Published : 08 Dec 2025, 02:22 PM
নেপোলিয়নের পরাজয়ের পেছনে ভয়াবহ সংক্রমণ বা প্রাণঘাতী রোগ দায়ী থাকার প্রমাণ প্রাচীন এক ডিএনএ বিশ্লেষণে মিলেছে বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।
প্যারিসের ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউট’-এর বিজ্ঞানীরা বলছেন, ১৮১২ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সেনারা রাশিয়া আক্রমণ করেছিল। সেই আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর পিছু হটার সময় সৈন্যদের মধ্যে মারাত্মক সংক্রামক রোগের কারণে বহু প্রাণহানি ঘটতে পারে।
এ যুগান্তকারী গবেষণায় ফরাসি সৈন্যদের দেহাবশেষ বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা এবং ‘প্যারাটাইফয়েড ফিভার’ ও ‘রিলাক্সিং ফিভার’-এর মতো দুটি গুরুতর রোগের জীবাণু খুঁজে পেয়েছেন তারা।
গবেষণার ফলাফলে এ জীবাণুর সন্ধান মেলায় ১৮১২ সালের সেই ব্যর্থ সামরিক অভিযানের সময় সৈন্যরা অসুস্থতার যেসব উপসর্গের কথা বলেছিলেন তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মিলল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
গবেষণাটি প্রথমে গত জুলাইয়ে প্রিপ্রিন্ট হিসেবে প্রকাশ পায় এবং পরে তা প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘কারেন্ট বায়োলজি’তে।
গবেষণা দলটিতে ছিলেন ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউটে’র ‘মাইক্রোবিয়াল পেলিওজেনোমিক্স ইউনিট’ ও ‘এক্স মার্সেই ইউনিভার্সিটি’-এর ‘ল্যাবরেটরি অফ বায়োকালচারাল অ্যানথ্রোপলজি’-এর বিজ্ঞানীরা।
গবেষকরা ১৩ জন ফরাসি সৈন্যের প্রাচীন ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করেছিলেন। এ দেহাবশেষগুলো ২০০২ সালে পাওয়া গিয়েছিল লিথুয়ানিয়ার ভিলনিয়াসের এক গণকবরে।
নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণ ‘১৮১২ সালের দেশপ্রেমের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত, যা বিপর্যয়করভাবে পিছু হটার মধ্যদিয়ে শেষ হয়েছিল। নেপোলিয়নের শক্তিশালী সেনাবাহিনীতে একসময় প্রায় পাঁচ লাখ থেকে ছয় লাখ সৈন্য ছিল, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই মারা গিয়েছিলেন। অনেক সৈন্য মারা গিয়েছিল ঠান্ডা, ক্ষুধা ও অবসাদের কারণে।
এ নতুন গবেষণাটি জোরালো প্রমাণ দিচ্ছে, সৈন্যদের ব্যাপক মৃত্যুর পেছনে সংক্রামক রোগও একটি বড় কারণ হতে পারে।
সংক্রমণের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় কি না তা দেখতে সৈন্যদের হাড় ও দাঁত পরীক্ষা করতে উন্নত জিন-সিকোয়েন্সিং টুল ব্যবহার করেছেন বিজ্ঞানীরা। দুটি ভিন্ন রোগ তৈরিকারী ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ খুঁজে পেয়েছেন তারা।
গবেষকরা বলছেন, চারজন সৈন্যের মধ্যে ‘সালমোনেলা এন্টেরিকা প্যারাটাইফি সি’ ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ মিলেছে, যা প্যারাটাইফয়েড জ্বরের কারণ। আর দুইজন সৈন্যের মধ্যে ‘বোরেলিয়া রিরেকটিস’ ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ পাওয়া গিয়েছে, যা ছিল রিলাক্সিং জ্বরের কারণ।
রিলাক্সিং জ্বর উকুনের মাধ্যমে ছড়ায় এবং এর ফলে জ্বর আসা ও কমার পর্যায়ক্রমিক ঢেউ দেখা যায়। অন্যদিকে, প্যারাটাইফয়েড জ্বর গুরুতর পেটের সমস্যা ও দুর্বলতা তৈরি করে। যেসব সৈন্য আগে থেকেই কষ্ট পাচ্ছিলেন বিশেষ করে ঠান্ডা, ক্ষুধা ও অবসাদের কারণে তাদের আরও বেশি দুর্বল ও অসহায় করে তুলেছিল এ দুটি সংক্রমণ।
প্রথমবারের মতো নেপোলিয়নের সৈন্যদের মধ্যে জিনগতভাবে নিশ্চিত করা এই দুটি রোগের জীবাণু পাওয়া গেল। গবেষণায় নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কম ছিল। ভিলনিয়াসের গণকবরে সমাহিত হাজার হাজার সৈন্যের মধ্যে কেবল ১৩ জন সৈন্যকে নিয়ে পরীক্ষা করেছেন গবেষকরা। তবে গবেষণার ফলাফল সৈন্যদের মধ্যে জ্বর ও রোগ সংক্রান্ত অতীতের বিভিন্ন গবেষণার সঙ্গে মিলে যায়।
আগের বিভিন্ন গবেষণাতে এরইমধ্যে অন্যান্য রোগের কারণ খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, যেমন টাইফাস ও ট্রেঞ্চ জ্বর তৈরিকারী ব্যাকটেরিয়া, যা থেকে ইঙ্গিত মেলে, নেপোলিয়নের বাহিনী পিছু হটার সময় একাধিক মহামারীর শিকার হয়েছিল।
গবেষণায় উঠে এসেছে, এসব সংক্রমণ ঠিক কতটা ব্যাপক ছিল তা প্রকাশ না করলেও প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্বল জীবনযাত্রার পাশাপাশি মারাত্মক জীবাণুও সৈন্যদের মৃত্যুতে ভূমিকা রাখতে পারে। অভিযান চলাকালীন প্রায় তিন লাখ সৈন্য মারা গিয়েছিলেন এবং অনেক সৈন্যই আর ফ্রান্সে ফিরে যেতে পারেননি।
প্রধান বিজ্ঞানী নিকোলাস রাসকোভান বলেছেন, প্রাচীন ডিএনএ গবেষণা করলে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন কীভাবে এসব রোগ বিকশিত হয় ও ছড়িয়ে পড়ে। এই জ্ঞান বর্তমানে বিভিন্ন সংক্রমণ ঠেকানোর পদ্ধতিকে উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণায় এক বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করেছে তার গবেষণা দলটি, যা ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ-এর সামান্য পরিমাণকেও শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এ পদ্ধতির কারণে প্রাচীন ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত ও নির্দিষ্ট স্ট্রেন চিহ্নিত করতে পেরেছেন তারা।
এ গবেষণার ফলাফলকে ঐতিহাসিক রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে গবেষকরা বলছেন, তারা যেসব রোগের (জ্বর, ক্লান্তি ও হজমের সমস্যা) জীবাণু শনাক্ত করেছেন সেগুলোর লক্ষণ ১৮১২ সালের রাশিয়া থেকে পিছু হটার সময়কার বেঁচে থাকা সৈন্যরা যা বর্ণনা করেছিলেন তার সঙ্গে মিলে যায়।
রাশিয়ায় নেপোলিয়নের পরাজয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল, যা তার সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ। গবেষণায় উঠে এসেছে, তুষারশীতল তাপমাত্রা ও খাদ্যের অভাবের পাশাপাশি সংক্রামক রোগও ছিল নেপোলিয়নের পরাজয়ের এক নীরব শত্রু, যা ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেনাদলকে ধ্বংস করতে সাহায্য করেছিল।