Published : 20 Apr 2026, 10:10 AM
অ্যাপোলো ৮ এর তোলা সেই ঐতিহাসিক পৃথিবীর উদয় ছবির প্রায় ৫৮ বছর পর আর্টেমিস টু মিশনের নভোচারীরা আবারও ক্যামেরাবন্দি করেছেন পৃথিবীকে।
অর্ধশতাব্দীর এই ব্যবধানে পৃথিবী আর আগের মতো নেই। মহাকাশ থেকে তোলা এসব নতুন ছবি যেমন পৃথিবীর সৌন্দর্যের জানান দিয়েছে তেমনই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন আর মানুষের কর্মকাণ্ডে গত ছয় দশকে কতটা বদলেছে মানুষের এই একমাত্র ঠিকানা।
আর্টেমিস টু মিশনের নভোচারীদের তোলা নতুন বিভিন্ন ছবিতে ভঙ্গুর পৃথিবীর অবস্থা উঠে এসেছে বরে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
১৯৬৮ সালে অ্যাপোলো ৮ এর কমান্ডার ফ্রাঙ্ক বোরম্যান মহাকাশযানের জানালা দিয়ে প্রথমবার চাঁদের উল্টো পিঠ দেখেছিলেন এবং এর রিক্ত রূপ দেখে অবাক হয়েছিলেন।
২০১৮ সালে বিবিসি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “চাঁদের পৃষ্ঠ উল্কাপাত আর আগ্নেয়গিরির ধ্বংসাবশেষে ভয়াবহভাবে ক্ষতবিক্ষত ছিল। সেখানে ধূসর, কালো আর সাদা ছাড়া অন্য কোনো রং ছিল না। পুরো জায়গাটা অকল্পনীয়ভাবে অগোছালো ছিল।”
তবে মহাকাশযানটি চাঁদের চতুর্থ কক্ষপথ প্রদক্ষিণ শেষ করার সময় হঠাৎ করেই তাদের চোখের সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য ভেসে উঠল।
বোরম্যান বলেছেন, “আমরা উপরের দিকে তাকালাম এবং দেখলাম চাঁদের দিগন্ত ছাপিয়ে পটভূমিতে পৃথিবী উঠে আসছে। ওই সময়ই অ্যান্ডার্স সেই ছবিটি তুলেছিলেন, যা সম্ভবত মানবজাতির তোলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবির একটি হয়ে উঠেছে।

“পুরো মহাবিশ্বে কেবল পৃথিবীই ছিল রঙিন। আমাদের কাছে এ ছিল এক অসাধারণ দৃশ্য। আমরা সত্যিই খুব ভাগ্যবান যে, এই গ্রহে আমরা বাস করি।”
‘আর্থরাইজ’ বা পৃথিবীর উদয় নামে পরিচিত এ ছবিটি ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত ছবিতে পরিণত হয়েছে।
জনমানবহীন ধূসর চাঁদ ও মহাকাশের বিশাল শূন্যতার মধ্যে পৃথিবীর এই রূপ দেখে মানুষ পরিবেশ রক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। এর ফলে ১৯৭০ সালে প্রথমবারের মতো ‘ধরিত্রী দিবস’ পালন শুরু হয়।
৫৮ বছর পর, নাসার নভোচারীরা চাঁদের রুক্ষ পাহাড়ের আড়ালে পৃথিবীর ডুবে যাওয়ার বা ‘আর্থসেট’-এর আরেকটি চমৎকার ছবি তুলেছেন। এ মাসের শুরুতে চাঁদ প্রদক্ষিণের সময় আর্টেমিস টু মিশনের ক্রুরা মহাকাশের বিশালতায় এই ভঙ্গুর পৃথিবীর নতুন ছবি তুলেছেন।
তবে এবার ছবিটি ঠিক কে তুলেছেন তা জানা যায়নি। কারণ চারজন নভোচারীই ব্যক্তিগত কৃতিত্ব না নিয়ে পুরো দলের নামে ছবিটির পরিচয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ভূতাত্ত্বিক সময়ের বিচারে অর্ধশতাব্দী বা ৫০ থেকে ৬০ বছর কোনো দীর্ঘ সময়ই নয়, বলতে গেলে চোখের পলকের সমান। তবে গত ছয় দশকে জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর উপরিভাগে অনেক পরিবর্তন এনেছে।
১৯৬৮ সালের ‘আর্থরাইজ’ ও ২০২৬ সালের ‘আর্থসেট’ ছবির মধ্যে দৃশ্যমান পার্থক্য কী এবং এসব ছবি তখনকার ও এখনকার পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের কী বার্তা দেয় তা নিয়ে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও ঐতিহ্য থাকার পরও ‘আর্থরাইজ’ ছবির ব্যাপারে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, নাসার কেউ আগে থেকে এমন কিছুর কথা ভাবেনি।
নাসার প্রথম সম্পূর্ণ ‘বেসামরিক’ মহাকাশ মিশন-এর পাইলট ও মার্কিন নভোচারী সিয়ান প্রক্টর বলেছেন, “তারা এমন দৃশ্য ঘটনাক্রমে ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। অ্যাপোলো ৮ আমাদের গ্রহকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল। আমার মনে হয় এই মুহূর্তে আমাদের ঠিক তেমন কিছুরই প্রয়োজন, যা আরও বেশি অনুপ্রেরণার হবে।”
আর্টেমিস মিশনের উৎক্ষেপণ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নতুন ‘আর্থরাইজ’ ছবির পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, এবার নাসা ছবি তোলার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করতে চায়নি।
নাসার এক্সপ্লোরেশন সিস্টেমস ডেভেলপমেন্ট মিশন ডিরেক্টরেটের প্রধান লরি গ্লেইজ বলেছেন, “এমন এক মুহূর্ত আবার ক্যামেরাবন্দির জন্য আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সবকিছুই করব।”
‘আর্থসেট’ ছবিটি গত ৬ এপ্রিল চাঁদের খুব কাছ দিয়ে সাত ঘণ্টাব্যাপী ভ্রমণের সময় যুক্তরাষ্ট্র সময় সন্ধ্যা ৬ টা ৪১ মিনিটে ও বাংলাদেশ সময় ৭ এপ্রিল ভোর ৪ টা ৪১ মিনিটে ওরিয়ন মহাকাশযানের জানালা দিয়ে তোলা হয়েছিল।
নাসা ছবিটির বর্ণনায় উল্লেখ করেছে, “পৃথিবীর আলোকিত অংশে ওশেনিয়া অঞ্চলের ওপর সাদা মেঘ ও নীল জলরাশি দেখা যাচ্ছে, আর অন্ধকার অংশগুলোতে তখন রাত।
“ছবিতে চাঁদের উপরিভাগ এবং এর একটির ওপর আরেকটি উঠে আসা অসংখ্য গর্ত ও অববাহিকার বিস্ময়কর সূক্ষ্মতা ফুটে উঠেছে।”
১৯৬৮ সালের পরিস্থিতির তুলনায় ২০২৬ সাল অনেক আলাদা। এখন অসংখ্য স্যাটেলাইট প্রতিদিন পৃথিবীর হাজার হাজার ছবি তোলে। এগুলো কেবল আমাদের চোখের দৃশ্যমান আলোতেই নয়, বরং মাইক্রোওয়েভ থেকে শুরু করে অতিবেগুনি রশ্মি পর্যন্ত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রামের সব স্তরে সমুদ্র, স্থলভাগ ও বরফের ওপর নজরদারি চালায়।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএস থেকে এখন নিয়মিত ভিডিও ফিড পাওয়া যায় এবং রোবোটিক বিভিন্ন মহাকাশযান চাঁদ বা তার চেয়েও দূর থেকে পৃথিবীর ছবি তুলেছে। তবে ‘আর্থসেট’ ছবিটি মানুষের হাতে তোলা হয়েছে বলেই তা অন্য সবকিছুর চেয়ে আলাদা।

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা বা ইএসএ-এর পরবর্তী প্রজন্মের স্যাটেলাইট পরিকল্পনার তদারককারী ক্রেগ ডনলন বলেছেন, মানুষের তোলা ছবি আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি উপহার দিয়েছে।
“একজন মানুষের তোলা ছবি সুন্দরভাবে ফ্রেম ও ফোকাস করা থাকে। নভোচারী যখন শাটার টেপেন তখন তার অবচেতন মনে কিছু একটা কাজ করে এবং সেই অনুসারে তিনি ঠিক সেই মুহূর্তটিই বেছে নেন। বিষয়টি মনের মধ্যে এক ধরনের আবেগ তৈরি করে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ‘আহা, ওই ছোট্ট পৃথিবীটাই আমাদের ঠিকানা, ওখানেই আমাদের সব কিছু’।”
তবে কেবল মানবিক অনুভূতির কারণেই ‘আর্থরাইজ’ ও ‘আর্থসেট’ ছবি দুটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রায় ৫৮ বছরের ব্যবধানে তোলা এসব ছবি পৃথিবী কতটা বদলেছে তাও বুঝতে সাহায্য করেছে।
যুক্তরাজ্যের ‘রিডিং ইউনিভার্সিটি’র ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর আর্থ অবজারভেশন’-এর জলবায়ু বিজ্ঞানের অধ্যাপক রিচার্ড অ্যালান বলেছেন, “আর্থরাইজ ছবিটির পর থেকে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।
“মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে মহাকাশ থেকে দেখা আমাদের পৃথিবীর উপরিভাগের গঠনও বদলেছে। শহরগুলো আয়তনে বেড়েছে, ঘন অন্ধকার বনভূমি উজাড় করে সেখানে উজ্জ্বল কৃষিজমি তৈরি হয়েছে।
“এ ছাড়া আরাল সাগর শুকিয়ে যাওয়ার পেছনেও মানুষের ভূমিকা আছে, যা ১৯৬০ এর দশকের তুলনায় বর্তমানে ১০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে।”
পৃথিবী মেঘে ঢাকা থাকলেও এ পরিবর্তনের কিছু ছাপ ছবিগুলোর মধ্যেই দেখা যায়।
যুক্তরাজ্যের ‘লিডস ইউনিভার্সিটি’র হিমবাহ বিশেষজ্ঞ বেঞ্জামিন ওয়ালিস বলেছেন, “ছবি দুটি পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন অংশের হলেও একটি বিষয় উভয় ছবিতেই ফুটে উঠেছে।
“যেমন, অ্যান্টার্কটিকা ও দক্ষিণ মহাসাগর। অ্যান্টার্কটিকা উপদ্বীপ পৃথিবীর অন্যতম দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা অঞ্চল। ১৯৬৮ সালের প্রথম ছবি এবং এ সাম্প্রতিক ছবির মধ্যবর্তী সময়ে সেখানে প্রায় ২৮ হাজার বর্গকিলোমিটার বরফস্তর ধসে পড়েছে।”
গবেষণা অনুসারে, অ্যান্টার্কটিকার বরফের এ পরিবর্তন গত ১০ হাজার বছরের মধ্যে নজিরবিহীন। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল যেখানে পানি বরফ আকারে জমা থাকে, যাকে ক্রায়োস্ফিয়ার বলে সেগুলোও একইভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে।
‘ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভে’র বিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক পেট্রা হেইল বলেছেন, “আমরা সত্যিই কিছু নাটকীয় পরিবর্তন দেখেছি। এখন উভয় গোলার্ধেই ঋতুভিত্তিক সামুদ্রিক বরফের আবরণ মারাত্মকভাবে কমেছে। উত্তর আমেরিকা, ইউরেশিয়া ও এশিয়ায় এখন দেরিতে তুষারপাত শুরু হচ্ছে এবং খুব দ্রুত তা গলে যাচ্ছে।
“পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন গাণিতিক মডেলের ওপর ভিত্তি করে আমরা ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ নিশ্চিত, এ পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ মানুষের নানাবিধ কর্মকাণ্ড।”
তবে এসব তথ্য শুনে মন খারাপ হলেও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ১৯৬৮ সালেও মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে যতই নিখুঁত দেখাক না কেন মানুষ ততদিনে পৃথিবীর বেশ ক্ষতি করে ফেলেছে।
‘আর্থ ডে নেটওয়ার্ক’-এর প্রেসিডেন্ট ক্যাথলিন রজার্স বলেছেন, “আর্থরাইজ ছবিটি অনেক মানুষকে মুগ্ধ করেছিল। একইসঙ্গে আমাদের বোঝাতে পেরেছিল, পৃথিবী কত সুন্দর ও আমরা এর কতটা ক্ষতি করছি। আমার মনে আছে, সেই সময় লস অ্যাঞ্জেলেসে অফিস যাওয়ার ব্যস্ত সময়ে ঘন কুয়াশার কারণে রাস্তার ওপাশ দেখা যেত না।
“অনেক দূর থেকে পৃথিবীকে খুব নিখুঁত ও সুন্দর মনে হলেও আপনি যখন কাছে আসবেন তখন গত ১৫০ বছরের তথাকথিত ‘উন্নয়ন’-এর ধ্বংসলীলা আপনার চোখে পড়বে। তবে আর্থরাইজ ছবি একটি পুরো প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছিল পরিবেশ রক্ষায় সোচ্চার এবং আন্দোলনের অংশ হতে।”
বোরম্যান ২০২৩ সালে মারা যান। তবে তার অ্যাপোলো ৮ মিশনের ঐতিহ্য আজও অম্লান। নতুন প্রজন্মের নভোচারীদের জন্য তার সেইসব কথা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
তিনি বলেছিলেন, “আমি মনে করি না আমাদের মধ্যে কেউ তখন এটা ভেবেছিল যে, আমরা এতদূর পথ পাড়ি দিয়ে চাঁদে যাব ঠিকই তবে আমাদের মূল আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে (ফিরে ফিরে) পৃথিবীকে দেখা।”