Published : 30 Mar 2026, 02:05 PM
মহাকাশে শুক্রাণু ডিম্বাণুর খোঁজে যাওয়ার সময় দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং পথ হারিয়ে ফেলে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
অস্ট্রেলিয়ার ‘অ্যাডিলেইড ইউনিভার্সিটি’র গবেষকরা বলছেন, কৃত্রিমভাবে তৈরি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির পরিবেশে পরীক্ষার সময় দেখা গেছে, শুক্রাণুগুলো যেন কোনো বাঁধনহীন নভোচারীর মতো যত্রতত্র ডিগবাজি খাচ্ছে।
গবেষক ড. নিকোল ম্যাকফারসন বলেছেন, “মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় এগুলো উল্টেপাল্টে যায়... আসলে কোনটা ওপর আর কোনটা নিচ তা এরা বুঝতে পারে না।”
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, নাসার ‘আর্টেমিস’ মিশনে চাঁদ ও মঙ্গলে যাওয়ার পরিকল্পনায় সহযোগী হিসেবে কাজ করছে অস্ট্রেলিয়া। অন্যদিকে, ইলন মাস্কের স্পেসএক্স-এর মতো বিভিন্ন কোম্পানিও মঙ্গলে মানুষের বসবাসের জায়গা তৈরির পরিকল্পনা করছে।
ফলে পৃথিবীর বাইরে ভিন্ন পরিবেশে মানুষ বা প্রাণীরা কীভাবে বংশবৃদ্ধি করবে তা নিয়ে বর্তমানে আগ্রহ ও গবেষণা বাড়ছে।
অ্যাডিলেইডের গবেষকরা কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তৈরিতে বিশেষ এক যন্ত্র ব্যবহার করেছেন। নভোচারীরা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএস থাকাকালীন যে ধরনের ওজনহীনতা অনুভব করেন ঠিক তেমন পরিবেশ তৈরি করেছেন তারা।

গবেষক ম্যাকফারসন বলেনছে, এ যন্ত্রের প্রভাবে কোষগুলো আসলে কোন দিকে যাচ্ছে তা আর বুঝতে পারে না। গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে ‘কমিউনিকেশন্স বায়োলজি’তে।
গবেকরা বলছেন, “মহাকাশ ভ্রমণ, গবেষণা, মঙ্গলে বসতি স্থাপন ও চাঁদে খনিজ আহরণের প্রতি বর্তমান আগ্রহের কারণে মাধ্যাকর্ষণ কীভাবে প্রজননের প্রাথমিক বিভিন্ন ধাপের ওপর প্রভাব ফেলবে তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
“বিষয়টি কেবল খাদ্যের উৎস তৈরির জন্যই নয়, বরং পৃথিবী থেকে বারবার মানুষ না পাঠিয়ে মহাকাশেই মানব বসতি টিকিয়ে রাখার জন্যও প্রয়োজন।”
গবেষক ম্যাকফারসন বলেছেন, মাধ্যাকর্ষণ নিয়ে এ গবেষণা পৃথিবীতে প্রজনন বিজ্ঞানের উন্নতিতেও সাহায্য করতে পারে।
ইউনিভার্সিটির ‘রবিনসন রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর গবেষকরা এ গবেষণার কাজে মানুষ, ইঁদুর ও শুকরের শুক্রাণু ব্যবহার করেছেন।
গবেষকরা শুক্রাণুগুলোকে ‘থ্রি ডি ক্লিনোস্ট্যাট’ মেশিনে রাখেন, যা অনবরত ঘোরার মাধ্যমে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এরপর সেগুলোকে এক গোলকধাঁধায় ছাড়া হয়, যা অনেকটা নারী প্রজননতন্ত্রের কৃত্রিম রূপ। এক্ষেত্রে নৈতিক কারণে মানুষের ডিম্বাণু রাখা হয়নি।
গবেষণায় উঠে এসেছে, মাধ্যাকর্ষণের সংস্পর্শে আসা শুক্রাণুগুলো গোলকধাঁধায় পথ খুঁজে পেতে বেশ হিমশিম খাচ্ছিল। সাধারণ অবস্থার তুলনায় মাধ্যাকর্ষণে থাকা এসব শুক্রাণুর গোলকধাঁধা পার হওয়ার হার প্রায় ৪০ শতাংশ কম। এ অবস্থা শুকর ও ইঁদুরের ভ্রূণ গঠনের প্রক্রিয়ার ওপরও প্রভাব ফেলেছে।
এ গবেষণার প্রধান গবেষক ম্যাকফারসন বলেছেন, এবারই প্রথম প্রমাণ হল, শুক্রাণুর সঠিক পথে চলার সক্ষমতার পেছনে মাধ্যাকর্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর নেতিবাচক প্রভাব থাকলেও শেষ পর্যন্ত সুস্থ ভ্রূণ গঠন করা সম্ভব।
“বিষয়টি আমাদের আশা জাগায় যে, কোনো একদিন হয়ত মহাকাশেও বংশবৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। আমরা কেবল শূন্য অভিকর্ষ নয়, বরং চাঁদ বা মঙ্গলের মতো ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাব নিয়েও আগ্রহী। কারণ আমরা জানি, সেখানে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
“বিষয়টি অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও আসলে শুক্রাণু কীভাবে নারী প্রজননতন্ত্রের ভেতর দিয়ে চলে সে সম্পর্কে আমরা মৌলিক জ্ঞান পেতে পারছি।
গবেষকরা ইউনিভার্সিটির ‘অ্যান্ডি টমাস সেন্টার ফর স্পেস রিসোর্সেস’-এর সঙ্গে যৌথভাবে এ গবেষণাটি করেছেন। এ কেন্দ্রের পরিচালক ও সহযোগী অধ্যাপক জন কাল্টন বলেছেন, “আমরা যেহেতু নভোচারী বা বহু গ্রহে বাস করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি, ফলে, প্রজননের প্রাথমিক ধাপগুলোতে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব বোঝা জরুরি।”
গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রোজেস্টেরন হরমোন যোগ করলে শুক্রাণুরা এই দিশেহারা ভাব কাটিয়ে উঠতে পারে। ডিম্বাণু প্রাকৃতিকভাবে এই হরমোন নিঃসরণ করে, যা শুক্রাণুকে সঠিক পথ দেখাতে পথপ্রদর্শকের মতো কাজ করে।
ম্যাকফারসন আরও বলেছেন, পৃথিবীর সুরক্ষা বলয় ছেড়ে মহাকাশে গেলে নভোচারীরা যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার হন সেটিও শুক্রাণুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মহাকাশে প্রজনন প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ।
‘অ্যাডিলেইড ইউনিভার্সিটি’র এ গবেষণায় ১৯৮৭ সালের ‘কসমস ১৮৮৭’ অভিযানের এক গবেষণার কথা উল্লেখ রয়েছে, সেখানে মহাকাশে থাকা ইঁদুরের জননেন্দ্রিয়ের আকার বা ওজন কমে যেতে দেখা গিয়েছিল।
এ ছাড়া ১৯৯৮ সালে কলাম্বিয়া স্পেস শাটলে ইঁদুরের ভ্রূণ নিয়েও পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। ২০১৮ সালে নাসা ওজনহীনতার প্রভাব বুঝতে ‘মাইক্রো-১১’ মিশনের মাধ্যমে আইএসএসে মানুষের শুক্রাণু পাঠিয়েছিল।
মার্কিন এ মহাকাশ সংস্থাটি বর্তমানে প্রজনন ও বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের ওপর নিয়মিত কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
২০২৪ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে দাবি করেছিল, মাস্ক মঙ্গলে বসতি স্থাপনের জন্য নিজের শুক্রাণু দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে, মাস্ক এ দাবি অস্বীকার করেন।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিজ্ঞানীরা মহাকাশে প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আরও গবেষণার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, মাধ্যাকর্ষণ ও তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাব সম্পর্কে তথ্যের অভাব দূর করতে এবং নৈতিক নীতিমালা তৈরিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন ‘জরুরিভাবে প্রয়োজন’।