Published : 10 May 2026, 11:51 AM
আন্দিজ অঞ্চলের মানুষের হাজার বছরের আলুনির্ভর খাদ্যাভ্যাস তাদের দেহে স্থায়ী জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
গবষেণা বলছে, আলু হজমে সহায়তাকারী ‘এএমওয়াই১’ জিনটি পেরুর আদিবাসীদের দেহে বিশ্বের অন্য যে কোনো জনগোষ্ঠীর চেয়ে বেশি পরিমাণে রয়েছে, যার থেকে ইঙ্গিত মেলে, মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতি কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেহে ডিএনএ বা জীববিজ্ঞানকেও বদলে দিতে পারে।
রয়টার্স লিখেছে, আন্দিজ অঞ্চলের আদিবাসীরা আজ থেকে প্রায় ছয় থেকে ১০ হাজার বছর আগে আলু চাষ শুরু করেছিল। স্টার্চ, ভিটামিন, খনিজ ও আঁশজাতীয় আলু দ্রুতই তাদের প্রধান খাদ্যে পরিণত হয়।
এ খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ওই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এমন কিছু জিনগত পরিবর্তন বা অভিযোজন ঘটেছিল, যা আজও পেরুতে বাস করা তাদের বংশধরদের মধ্যে স্পষ্ট দেখা যায়।
নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, এক সময়ের বিশাল ইনকা সাম্রাজ্যের কেচুয়া ভাষাভাষী বংশধরদের শরীরে ‘এএমওয়াই১’ জিনের সংখ্যা ব্যাপকহারে বেড়েছে। জিনটি স্টার্চ বা শ্বেতসার হজমে সাহায্য করে, যা আলুনির্ভর খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত মানুষের জন্য উপকারী।
এ অঞ্চলের মানুষের দেহে গড়ে ১০টি করে ‘এএমওয়াই১’ জিন থাকে, যা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের তুলনায় দুই থেকে চারটি বেশি। গোটা বিশ্বের আর কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যেই এ জিনের এত বেশি উপস্থিতির প্রমাণ এখন পর্যন্ত মেলেনি।
গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, মানুষের মধ্যে এ জিনগত পরিবর্তনের সূচনা ঠিক সেই সময়েই হয়েছিল যখন তারা আলু চাষ ও খাওয়ার অভ্যাস শুরু করেছিল।
এ গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ বাফেলো’র বিবর্তনীয় ও নৃ-তাত্ত্বিক জেনেটিক্স বিশেষজ্ঞ ওমের গোকচুমেন বলেছেন, “আমাদের এ গবেষণা সংস্কৃতির মাধ্যমে জীবতত্ত্ব বা জীববিজ্ঞান পরিবর্তনের এক চমৎকার উদাহরণ।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ।
‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস’ বা ইউসিএলএ-এর নৃ-বিজ্ঞানী, জেনেটিক্স বিশেষজ্ঞ ও এ গবেষণার অপর প্রধান লেখক অ্যাবিগেল বিহাম বলেছেন, “গবেষণায় মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে খাবারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার গুরুত্ব উঠে এসেছে। দেহে মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া, স্বাস্থ্য ও কোনো কিছু পোষ মানানো বা চাষের ঘটনা কীভাবে মানুষের জীববিজ্ঞানের ওপর প্রভাব ফেলে তা নজরে এসেছে এ গবেষণায়।”
আণবিক স্তরে ‘এএমওয়াই১’ জিনটি ‘অ্যামাইলেজ’ নামের এনজাইম বা পাচক রস নিয়ন্ত্রণ করে। এনজাইমটি মানবদেহের লালারসে থাকে। কোনো ব্যক্তি শ্বেতসার বা স্টার্চওয়ালা খাবার (যেমন আলু) খেলে এনজাইমটি মুখেই সেই স্টার্চ ভেঙে ফেলতে শুরু করে। কোনো ব্যক্তির দেহে এ জিনের সংখ্যা যত বেশি থাকে তার দেহে এ এনজাইমটিও তত বেশি পরিমাণে তৈরি হতে পারে।
গবেষকদের মতে, জিনের এ বাড়তি সংখ্যা উচ্চ-স্টার্চওয়ালা খাবারের বিপাক প্রক্রিয়া বা হজম আরও সহজ করতে পারে। অ্যামাইলেজ এনজাইম দেহের মাইক্রোবায়োম বা দেহের অণুজীবের প্রাকৃতিক সংগ্রহ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে, যা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।
খাদ্যাভ্যাসের কারণে বিবর্তনীয় পরিবর্তনের আরেকটি উদাহরণ ল্যাকটোজ সহনশীলতা। এটি এমন জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা দুধের ল্যাকটোজ ভেঙে ফেলার এনজাইম তৈরি করে।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার ৮৫টি জনগোষ্ঠীর ৩ হাজার সাতশরও বেশি মানুষের জিনোমিক তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। যার মধ্যে পেরুর আন্দিজ অঞ্চলের ৮১ জন আদিবাসী কেচুয়া ভাষী মানুষও ছিলেন।
গবেষকরা বলেছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তনীয় বিভিন্ন শক্তি প্রাচীন আন্দিজবাসীদের মধ্যে এ জিনের অতিরিক্ত কপির উপস্থিতিকে বাড়িয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সাধারণত সেই বৈশিষ্ট্যের কোনো না কোনো বিশেষ সুবিধা কাজ করে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ বাফেলো’র ডক্টরাল শিক্ষার্থী ও এ গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক লুয়ানে ল্যান্ডাউ বলেছেন, “একটি ধারণা বা হাইপোথিসিস হচ্ছে, যাদের দেহে এ জিনের সংখ্যা বেশি ছিল তারা আলুসহ অন্যান্য স্টার্চওয়ালা খাবার হজম করতে বেশি সক্ষম ছিলেন।
“যাদের দেহে এ জিনের সংখ্যা বেশি ছিল তারা অন্যদের তুলনায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন এবং বংশপরম্পরায় তারা বেশি উত্তরসূরি রেখে গেছেন। আর এভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেন বর্তমান আন্দিজ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে উচ্চ সংখ্যার এ জিনটি এত সাধারণ হয়ে উঠেছে তার ব্যাখ্যা মেলে।”
আলু ছিল তাদের জন্য নির্ভরযোগ্য এক খাবারের উৎস, যা ওই অঞ্চলের মানুষের বসবাসের উচ্চভূমিতেও ভালোভাবে জন্মাত।
আলু ছিল ইনকা সাম্রাজ্যের খাবার সরবরাহের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ১৬শ শতাব্দীতে স্পেনীয়দের ইনকা সাম্রাজ্য জয়ের পর আলু ইউরোপসহ বিশ্বের বাকি অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষক বিহাম বলেছেন, “বিশ্বজুড়ে রান্নায় আলুর এ বিস্তার প্রমাণ করেছে, আলু সবার কাছে কতটা জনপ্রিয়।”
আন্দিজের উচ্চভূমি ও পেরুর অন্যান্য বাজারের হাটগুলোতে কেচুয়া ভাষাভাষী মানুষ অনেক বৈচিত্র্যের আলু বিক্রি করেন। এসব আলুর ভেতরের অংশ বেগুনি, নীল, লাল, সোনালী, সাদা ও কালো রঙেরও হয়ে থাকে।