Published : 09 Feb 2026, 04:19 PM
প্রতি বছর আকাশচুম্বী জ্বালানি খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্বের বড় বড় বিভিন্ন এয়ারলাইন। মোটা অংকের এ খরচ কমিয়ে আনতে এবার সমাধান এনেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা।
বাণিজ্যিক বিভিন্ন এয়ারলাইন প্রতি বছর জ্বালানি বাবদ বিপুল অর্থ ব্যয় করে। কিছু হিসাব অনুসারে, ২০২৪ সালে এ খরচের পরিমাণ ছিল ২৯ হাজার ১০০ কোটি ডলার, যা ২০২৩ সালের ২৭ হাজার ১০০ কোটি ডলারের চেয়ে বেশি। গেল বছর বা ২০২৫ সালে এ খরচের অংক আরও বেড়েছে।
প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার প্রতিবেদনে লিখেছে, উইং বা ডানার এমন এক নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে নাসা, যা বাণিজ্যিক বিভিন্ন প্লেনের এ বড় অংকের খরচ কমিয়ে আনবে। এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে প্লেনকে আকাশে ওড়ানোরও প্রয়োজন হয়নি।
গত মাসে নাসার এক বিশেষ গবেষণা প্লেনে এ বৈপ্লবিক ডিজাইনের পরীক্ষা করেছে সংস্থাটি, যা প্লেনের বাতাসের বাধা কমিয়ে দেয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্লেনটি রানওয়ে না ছেড়েই ঘণ্টায় ২৩১.৭৫ কিলোমিটার গতি তুলতে পেরেছে।
এ পরীক্ষার জন্য একটি ৩ ফুট উচ্চতার ছোট মডেল তৈরি করেছেন ইঞ্জিনিয়াররা। উদ্ভাবনী এ নতুন ধারণার নাম ‘ক্রসফ্লো অ্যাটেনুয়েটেড ন্যাচারাল ল্যামিনার ফ্লো’। মডেলটিকে ‘এফ-১৫বি’ গবেষণা প্লেনের নিচে যোগ করেছে তারা।
এ কৌশলের ফলে গবেষকরা আসল বাতাসের প্রবাহে নকশাটি কেমন কাজ করে তা দেখার সুযোগ পান। এজন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ ডানা বা আস্ত এক নতুন পরীক্ষামূলক প্লেন তৈরির প্রয়োজন পড়েনি নাসার।
প্লেনের ডানাটি দেখতে অনেকটা সরু ফিনের মতো এবং সাধারণত প্লেনে যে সমান্তরাল ডানা দেখা যায় তার বদলে এ প্লেনের ডানা লম্বালম্বিভাবে বসানো হয়েছে।
নাসার কর্মকর্তারা বলেছেন, নকশার এ সামান্য পরিবর্তন প্রতিটি প্লেনের জন্য বছরে লাখ লাখ ডলারের জ্বালানি খরচ বাঁচিয়ে দিতে পারে।

নতুন উইং প্রযুক্তির পেছনের বিজ্ঞান
‘ক্রসফ্লো অ্যাটেনুয়েটেড ন্যাচারাল ল্যামিনার ফ্লো’ ধারণার মূল লক্ষ্য হচ্ছে অ্যারোডাইনামিক্সের এক দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করা। ওড়ার সময় বাতাসের পাতলা এক স্তর প্লেনের উপরিভাগের সঙ্গে লেপ্টে থাকে। এ বাতাস চলাচলের ফলে টার্বিউলেন্স বা বাতাসের বিক্ষিপ্ত প্রবাহ তৈরি হয়, যা ঘর্ষণ ও বাতাসের বাধা বাড়িয়ে দেয়।
এ বাধা যখন বেড়ে যায় তখন প্লেনের গতি ও উচ্চতা ধরে রাখার জন্য ইঞ্জিনকে আরও বেশি শক্তি খরচ করতে হয়, যার মানে হচ্ছে বেশি জ্বালানি পোড়ানো।
তবে ‘ক্রসফ্লো অ্যাটেনুয়েটেড ন্যাচারাল ল্যামিনার ফ্লো’ প্রযুক্তির বিশেষ নকশার কারণে বাতাসের সেই পাতলা স্তরটি প্লেনের গায়ে অত সহজে লেপ্টে থাকতে পারে না। ফলে ঘর্ষণ কমে যায় ও প্লেনের সার্বিক সক্ষমতা বাড়ে।
নাসার এসব নতুন তথ্য মূলত দীর্ঘদিনের কম্পিউটার মডেলিং ও উইন্ড টানেল গবেষণার ফলাফলকেই সমর্থন করেছে। তাদের এসব গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছিল, ‘ক্রসফ্লো অ্যাটেনুয়েটেড ন্যাচারাল ল্যামিনার ফ্লো’ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বোয়িং ৭৭৭-এর মতো দূরপাল্লার বিভিন্ন প্লেনের বার্ষিক জ্বালানি খরচ প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।
গত কয়েক বছরের হিসাব অনুসারে, এ ১০ শতাংশ সাশ্রয় মানে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সাশ্রয়। তবে জ্বালানি সক্ষমতায় সামান্য উন্নতিও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডলার সাশ্রয় করতে পারে।
এ ছাড়া, জ্বালানি কম পোড়ানো মানে কার্বন নিঃসরণও কমে যাওয়া, যা পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সম্প্রতি নাসার এ উচ্চ-গতির ট্যাক্সি টেস্ট বা রানওয়েতে চালানোর বিষয়টি আসলে মূল অভিযানের কেবল শুরু। সামনে ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু ফ্লাইট পরিচালনা করবে সংস্থাটি, যেখানে ‘এফ-২৫বি’ প্লেনটি এ ‘ক্রসফ্লো অ্যাটেনুয়েটেড ন্যাচারাল ল্যামিনার ফ্লো’ মডেলটিকে সরাসরি আকাশে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। এর মাধ্যমে মাঝ-আকাশে এর কার্যকারিতা আরও গভীরভাবে যাচাই করা যাবে।
গবেষকরা বলছেন, এ একই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে সুপারসনিক বা শব্দের চেয়ে দ্রুতগামী প্লেনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। ফলে অতি উচ্চ গতিতেও প্লেনের সক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। তবে আপাতত গবেষকদের মূল নজর বাণিজ্যিক প্লেন চলাচলের ওপর, কারণ এখানেই সবচেয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন ও সাশ্রয় আনা সম্ভব।