহাতে আফগানিস্তানে সরকারি কর্মকর্তাদের স্মার্টফোন ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তালেবান প্রশাসন।
আদেশ অমান্যকারীদের মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলাসহ শরিয়া আইন অনুসারে শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এমন পদক্ষেপ ভবিষ্যতে সাধারণ জনগণের ওপরও বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধ আরোপের আগাম আভাস হতে পারে।
তালেবানের সামরিক আদালত থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এ সপ্তাহ থেকেই এ নিয়ম কার্যকর হবে।
নির্দেশনায় সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, “উচ্চপদস্থ, নিম্নপদস্থ, সাধারণ মুজাহিদীন বা সেবাকর্মী কারো জন্যই স্মার্টফোন ব্যবহারের অনুমতি নেই।”
এদিকে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন তালেবান কর্মকর্তা নিজের ফোন থেকেই এ নিষেধাজ্ঞার আদেশটি পড়ে শোনাচ্ছেন এবং তার পাশেই অন্য একজন ব্যক্তি মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলছেন।
আদেশে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, “কেউ যদি এ আদেশ অমান্য করে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তবে তার ফোনটি ভেঙে ফেলা হবে এবং লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে আইন ও শরিয়া অনুসারে শাস্তি কার্যকর করা হবে।”
এ নির্দেশনায় আরও জানানো হয়েছে, বিশেষ কোনো প্রয়োজনে ছাড় পেতে হলে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার লিখিত অনুমতির প্রয়োজন হবে।
এ বিষয়ে গার্ডিয়ানের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি কোনো তালেবান মুখপাত্র।
আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্র ও প্রতিবেদন বলছে, এ নিষেধাজ্ঞাটি বর্তমানে একেক অঞ্চলে একেক নিয়মে কার্যকর করা হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় নিয়মটি কেবল সরকারি কর্মীদের মধ্যেই সীমিত রাখা হয়েছে, আবার কিছু শহর ও প্রদেশে এ নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়িয়ে নারী, সাধারণ নাগরিক, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের ওপরও চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মূল্যায়নে আফগানিস্তান বিষয়ক একজন বিশ্লেষক বলেছেন, “স্থানীয় পর্যায়ে অনেক কিছুই ঘটছে কেবল স্থানীয় কোনো কর্তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের কারণে। তবে এমনটা পূর্ণাঙ্গ ও সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার পূর্বাভাসও হতে পারে, যার মাধ্যমে তারা আসলে পরিস্থিতি পরখ করে দেখছে।”
আফগানিস্তানকে বৈশ্বিক ইন্টারনেট দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার জন্য তালেবানের ক্রমাগত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এসব নিষেধাজ্ঞা আসছে। গেল বছরের সেপ্টেম্বরে দুই দিনের জন্য দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল তালেবান কর্তৃপক্ষ।
ওই সময় পর্নোগ্রাফি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে অস্পষ্টভাবে এ সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা তুলে ধরে আদেশে বলা হয়েছিল, এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল ‘অনৈতিকতা ঠেকানো’।
ওই বিশ্লেষক বলছেন, সেই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা সংযোগ বিচ্ছিন্নের সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল তাড়াহুড়ো করে এবং তাতে দূরদর্শিতার অভাব ছিল। ফলে দেশজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে এবং জরুরি পরিষেবা ও প্লেন চলাচল ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাম্প্রতিক এ স্মার্টফোন নিষেধাজ্ঞার পেছনে সম্ভবত বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর হেরাতে নারীদের ‘সঠিকভাবে হিজাব না পরার’ অভিযোগে তালেবান গ্রেপ্তারের পর যে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল তা বড় কারণ হতে পারে।
সেই বিক্ষোভের সময় তালেবান বাহিনী জনতার ওপর গুলি চালায় এবং এতে অন্তত দুইজন নিহত হন। তবে এ বিক্ষোভের আগে থেকেই তালেবান প্রশাসন স্মার্টফোন নিষিদ্ধের বিষয়ে তোড়জোড় করছিল। যার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ তথ্য ফাঁসের ভয় ও কর্মীদের কাজের দক্ষতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা।
আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় হেরাত প্রদেশের দুজন সরকারি কর্মী বলেছেন, সেখানে কয়েক মাস আগে থেকেই স্মার্টফোন ব্যবহারের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে।
তাদের মধ্যে একজন বলেছেন, “প্রায় দুই মাস আগে তারা আমাদের অফিসে মোবাইল ফোন না আনার নির্দেশ দিয়েছে। আমি ও আমার কয়েকজন সহকর্মী বিষয়টি হালকাভাবে নিয়েছিলাম। ফলে তারা আমাদের ফোনগুলো কেড়ে নেয় এবং আমরা এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে তারা সেগুলো ভেঙে ফেলে।”
ফোনটি ভেঙে ফেলার কারণে তার প্রায় ৮ হাজার আফগানি মুদ্রার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
ওই বিশ্লেষক বলেছেন, “তালেবান প্রশাসনের বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে কর্মীরা সারাক্ষণ ফোনে মগ্ন থাকেন এবং কাজ করেন না। এছাড়া, কর্মক্ষেত্রে স্মার্টফোনের কোনো জায়গা থাকা উচিত নয় বলেই তারা মনে করে।”
পাশাপাশি আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে তথ্য ফাঁস হওয়া।
বিশ্লেষকের ভাষ্যমতে, বর্তমানে অনেক তথ্য ফাঁস হচ্ছে। কারণ, সরকারি কর্মকর্তারা তাদের স্মার্টফোন ব্যবহার করে বিভিন্ন নথিপত্রের ছবি তুলছেন, মাঝেমধ্যে বৈঠকের কথাবার্তা রেকর্ড করছেন এবং সর্বোচ্চ নেতার চূড়ান্ত অনুমোদনের আগেই কোনো না কোনোভাবে তা জনগণের সামনে নিয়ে আসছেন।
ওই বিশ্লেষক বলছেন, “স্মার্টফোন ব্যবহার ও অনলাইনে থাকার কারণে কাজের ক্ষতি হওয়াটা বিশ্বজুড়ে সাধারণ এক সমস্যা। তবে এখানে পার্থক্য হচ্ছে, এ সমস্যার সমাধানে বিশ্বের অন্য কোনো দেশকে এভাবে সরাসরি আইন তৈরি বা নিষেধাজ্ঞা জারি করতে আমি দেখিনি।”