Published : 25 Jan 2026, 12:05 PM
ইউনিকর্ন শব্দটির সঙ্গে আমাদের সাবারই কমবেশি পরিচয় রয়েছে। যেসব প্রযুক্তি স্টার্টআপের বাজারমূল্য ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের বেশি এদের ইউনিকর্ন বলে। তবে ২০২৬ সালটি হতে যাচ্ছে ‘হেক্টোকর্ন’ বছর। কারণ, এ বছর বেশ কিছু মার্কিন ও ইউরোপীয় কোম্পানি ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বাজারমূল্য নিয়ে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান লিখেছে, ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, স্পেসএক্স ও স্ট্রাইপ-এর মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানি এ বছর নিজেদের আইপিও বা প্রাথমিক শেয়ার ছাড়ার কথা বিবেচনা করছে।
এসব কোম্পানির শেয়ার বাজারে আসার সাফল্য, অর্থাৎ এদের শেয়ারের দাম স্থিতিশীল থাকে নাকি বাড়ে-কমে এর ওপর নির্ভর করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে চলমান প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎ। পাশাপাশি বোঝা যাবে, বর্তমান বাজারের এই এআই উন্মাদনা কি কেবল সাময়িক বুদ্বুদ নাকি দীর্ঘস্থায়ী কোনো পরিবর্তন।
কোনো কোনো কোম্পানি গত বছরই শেয়ার বাজারে আসার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি অচলাবস্থা ও বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় ব্যাপকহারে সরকারি কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণে সে পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। এ বছরটিও ভূ-রাজনৈতিকভাবে বেশ অস্থির দেখাচ্ছে, বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক শুল্ক আরোপের হুমকি এ সপ্তাহে শেয়ার বাজারে দুশ্চিন্তার ছায়া ফেলেছে।
তবে গত বছর বিশৃঙ্খলার পরও এআই প্রযুক্তির জয়জয়কারের ওপর ভর করে শেয়ার বাজার রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিনিয়োগকারীরাও আপাতত এ প্রযুক্তিতে বড় ধরনের বাজি ধরে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এ উদ্দীপনাকে কাজে লাগিয়ে শেয়ার বাজারে আসতে পারে এমন শীর্ষ সাতটি কোম্পানি সম্পর্কে এখানে জেনে নেওয়া যাক–
ওপেনএআই
যুক্তরাষ্ট্রের স্যান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক এ কোম্পানিটি ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে এআই নিয়ে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি করেছিল।
বর্তমানে অলাভজনক কোম্পানি হলেও মাইক্রোসফট ও জাপানি সফটব্যাংকের মতো বড় বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে পেরেছে ওপেনএআই। ২০২৩ সালে যেখানে কোম্পানির বাজারমূল্য ছিল ২৯০০ কোটি ডলার, গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার কোটি ডলারে।
রয়টার্স প্রতিবেদনে লিখেছে, ওপেনএআই যদি শেয়ার বাজারে আসে তবে এর বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এ বিশাল অংকের পেছনে মূল আশাটি হচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে ও ব্যক্তিগত জীবনে এআই ব্যবহারের বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং এর বিপুল চাহিদা।
এ চাহিদা এআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ডেটাসেন্টার ও কম্পিউটার চিপ তৈরিতে ব্যয় করা ট্রিলিয়ন ছাড়ানো খরচ উসুল করে দেবে। ওপেনএআই আগামী আট বছরে এআই অবকাঠামো খাতে ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এই অর্থ লাভসহ ফিরিয়ে দিতে পারবে কি না সে বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে হবে কোম্পানিটির।
‘স্যাক্সো ক্যাপিটাল মার্কেটস’-এর বিশ্লেষক নিল উইলসন বলেছেন, “পুরো এআই অর্থনীতি এবং এটি কি কোনো সাময়িক বুদবুদ বা ঠুনকো ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তা যাচাইয়ের জন্য ওপেনএআই হচ্ছে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।”
অ্যানথ্রপিক
ওপেনএআইয়ের মতো যুক্তরাষ্ট্রে স্যান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক এ স্টার্টআপটিও এখনও মুনাফার মুখ দেখেনি। জনপ্রিয় চ্যাটবট ‘ক্লড’ এবং বর্তমানে ব্যাপক সাড়া জাগানো ‘ক্লড কোড’-এর নির্মাতা অ্যানথ্রপিক।
এ মাসেই কোম্পানিটি ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রাথমিক এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যা এর বাজারমূল্যকে ৩৫ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছে দিয়েছে।
অ্যানথ্রপিক যদি শেয়ার বাজারে আসে তবে এর প্রভাব কেবল এআই প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারণ, কোম্পানির অনেক কর্মী ‘ইফেক্টিভ অলট্রুইজম’ আন্দোলনকে সমর্থন করেন।
বিভিন্ন ইন্টারনেট ফোরামের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে এসব কর্মী যখন বড় অংকের নগদ অর্থ হাতে পাবেন তখন সেই অর্থের বড় অংশ এ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হতে পারে।
স্পেসএক্স
ইলন মাস্কের এ কোম্পানিটি গত ডিসেম্বরে ৮০ হাজার কোটি ডলার বাজারমূল্যে পৌঁছেছে এবং শেয়ার বাজারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে রয়টার্সের হাতে আসা নথিতে শেয়ার বাজারে আসার বিষয়ে কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ব্রেট জনসেন বলেছেন, “এমনটি আসলে ঘটবে কি না বা কখন ঘটবে ও কত বাজারমূল্য নিয়ে ঘটবে তা এখনও অনিশ্চিত।”
‘প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্স’-এর মাইক বেলিন বলেছেন, একদিকে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রযুক্তি, মহাকাশ বিজ্ঞান ও প্রতিরক্ষা খাতের সমন্বয় বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এর প্রভাব স্পেসএক্সের ওপর পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, রিসার্চ ফার্ম ‘ফরস্টার’-এর বিশ্লেষক মার্ক মকিয়া বলেছেন, মাস্ক ও তার অপর কোম্পানি টেসলার ভাবমূর্তির কারণে এই আইপিও-র ফলাফল আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। কারণ, এখানে ‘প্রতিষ্ঠানিক ও খুচরা উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীর এক বিশাল সমাগম ঘটবে’।
‘স্যাক্সো ক্যাপিটাল মার্কেটস’-এর বিশ্লেষক নিল উইলসন বলেছেন, “স্পেসএক্সের দিকেই এ বছর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মূল নজর থাকবে। কারণ কোম্পানিটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে এবং এর সঙ্গে মাস্কের নামও জড়িয়ে আছে।”
ক্রাকেন
বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ‘ক্রাকেন’। তবে ক্রাকেন’কে ব্রিটিশ জ্বালানি কোম্পানি ‘অক্টোপাস’-এর সফটওয়্যার শাখা হিসেবে ভুল করা যাবে না। ক্রাকেন শেয়ার বাজারে আসার জন্য গত নভেম্বরেই প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়েছে। ওই সময় এর বাজারমূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ক্রিপ্টো কোম্পানিটিকে এ বছরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই শেয়ার বাজারে আসার জন্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতে পারে। কারণ, নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটলে ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর ট্রাম্পের বর্তমান শিথিল নীতি বা নিয়ন্ত্রণহীন মনোভাব বদলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ডেটাব্রিকস
গ্রাহকদের তাদের নিজস্ব তথ্য বা ডেটা ব্যবহার করে ‘এআই এজেন্ট’ তৈরি করতে সাহায্য করছে কোম্পানিটি। এআই এজেন্ট প্রযুক্তি মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারে। গেল বছর কোম্পানিটির আয় ৫৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে এবং গত মাসে এর বাজারমূল্য পৌঁছেছে ১৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে।
ডেটাব্রিকস-এর প্রধান নির্বাহী আলী ঘোদসি বলেছেন, বিভিন্ন ব্যবসা কোম্পানি বর্তমানে ‘এআইওয়ালা ডেটা অ্যাপ্লিকেশন’ তৈরি করছে বলেই তাদের কোম্পানির এ অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
ক্যানভা
অস্ট্রেলিয়ার প্রযুক্তি শিল্পের ‘উজ্জ্বল তারা’ ক্যানভা। গেল বছর এর বাজারমূল্য ধরা হয়েছিল সাড়ে ৬ হাজার কোটি ডলার। তবে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কোম্পানিটি নিজেদের সদরদপ্তর যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিডনিভিত্তিক এ সফটওয়্যার ডিজাইন কোম্পানিটি তাদের কর্মীদের আদর করে ‘ক্যানভানাউটস’ বলে ডাকে। বর্তমানে ক্যানভার ২৪ কোটি ব্যবহারকারী রয়েছে। এর দুই সহ-প্রতিষ্ঠাতা (স্ত্রী ও স্বামী মেলানি পারকিন্স ও ক্লিফ ওব্রেখট) ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ-এর তথ্যমতে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ধনীদের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন। তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার।
আইপিও-র সময়সীমার বিষয়ে ক্যানভার একজন মুখপাত্র বলেছেন, এই মুহূর্তে তাদের ‘বলার মতো কোনো তথ্য নেই’।
স্ট্রাইপ
অনলাইন পেমেন্ট প্রসেসিং বা লেনদেন সেবাদাতা কোম্পানিটি ২০১০ সালে আইরিশ দুই ভাই প্যাট্রিক ও জন কলিসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়া ও ডাবলিনে এর সদর দপ্তর অবস্থিত এবং দীর্ঘকাল ধরে আর্থিক প্রযুক্তি বা ‘ফিনটেক’ খাতের একটি মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত।
গত বছর প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে, স্ট্রাইপের বাজারমূল্য ১০ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা কোম্পানিটির জন্য বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানো। কারণ ২০২৩ সালে এর মূল্য কমে ৫ হাজার কোটি ডলারে নেমেছিল।
তবে আইপিও প্রসঙ্গে স্ট্রাইপের একজন মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে, গার্ডিয়ানের মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি অ্যানথ্রপিক, ক্রাকেন, স্পেসএক্স ও ডেটাব্রিকস’ও।