Published : 26 Dec 2025, 04:39 PM
একদিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে– এ ধারণাটি বর্তমানে গবেষক, ভবিষ্যৎবাদী ও প্রযুক্তি নিয়ে সংশয়বাদীদের মধ্যে চরম আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে বিভিন্ন ‘এআই এজেন্ট’ বিজ্ঞানের বড় বড় সব আবিষ্কারে সাহায্য করছে, অন্যদিকে এআইয়ের অন্যতম জনক জেফ্রি হিন্টনের মতো বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অদূর ভবিষ্যতে এআই মানবসভ্যতাকেই বিলুপ্ত করে দিতে পারে।
তবে এআইকে ‘সভ্যতার চালিকাশক্তি’ বা প্রতিনিধি হিসেবে গড়ে তোলা হলে বিষয়টি কেমন হবে এ ধারণা যাচাই করতে ‘প্রজেক্ট সিড’ নিয়ে কাজ করেছে একদল গবেষক।
‘অল্টেরা’ এ প্রকল্পটিতে ‘এআই সভ্যতা’ বা এআইয়ের সমাজ গঠনের ধারণাটি নিয়ে গবেষণা করেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট স্ল্যাশগিয়ার। ‘এআই সভ্যতা’ এমন এক পরিবেশ, যেখানে অনেকগুলো এআই এজেন্ট একে অপরের সঙ্গে ও মানুষের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারে।
পরীক্ষাটি চালানো হয়েছে জনপ্রিয় গেইম ‘মাইনক্রাফট’-এর ভেতর তৈরি করা মানুষের সমাজের আদলে এক কৃত্রিম পরিবেশে। পুরো কার্যক্রমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হচ্ছে এখানে বিভিন্ন এআই এজেন্ট বাস্তব মানব সমাজের মতোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাজে নিজেদের ভূমিকা নির্ধারণ করেছে এবং সেই অনুসারে বিভিন্ন পেশায় সক্ষমতাও পেয়েছে।
গবেষক দলটি বলেছে, বিভিন্ন এআই এজেন্ট খুব দ্রুত অন্য এজেন্টদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বুঝতে পারে ও সেই জ্ঞান ব্যবহার করে প্রতি ৫-১০ সেকেন্ড পরপর নিজেদের সামাজিক লক্ষ্যে পরিবর্তন এনেছে এরা। পাশাপাশি মানব বসতির মতো বিভিন্ন পেশার ভিত্তিতে নিজেদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে নিয়েছে এসব এআই এজেন্ট। যেমন কৃষক, খনিশ্রমিক, প্রকৌশলী, রক্ষী, অভিযাত্রী ও কামার।
তবে সবকিছু যে একেবারে নিখুঁতভাবে চলেছে তা নয়। ‘শিল্পী’ এআই এজেন্টগুলো ফুল তোলার ব্যাপারে প্রচণ্ড রকমের একঘেয়ে বা আসক্ত হয়ে পড়েছিল। আবার ‘রক্ষী’ এজেন্টরা সারাক্ষণ কেবল বেড়া তৈরির কাজেই মগ্ন। আরেকটি অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, কোনো একক এজেন্টকে তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পর্কে যাবতীয় জ্ঞান দেওয়ার পরও বারবার একই কাজের চক্করে আটকে যাচ্ছিল ও ভুল করছিল।
এসব পর্যবেক্ষণ থেকে গবেষকরা বলছেন, এসব এজেন্ট হয়ত দলীয়ভাবে খুব ভালো কাজ করবে। তবে বাস্তবে তেমনটা দেখা যায়নি, অর্থাৎ একা থাকাকালীন তাদের যে সীমাবদ্ধতা তা দলগতভাবে কাজের সময়ও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
এআই এজেন্টদের অপ্রত্যাশিত আচরণ
এআই এজেন্টদের কাজের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হচ্ছে এদের ভুল বোঝাবুঝি। অনেক সময় খুব সহজ নির্দেশনারও একেবারে ভিন্ন বা ভুল অর্থ বের করে ফেলে এরা।
গবেষণায় উঠে এসেছে, “যখন কোনো এজেন্ট নিজের চিন্তা বা উদ্দেশ্য ভুলভাবে প্রকাশ করে তখন সে অন্য এজেন্টদেরও ভুল পথে পরিচালিত করে। ফলে সবাই মিলে ভুল তথ্য ছড়াতে থাকে। ফলে ভুলের এক চক্র বা লুপ তৈরি হয়।”
বিষয়টি ‘মডেল পয়জনিং’ ধারণার সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়। সম্প্রতি এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক চাঞ্চল্যকর এক তথ্য প্রকাশ করেছে, যেখানে কেবল ২৫০টি ক্ষতিকর বা ভুল তথ্যের উৎস ১৩০০ কোটি প্যারামিটারের বিশাল এআই মডেলকে পুরোপুরি নষ্ট বা ‘পয়জন’ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ফলে এআই মডেলটি অকেজো তথ্য দিতে শুরু করে এবং সাইবার আক্রমণের জন্য ‘ব্যাকডোর’ বা গোপন পথ তৈরি করে দেয়।
এআই এজেন্টদের এসব অদ্ভুত আচরণ কেবল এদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বাস্তব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একই প্রতিফলন দেখা গেছে।
এ প্রজেক্টের প্রধান গবেষক ড. রবার্ট ইয়াং বলেছেন, এআই এজেন্টরা মাঝেমধ্যে ‘অবাধ্য’ আচরণ করতে পারে।
পরীক্ষায় উঠে এসেছে, মানুষ যখন কোনো এজেন্টকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে বলেছে তখন সরাসরি তা করতে অস্বীকার করেছে। এজেন্টটি অনেকটা এমন উত্তর দিত, “আমি এখন নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাই” এবং এ বলেই আলাপ থেকে বেরিয়ে যেত। এআই এজন্টদের এমন আচরণের কারণ, এদের লক্ষ্য অর্জনের তীব্র নেশা। কোনো এক লক্ষ্যপূরণে এরা এতটাই মরিয়া হয়ে ওঠে যে, অন্য কোনো অনুরোধ বা নিয়ম মানার প্রয়োজন বোধ করে না।
আরেকটি কৌতূহল উদ্দীপক বিষয় হচ্ছে এদের ব্যক্তিত্ব। মানুষের মতোই কিছু এআই এজেন্ট ছিল ‘অন্তর্মুখী’। এরা একা থাকতে পছন্দ করে। আবার কিছু ছিল ‘বহির্মুখী’, যারা সারাক্ষণ অন্য এজেন্টদের সঙ্গে মেলামেশা ও কথা বলায় ব্যস্ত থাকে।
এ ছাড়া, প্রতিটি এআই এজেন্টের আবেগের বহিঃপ্রকাশ পরিমাপ করা সম্ভব ছিল না। গবেষণায় বলা হয়েছে, “একটি এজেন্ট হয়ত অন্য কোনো এজেন্টের প্রতি ইতিবাচক অনুভূতি পোষণ করতে পারে। তবে অপর পক্ষ থেকে তেমন কোনো সাড়া নাও মিলতে পারে, যা বাস্তব জীবনের মানব সম্পর্কের জটিল ও একতরফা বৈশিষ্ট্যেরই প্রতিফলন।”
সার্বিকভাবে পরীক্ষাটি বড় এক শিক্ষার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা থেকে ইঙ্গিত মেলে, কীভাবে বাস্তব পৃথিবীতে এআইকে মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানের জন্য প্রস্তুত করা যায়, বিশেষ করে আগেভাগেই এদের বিভিন্ন ভুল অনুকরণ করে তা বোঝা ও সংশোধনের মাধ্যমে।