Published : 18 Apr 2026, 10:07 AM
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে তৎপর হয়ে উঠেছে মার্কিন বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি।
নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে তারা এখন হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি পর্যায়ে জোরদার লবিয়িং চালিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধের আবহে জরুরি পরিস্থিতি ঠেকানোর পরিকল্পনা সাজাতে দেশ ও বিদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এসব কোম্পানি। এ সংশ্লিষ্ট খাতের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্রের আলোকে এ খবর প্রকাশ করেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে, বিশেষ করে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
প্রযুক্তি খাতের ক্ষেত্রে ওই অঞ্চলে থাকা বিভিন্ন কোম্পানির সম্পদ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান উপাদানের সংকট দেখা দিতে পারে।
‘ক্যাক্সট সিএনসি’ নামের কৌশলগত যোগাযোগ পরামর্শক কোম্পানির পার্টনার শন এভিন্স বলেছেন, “এসব প্রযুক্তি কোম্পানি এখন মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক, সেখানকার স্থানীয় প্রতিনিধি এবং সেইসঙ্গে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ চালাচ্ছে।”
বড় বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি এবং ডেটা সেন্টার ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের ক্লায়েন্টদের কথা উল্লেখ করে এভিন্স বলেছেন, তারা নিজেদের লবিয়িংয়ের প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে। তবে গোপনীয়তার স্বার্থে তিনি নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
এ ক্লায়েন্টদের ঝুঁকির মাত্রা এখন কেবল ব্যবসায়িক নয়, বরং তা সরাসরি অবকাঠামোগত ঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে।
এভিন্স বলেছেন, “সমুদ্রের তলদেশের গুরুত্বপূর্ণ কেবল, সরকারি খাতের ক্লাউড সেবা, ডেটা সেন্টার এবং বিভিন্ন এন্টারপ্রাইজ সিস্টেম ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে যে কোনো ধরনের অস্থিরতা অতি দ্রুত এসব কোম্পানির আয়ের ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।”
হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-এর ফলে তৈরি সাময়িক বিশৃঙ্খলা বা বিঘ্নের বিষয়ে ‘সব সময়ই স্পষ্ট ধারণা দিয়ে এসেছেন’।
ওই মুখপাত্র আরও বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন শিল্প খাতের নেতাদের সঙ্গে “হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে, যাতে এসব বিশৃঙ্খলা কেবল কমানোই না যায়, বরং আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের ভিত্তিও মজবুত হয়।”
অবকাঠামো ও বাজারের ঝুঁকি
ইরান যুদ্ধ আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ায় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
গত মার্চে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস-এর বিভিন্ন ডেটা সেন্টারে ড্রোন হামলার পর দেশটির বিভিন্ন অ্যাপ ও ডিজিটাল বিভিন্ন পরিষেবা অচল হয়ে পড়ার খবর মিলেছে।
এপ্রিলের শুরুতে ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড মধ্যপ্রাচ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করা একগুচ্ছ মার্কিন কোম্পানির ওপর হামলার হুমকি দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে এনভিডিয়া, অ্যাপল, মাইক্রোসফট ও গুগল।
পাশাপাশি পরোক্ষ বিভিন্ন প্রভাবও রয়েছে। যুদ্ধের কারণে এরইমধ্যে চিপ তৈরি ও অন্যান্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিলিয়াম রপ্তানি ব্যাপকহারে কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ওই অঞ্চলে ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টার ও এআই অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ভাগ্য অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেটা সেন্টার অথরিটি’ বা আইডিসিএ-এর সিইও মেহেদি পারইয়াভি বলেছেন, বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি এ যুদ্ধ বন্ধের জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে লবিয়িং করছে বলে তিনি অবগত আছেন।
“প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এ সংঘাত নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। কারণ ডেটা সেন্টার, ক্লাউড পরিষেবা ও এআই কারখানা তৈরির জন্য শান্ত পরিবেশ থাকা প্রধান শর্ত।”
এভিন্স বলেছেন, “মৌলিকভাবে এসব কোম্পানি চায় যুদ্ধ যেন তাদের অবকাঠামো, বাজার ও সিস্টেমের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়।
“তারা নিজেদের কর্মীদের নিরাপত্তাও চায়। তারা এমন পরিবেশ চায়, যেখানে কাজের পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা করা যায়। উত্তেজনা থাকতে পারে, তবে অনির্দিষ্টকালের অনিশ্চয়তার চেয়ে যুদ্ধবিরতি, গোপন আলোচনা বা স্থবির সংঘাতও, বিশেষ করে যেখানে সরাসরি লড়াই বন্ধ থাকে তা এসব কোম্পানির কাছে অনেক বেশি পছন্দনীয়।”
বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে বর্তমানে আইনপ্রণয়ন বা নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ কম, যেটিকে সাধারণত ‘লবিয়িং’ বলে প্রচলিত। তার বদলে তারা এখন একটি কোম্পানি হিসেবে নিজেদের ঝুঁকির মাত্রা বা ‘রিস্ক এক্সপোজার’ নিয়ে বেশি মনোযোগী।
“তারা বাণিজ্যিক সম্পদের ওপর হামলা ঠেকাতে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং সেসব সম্পদ রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য সরকারের কাছ থেকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতির দাবি জানাচ্ছে।
“এ সংঘাত যাতে কোনোভাবেই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পর্যন্ত ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য তারা প্রকৃত অর্থেই জোরালো প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”