Published : 14 May 2026, 10:05 AM
ফিলিস্তিনিদের ওপর নজরদারি চালাতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে এক অভ্যন্তরীণ তদন্তের জেরে পদত্যাগ করেছেন মাইক্রোসফটের ইসরায়েলি শাখার প্রধান।
অভিযোগ উঠেছে, মাইক্রোসফটের ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে লাখ লাখ ফিলিস্তিনির ব্যক্তিগত ফোনালাপের তথ্য জমা রেখেছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘ইউনিট ৮২০০’। এ ঘটনাকে মাইক্রোসফটের নৈতিক নীতিমালা ও সেবার শর্তাবলির চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত বছর। ওই সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে লিখেছিল, ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক আকারে নজরদারি চালাতে এবং গণহারে তাদের ফোন কল সংগ্রহ করতে মাইক্রোসফটের অ্যাজিউর ব্যবহার করছে ইসরায়েলি বাহিনী।
এ গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল মাইক্রোসফট।
গার্ডিয়ান, ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম ‘+৯৭২ ম্যাগাজিন’ ও হিব্রু ভাষার ‘লোকাল কল’-এর যৌথ অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
এ যৌথ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে আড়ি পাতা বড় তথ্যভাণ্ডার জমা রাখার জন্য মাইক্রোসফটের ‘অ্যাজিউর ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম’ ব্যবহার করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থা ‘ইউনিট ৮২০০’।
এ প্রতিবেদন প্রকাশর পর মাইক্রোসফটের নির্দেশে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ এ তদন্তটি সম্প্রতি শেষ হয়েছে।
তদন্তের ফলাফল বিস্তারিতভাবে প্রকাশ না করা হলেও এ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলেছে, এর রেশ ধরেই গেল সপ্তাহে মাইক্রোসফট ইসরায়েলের মহাব্যবস্থাপক অ্যালন হাইমোভিচ পদত্যাগ করেছেন।
সোমবার ইসরায়েলি বাণিজ্য সংবাদপত্র ‘গ্লোবস’ বলেছে, মাইক্রোসফটের নৈতিক আচরণবিধি লঙ্ঘনের এক বিতর্কের জেরে হাইমোভিচকে বিদায় নিতে হয়েছে। কেবল তিনি নন, কোম্পানিটির আরও বেশ কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাও তাদের পদ ছেড়েছেন।
এ তদন্ত শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মাইক্রোসফট নিশ্চিত হয়েছে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘ইউনিট ৮২০০’ কোম্পানিটির সেবার শর্তাবলি লঙ্ঘন করেছে।
মাইক্রোসফটের নীতি অনুসারে, গণ-নজরদারির কাজে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফলে কোম্পানিটি দ্রুত ওই ইউনিটের ক্লাউড সেবা ও এআই পণ্য ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে, যা নজরদারি প্রকল্পের সহায়তায় ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল।
অ্যাজিউর-এর প্রায় সীমাহীন তথ্য ধারণসক্ষমতা ও প্রসেসিং সক্ষমতা ব্যবহার করে ‘ইউনিট ৮২০০’ এমন এক বিচারহীন নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, যার মাধ্যমে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রতিদিন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিকের সেলফোন কল সংগ্রহ, পুনরায় শোনা ও বিশ্লেষণ করতে পারতেন।
অ্যাজিউর-এর ওপর এ নজরদারি প্রকল্পের নির্ভরশীলতার বিষয়টি মাইক্রোসফটের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের তৈরি করেছে।
তাদের সন্দেহ ছিল, ইসরায়েলভিত্তিক কিছু কর্মী ‘ইউনিট ৮২০০’-এর মাধ্যমে এ প্রযুক্তির অপব্যবহারের বিষয়টি সম্ভবত সদর দপ্তরের কাছে পুরোপুরি গোপন করেছিলেন বা স্বচ্ছতা বজায় রাখেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন বিষয়ক সংগঠন ‘কভিংটন অ্যান্ড বার্লিং’য়ের আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত এ তদন্ত কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলেছে, কর্মীদের এই অস্বচ্ছতার বিষয়টিই ছিল তদন্তের অন্যতম প্রধান দিক।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবস’-এর তথ্যমতে, তদন্তকারী দলটি তেল আবিবের কাছে মাইক্রোসফট ইসরায়েলের অফিস পরিদর্শনের পর আলন হাইমোভিচকে তলব করা হয়েছিল।
গার্ডিয়ান-এর হাতে আসা কিছু নথি থেকে আভাস মিলেছে, ২০২১ সালে মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সাত্যিয়া নাদেলা ও গোয়েন্দা ইউনিটটির তৎকালীন কমান্ডারের মধ্যে একটি বৈঠকের পর মাইক্রোসফট ইসরায়েল ও ইউনিট ৮২০০-এর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে হাইমোভিচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
এ সম্পর্কের অংশ হিসেবে তিনি গোয়েন্দা সংস্থাটির সঙ্গে এক পার্টনারশিপের বিষয়ও তদারকি করেছেন। যার লক্ষ্য ছিল অ্যাজিউর ক্লাউড প্ল্যাটফর্মের ভেতরে বিশেষ ও সুরক্ষিত এক অংশ তৈরি করা, যেখানে সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য রাখা যাবে।
এমনটি সম্পন্ন হওয়ার পর ‘ইউনিট ৮২০০’ ফিলিস্তিনিদের প্রতিদিনের যোগাযোগের সেই বড় আর্কাইভ মাইক্রোসফটের ক্লাউড সার্ভারে সরিয়ে নিতে শুরু করে।
এ বিষয়ে গার্ডিয়ানের মন্তব্যের জন্য অনুরোধে সাড়া দেননি হাইমোভিচ।
তবে গত সপ্তাহে কর্মীদের কাছে পাঠানো এক বিদায়ী ইমেইলে তিনি দাবি করেছেন, তিনি ইসরায়েলকে ‘বিশ্বজুড়ে মাইক্রোসফটের অন্যতম দ্রুত গড়ে ওঠা বাজারে’ পরিণত করেছেন।
এর আগে, মাইক্রোসফট বলেছিল, নাদেলাসহ তাদের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানতেন না যে, ‘ইউনিট ৮২০০’ ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিগত ফোনালাপ জমা রাখার জন্য অ্যাজিউর ব্যবহার করছে।
গত বছর কোম্পানির ভাইস-চেয়ারম্যান ও প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড স্পিথ বলেছিলেন, “বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গণ-নজরদারি চালানোর সুবিধার্থে আমরা কোনো প্রযুক্তি সরবরাহ করি না।”