Published : 03 Apr 2026, 05:09 PM
ব্রিটিশ নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল হোরাটিও নেলসনের আক্রমণে ডুবে যাওয়ার ২২৫ বছরেরও বেশি সময় পর কোপেনহেগেন বন্দরের তলদেশে এক ডেনিশ যুদ্ধজাহাজের সন্ধান পেয়েছেন সামুদ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান লিখেছে, বন্দরে নতুন আবাসন প্রকল্প শুরুর আগেই ঘুটঘুটে অন্ধকার ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের ৪৯ ফুট গভীরে ১৯ শতকের এ ঐতিহাসিক জাহাজ ‘ড্যানিব্রোগে’র ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারে নেমেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা, যা ডেনমার্কের জাতীয় ইতিহাসের এক বীরত্বপূর্ণ ও শোকাতুর অধ্যায়কে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
ডেনমার্কের ভাইকিং শিপ মিউজিয়াম গত কয়েক মাস ধরে পানির নিচের এ খননকাজের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ১৮০১ সালের ঐতিহাসিক ‘ব্যাটল অফ কোপেনহেগেন’-এর ঠিক ২২৫ বছর পূর্তির দিনে বৃহস্পতিবার তারা এ আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করল।
মিউজিয়ামের সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান মর্টেন জোহানসেন বলেছেন, “ডেনমার্কের জাতীয় আবেগের এক বিশাল অংশ এ ধ্বংসাবশেষ।”
জোহানসেন বলেছেন, এ যুদ্ধ নিয়ে অনেক উৎসাহী প্রত্যক্ষদর্শী অনেক লিখেছেন। তবে “ইংরেজ যুদ্ধজাহাজগুলোর গোলার আঘাতে যখন একটি জাহাজ চুরমার হয়ে যাচ্ছিল তখন সেটির ভেতরে থাকা মানুষগুলোর অবস্থা আসলে কেমন ছিল তা আমাদের অজানা। এ ধ্বংসাবশেষটি খুঁটিয়ে দেখলে হয়ত সেই না বলা গল্পের কিছুটা আমরা জানতে পারব।”
কোপেনহেগেনের যুদ্ধে নেলসন ও ব্রিটিশ নৌবাহিনী ডেনমার্কের নৌবহরের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের পরাজিত করেছিল। তখন ডেনিশ নৌবাহিনী বন্দরের বাইরে এক সুরক্ষাব্যুহ তৈরি করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলা সেই ভয়াবহ নৌ-যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হয়, যাকে নেলসনের ক্যারিয়ারের অন্যতম ‘মহা যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচিত।
ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়া, প্রুশিয়া ও সুইডেনের মতো উত্তর ইউরোপীয় শক্তিগুলোর জোট থেকে ডেনমার্ককে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করা।
এ যুদ্ধের ঠিক কেন্দ্রে ছিল কমোডোর ওলফার্ট ফিশারের কমান্ডে থাকা ডেনমার্কের প্রধান যুদ্ধজাহাজ ‘ড্যানিব্রোগে’।
৪৮ মিটার দীর্ঘ এ ড্যানিব্রোগেই ছিল নেলসনের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। ব্রিটিশ গোলার আঘাতে প্রথমে জাহাজটির উপরের ডেক চুরমার হয়ে এবং পরবর্তীতে অগ্নিবোমার আঘাতে পুরো জাহাজে আগুন ধরে যায়।
জোহানসেন বলেছেন, “এসব জাহাজের ভেতরে থাকা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। যখন কোনো কামানের গোলা জাহাজে আঘাত করে তখন সেই গোলার চেয়েও বেশি ক্ষতি করে চারদিকে ছিটকে আসা কাঠের ধারালো বিভিন্ন টুকরা, যা অনেকটা গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের মতো কাজ করে।”
ধারণা করা হয়, এ যুদ্ধটিই ইংরেজিতে ‘টু টার্ন এ ব্লাইন্ড আই’ বা ‘চোখ বুজে থাকা’ প্রবাদটির উৎপত্তি। কথিত আছে, ওপরমহলের সংকেত বা নির্দেশ উপেক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানো নেলসন মন্তব্য করেছিলেন, “আমার তো কেবল একটি মাত্র চোখ, মাঝেমধ্যে সেই চোখে অন্ধ হয়ে থাকার অধিকার আমার রয়েছে।”
অবশেষে নেলসন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন ও ডেনমার্কের ক্রাউন প্রিন্স ফ্রেডরিক তাতে সম্মতি জানান। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ‘ড্যানিব্রোগে’ ধীরে ধীরে উত্তর দিকে ভেসে গিয়ে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হয়।
ঐতিহাসিক নথি অনুসারে, সেই বিস্ফোরণের শব্দে পুরো কোপেনহেগেন শহর কেঁপে উঠেছিল।
সামুদ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা ধ্বংসাবশেষটি থেকে দুটি কামান, ইউনিফর্ম, পদক, জুতা, বোতল ও একজন নাবিকের চোয়ালের অংশও উদ্ধার করেছেন। এ চোয়াল সেই ১৯ জন নিখোঁজ ক্রু সদস্যের একজনের, যারা সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন।
কোপেনহেগেন বন্দরের মাঝখানে ‘লিনেটহোল্ম’ নামে বড় এক আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে, যা ২০৭০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। এ নির্মাণকাজের আড়ালে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আগেই প্রত্নতাত্ত্বিকরা দ্রুত খননকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত বছরের শেষদিকে তারা এ এলাকায় জরিপ শুরু ও সেই নির্দিষ্ট স্থানটি চিহ্নিত করেন, যেখানে প্রধান যুদ্ধজাহাজটি ডুবেছিল বলে ধারণা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্ধার হওয়া কাঠের টুকরাগুলোর মাপ পুরানো নকশার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। গাছের বলয় দেখে কাঠের বয়স নির্ধারণের পদ্ধতির মাধ্যমেও নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেই জাহাজটি তৈরির বছরেরই কাঠ এটি।
পলিমাটির কারণে অন্ধকার হয়ে থাকা এ খননস্থলে কামানের গোলার ছড়াছড়ি, যা ডুবুরিদের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
ডুবুরি ও সামুদ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিক মারি জনসন বলেছেন, “মাঝেমধ্যে পানির নিচে কিছুই দেখা যায় না। তখন আমাদের হাতের আঙুল দিয়েই সব অনুভব করে দেখে নিতে হয়। চোখ নয়, যেন আঙুল দিয়েই সব দেখতে হয় আমাদের।”
বইয়ের পাতায় বা ক্যানভাসের চিত্রকর্মে স্থান পাওয়া ১৮০১ সালের এ যুদ্ধটি ডেনমার্কের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।