Published : 02 Mar 2026, 05:45 PM
ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক হামলার সমান্তরালে দেশটিতে সাইবার আক্রমণ চালানো হয়েছে।
রয়টার্স লিখেছে, শনিবার ভোররাত থেকে শুরু হওয়া এ সাইবার হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ নিউজ ওয়েবসাইট, জনপ্রিয় ধর্মীয় অ্যাপ ও সরকারি বিভিন্ন পরিষেবা আক্রমণের শিকার হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের মতে, শনিবার ভোরে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পাশাপাশি সাইবার আক্রমণ চালানো হয়েছে।
এ অভিযানের মধ্যে ছিল বেশ কিছু সংবাদপত্রের ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন বার্তা প্রচার করা। ‘বাদেসাবা’ নামে এক ধর্মীয় ক্যালেন্ডার অ্যাপও হ্যাক হয়েছে, যা ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ ডাউনলোড করেছেন।
হ্যাকিংয়ের পর অ্যাপটিতে ব্যবহারকারীদের উদ্দেশ্যে ‘এখন হিসাব চুকানোর সময়’ এমন বার্তা দেখানোর পাশাপাশি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে অস্ত্র ত্যাগ করে জনগণের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এ বিষয়ে ‘বাদেসাবা’র প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি বার্তা সংস্থা রয়টার্স। অন্যদিকে, রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি মার্কিন সাইবার কমান্ডের একজন মুখপাত্র।
ইন্টারনেট বিশ্লেষক কোম্পানি ‘কেনটিক’-এর পরিচালক ডগ ম্যাডরি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে বলেছেন, গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৭ টা ৬ মিনিটে ও পরবর্তীতে ১১ টা ৪৭ মিনিটে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাপকভাবে কমে যায়। এ সময় দেশটিতে নামমাত্র ইন্টারনেট ব্যবস্থা সচল ছিল।
সাইবার নিরাপত্তা গবেষক ও ‘ডার্কসেল’ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হামিদ কাশফি বলেছেন, ‘বাদেসাবা’ অ্যাপে সাইবার হামলা চালানো ছিল চতুর পদক্ষেপ। কারণ অ্যাপটি ধর্মপ্রাণ মানুষ ও সরকারের কট্টর সমর্থকরা ব্যবহার করে থাকেন।
জেরুজালেম পোস্ট শনিবার প্রতিবেদনে লিখেছে, ইরানের সমন্বিত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা সীমিত করতে দেশটির বিভিন্ন সরকারি সেবা ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেও সাইবার হামলা চালানো হয়েছে।
তবে রয়টার্স এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘সোফোস’-এর থ্রেট ইন্টেলিজেন্স পরিচালক রেফ পিলিং বলেছেন, “ইরান যখন নিজেদের হাতে থাকা বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে তখন তাদের প্রক্সি গ্রুপ এবং হ্যাকার দলের পক্ষ থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামরিক, বাণিজ্যিক বা বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়ছে।”
পিলিং আরও বলেছেন, এসব হামলার মধ্যে থাকতে পারে পুরানো তথ্য চুরির ঘটনাকে নতুন বলে প্রচার করা, ইন্টারনেটে উন্মুক্ত থাকা শিল্প-কারখানার সিস্টেমে সাধারণ স্তরের আক্রমণ চালানো ও সরাসরি বড় ধরনের সাইবার অভিযান পরিচালনা করা।
র্যানসমওয়্যার বিরোধী প্রতিষ্ঠান ‘হ্যালসিয়ন’-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-এর সাবেক শীর্ষ সাইবার কর্মকর্তা সিনথিয়া কায়সার বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে এ ধরনের তৎপরতা বেড়েছে। তাদের প্রতিষ্ঠান পরিচিত ইরানপন্থী সাইবার ব্যক্তিত্বদের পক্ষ থেকে তৎপর হওয়ার ডাক দিতে দেখেছে।
তিনি আরও বলেছেন, এসব হ্যাকার অতীতে চোরাই তথ্য ফাঁস করা, র্যানসমওয়্যার হামলা ও ডিডিওএস আক্রমণ চালানোর জন্য পরিচিত। ডিডিওএস আক্রমণের মাধ্যমে ইন্টারনেট পরিষেবাকে অতিরিক্ত ট্রাফিক দিয়ে অচল করে দেওয়া হয়।
‘ক্রাউডস্ট্রাইক’-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম মেয়ার্স বলেছেন, বর্তমান এ সাইবার তৎপরতা আরও বড় ধরনের বা আগ্রাসী অভিযানের পূর্বসংকেত হতে পারে।
“ইরানপন্থী হ্যাকার ও হ্যাকার দলগুলো এরইমধ্যে তথ্য সংগ্রহ ও ডিডিওএস আক্রমণ শুরু করেছে। আর এমন আলামত ক্রাউডস্ট্রাইক দেখতে পাচ্ছে।”
শনিবার সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানোমালি’ বলেছে, ইরান সরকারের মদদপুষ্ট হ্যাকাররা হামলার আগেই ইসরায়েলি বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ‘ওয়াইপার’ আক্রমণ চালাচ্ছে। এ সাইবার আক্রমণে সিস্টেমের সব ধরনের তথ্য মুছে ফেলা হয়।
মার্কিন সাইবার কর্মকর্তারা প্রায়ই রাশিয়া ও চীনের পাশাপাশি ইরানকেও আমেরিকার নেটওয়ার্কের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে অতীতে নিজেদের ভূখণ্ডে হামলার জবাবে তেহরানের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ সীমিত।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, গেল জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পর ইরানের ডিজিটাল সক্ষমতা নিয়ে যে ধরনের বিধ্বংসী সাইবার হামলার আশঙ্কা করেছিল, তার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। কেবল আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সাময়িক সময়ের জন্য ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হওয়ার খবর মিলেছিল।