ক্লাসরুমে চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের ‘উপায় খুঁজছে’ ওপেনএআই

স্কুল মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে চ্যাটজিপিটি উন্মোচিত হওয়ায় বিভিন্ন শিক্ষককেও বিপাকে পড়তে দেখা গেছে। এর কারণ, শিক্ষার্থীরা এ চ্যাটবটকে ব্যবহার করেছেন অসদুপায় অবলম্বণ ও নকল করার টুল হিসেবে।

প্রযুক্তি ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Nov 2023, 02:42 PM
Updated : 18 Nov 2023, 02:42 PM

জেনারেটিভ এআইভিত্তিক টুলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা হোমওয়ার্ক করার ক্ষেত্রে অসদুপায় অবলম্বণ করতে পারে, এমন ভীতি ছড়িয়ে পড়েছিল প্রাথমিকভাবে। তবে, এখন ক্লাসরুমে কীভাবে চ্যাটজিপিটি’কে সম্পৃক্ত করা যায়, এর বিভিন্ন উপায় খুঁজে দেখছে চ্যাটবটটির নির্মাতা কোম্পানি ওপেনএআই।

যুক্তরাষ্ট্রের স্যান ফ্রান্সিসকোতে আয়োজিত এক সম্মেলনে ওপেনএআইয়ের সিওও ব্র্যাড লাইটক্যাপ বলেন, কোম্পানি নতুন এক দল গঠন করবে। তাদের কাজ হবে শিক্ষা খাতে চ্যাটজিপিটি’র মতো প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তার উপায় খুঁজে বের করা।

এ উদীয়মান প্রযুক্তি বিভিন্ন শিল্পে উদ্বেগ ছড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশকে নতুন আইন প্রণয়নে বাধ্য করলেও এটি জনপ্রিয় ‘লার্নিং টুল’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে রয়টার্স।

“অনেক শিক্ষকই চ্যাটজিপিটি’কে নিজেদের কারিকুলাম ও শেখানোর ধরনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছেন।” --গত সপ্তাহে আয়োজিত ‘ইনসিড আমেরিকাস’ নামের সম্মেলনে বলেন লাইটক্যাপ।

“এমনকি ওপেনএআই নিজেও তাদেরকে সহায়তা দিতে আগ্রহী। তাই আমরা হয়ত আগামী বছর থেকে এই কাজের জন্য একটি দলও তৈরি করব।”

লাইটক্যাপের এমন মন্তব্য নিয়ে এর আগে কোনো প্রতিবেদন দেখা যায়নি। আর ‘ইনসিড’ হল একটি বৈশ্বিক ব্যবসা বিষয়ক স্কুল।

মাইক্রোসফটের কাছ থেকে কয়েকশ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পাওয়ার পর গত বছরের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি উন্মোচন করেছিল ওপেনএআই। এর পর থেকেই এআই প্রযুক্তি নিয়ে উন্মাদনা বেড়েছে। আর মেটার মাইক্রোব্লগিং অ্যাপ থ্রেডস উন্মোচনের আগে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অ্যাপ্লিকেশন হওয়ার কৃতিত্ব ছিল চ্যাটজিপিটি’র দখলে।

অনলাইনে থাকা বিশাল ডেটা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের সহজাত জবাব তৈরি করতে সক্ষম জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, শিক্ষার্থীদের টার্ম পরীক্ষায় সাহায্য করা, বিজ্ঞান বিষয়ের হোমওয়ার্ক করে দেওয়া এমনকি গোটা উপন্যাস লিখে ফেলা।

চ্যাটজিপিটি উন্মোচনের পর থেকেই বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজছে। এর মধ্যে নিজেদের ‘এআই অ্যাক্ট’ নিয়ে কাজ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এআই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বিভিন্ন নিয়ম জারি করেছে।

স্কুল মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে চ্যাটজিপিটি উন্মোচিত হওয়ায় বিভিন্ন শিক্ষককেও বিপাকে পড়তে দেখা গেছে। এর কারণ, শিক্ষার্থীরা এ চ্যাটবটকে ব্যবহার করেছে অসদুপায় অবলম্বণ ও নকল করার টুল হিসেবে। এমনকি সে সময় এ প্রযুক্তি নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছড়ানোর পাশাপাশি স্কুলে চ্যাটবটটি নিষিদ্ধ করার জোরালো দাবিও তোলা হয়।

“শিক্ষকরা ভেবেছিলেন, এটি তাদের জীবনে দেখা সবচেয়ে বাজে ঘটনা।” --বলেন লাইটক্যাপ।

তবে, এর কয়েক মাস পর থেকে শিক্ষকরা চ্যাটজিপিটি’র বিভিন্ন সুবিধা দেখতে শুরু করেন।

রয়টার্স বলছে, ক্লাসরুমে নিজস্ব প্রযুক্তি সম্পৃক্ত করার বিষয়ে আগে থেকেই কাজ শুরু করেছিল ওপেনএআই। আর নতুন দলটি হতে যাচ্ছে তারই ফল।

“আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন গুরুত্বপূর্ণ টুল হিসেবে দেখি, যা শিক্ষা খাতে সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। আর চ্যাটজিপিটি কীভাবে উপকারী হতে পারে, তা নিয়ে শিক্ষাবিদরা যে ধারণা প্রকাশ করে আসছেন, সেটিও আমাদেরকে আগ্রহী করে তুলেছে।” --রয়টার্সকে পাঠানো ইমেইল বিবৃতিতে বলেন কোম্পানির এক মুখপাত্র।

“আমরা গোটা দেশের বেশ কিছু শিক্ষাবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি ও তাদেরকে চ্যাটজিপিটি’র সক্ষমতা সম্পর্কে জানাচ্ছি। এর মধ্যে চ্যাটবটটির বিকাশ নিয়ে আমাদের চলমান কাজের বিষয়টিও ছিল।”

“এ বিষয়ে আলোচনা করা জরুরি যাতে শিক্ষকরা এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুফল ও অনৈতিক ব্যবহার সম্পর্কে অবগত থাকেন ও বুঝতে পারেন যে এআই প্রযুক্তি কীভাবে ক্লাসরুমে ব্যবহার করা যেতে পারে।”

এদিকে, এআইভিত্তিক গৃহ শিক্ষক তৈরি ও পিছিয়ে পড়া কমিউনিটি’র শিক্ষার্থীদের সহায়তার উদ্দেশ্যে ‘খান একাডেমি’ ও ‘স্মিড ফিউচার্স’-এর মতো শিক্ষাবিষয়ক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে ওপেনএআই।

সিডনিভিত্তিক গবেষণা কোম্পানি ‘হলনআইকিউ’র তথ্য অনুসারে, শিক্ষা খাতের বাজার অনেক বড়, যেখানে ২০৩০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণের পেছনে খরচ বেড়ে গিয়ে পৌঁছাতে পারে ১০ লাখ কোটি ডলার পর্যন্ত।

নিজস্ব এআই পরামর্শক কোম্পানি ‘ইন্টারডাইমেনশনাল’-এ বিভিন্ন শিক্ষাবিদের সঙ্গে কাজ করা ওপেনএআইয়ের সাবেক কর্মী অ্যান্ড্রু মেইন বলেন, ক্লাসরুমে চ্যাটজিপিটি সম্পৃক্ত করার অসংখ্য উপায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের গৃহ শিক্ষক হিসেবে কাজ করা ও শিক্ষকদের পাঠ্যক্রম ও সৃজনশীল ক্লাসরুম তৈরি করার ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখার মতো বিষয়গুলো। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, মধ্যযুগীয় কোনো পাঠ্য নিয়ে ইংরেজি ভাষায় সারাংশ তৈরি করা।

“চ্যাটজিপিটি আপনাকে বাছবিচার করবে না।” --বলেন তিনি।

“অনেক শিক্ষার্থীই ক্লাসে প্রশ্ন করতে ভয় পান।”

তবে অনেকের মতে, স্কুলের মতো জায়গায় চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করলে তাতে শিশুদের প্রাইভেসি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যদিও অনেক দেশেই শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ‘অনলাইন প্রাইভেসি আইন’ রয়েছে।

এদিকে, চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের বেলায় ব্যবহারকারীর বয়স ১৩ বছরের বেশি হওয়ার শর্ত থাকলেও রয়টার্স বলছে, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ব্যবহারকারীদের বেলায় অবশ্যই অভিভাবকের অনুমতি নেওয়ার মতো শর্ত রাখা উচিৎ। কারণ, বেশিরভাগ দেশেই বয়স যাচাইকরণের ব্যবস্থা নেই।