স্পেনের আধিপত্য: ৫ বছরে ১৬ শিরোপা
ছেলে-মেয়ে, সিনিয়র-জুনিয়র, সব দলের হাত ধরেই একের পর এক ট্রফি যোগ হচ্ছে স্পেনের অর্জনের শোকেসে।
বার্লিন কিংবা নিউ ইয়র্ক, ছেলে কিংবা মেয়েদের বিভাগ, সিনিয়র বা জুনিয়র-লড়াইয়ের মঞ্চ যেখানেই হোক না কেন, শিরোপা স্পেনের! সত্যিই তাই। গত পাঁচ বছরে ছেলে-মেয়ে উভয় বিভাগ মিলিয়ে যে তারা জিতেছে ১৬টি শিরোপা!
পুরুষ ফুটবলে দুই বছর আগে বার্লিনের ফাইনালে তারা জিতেছিল ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রোববার আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল হয়ে উঠল বিশ্ব বিজয়ী।
২০১০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের অনির্বচনীয় স্বাদ পাওয়ার দুই বছর আগে স্পেন জিতেছিল ইউরোর শিরোপা। এবারও সেই একই গল্পের দ্বিতীয় পর্ব লিখল ‘লা রোজা’রা।
স্পেনের এই সবশেষ সাফল্য দেখাচ্ছে, পুরুষ ও নারী ফুটবলে তাদের ঈর্ষণীয় আধিপত্য। প্রথম দেশ হিসেবে তারা একই সাথে ছেলে ও মেয়েদের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন। ২০২৩ সালে সিডনির ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে মেয়েরা জিতেছিল বিশ্বকাপ।
দেশটির সাফল্যের গল্পের শেষ নয় এখানেই। ছেলেদের হাত ধরে ২০২৩ সালের নেশন্স লিগের শিরোপা, ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকসের ফুটবল ইভেন্টের সোনার পদক এসেছে। নেশন্স লিগের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ট্রফি মেয়েরা তুলেছেন অর্জনের শোকেসে।
অনূর্ধ্ব-১৭ বয়সভিত্তিক থেকে শুরু করে ছেলে-মেয়ে সিনিয়র দল পর্যন্ত, গত পাঁচ বছরে স্পেন পেয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৬টি বৈশ্বিক ও ইউরোপিয়ান ট্রফি। বিবিসি স্পোর্টে স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিয়েম বালাগুই তুলে ধরলেন স্বদেশের অধিপত্যের দিকটি।
“এটা অধিপত্যের এক অধ্যায়। নিখুঁত একটা ঝড়ের মতো। সাংস্কৃতিকভাবে, আমরা নির্দিষ্ট একটা উপায়ে কাজগুলো করি। সবাই সেটার ওপর আস্থা রাখি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আমরা কখনও থামি না।
“এটা আরেকটা এভারেস্টে পা রাখা। কেননা, ছেলেরা ইউরো জয়ের দুই বছর পর ২০১০ বিশ্বকাপ জিতেছিল। এখন, আবারও আমরা সেটা করে দেখালাম।”
গত পাঁচ বছরে জেতা ১৬টি শিরোপা
২০২২ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত মেয়েদের হাত ধরে সব মিলিয়ে ১১টি ট্রফি জিতেছে স্পেন। সিনিয়র দল জিতেছে তিনটি; একটি বিশ্বকাপ ও দুটি নেশন্স লিগ। অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ (২০২২), অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ (২০২২) ও অনূর্ধ্ব-১৭ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪) ছাড়া অনূর্ধ্ব-১৯ দল এনে দিয়েছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের পাঁচটি শিরোপা (২০২২ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত, টানা পাঁচ আসর)।
ছেলেদের হাত ধরে এই সময়কারে স্পেনের ট্রফিকেসে যোগ হয়েছে পাঁচটি ট্রফি। সিনিয়র দল এনে দিয়েছে একটি করে বিশ্বকাপ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও নেশন্স লিগ। অনূর্ধ্ব-২৩ দল জিতেছে অলিম্পিকসের ফুটবল ইভেন্টের সোনার পদক (২০২৪) ও অনূর্ধ্ব-১৯ দল এনে দিয়েছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি (২০২৬)।
ঝুঁকিপূর্ণ ছিল দে লা ফুয়েন্তের নিয়োগ
২০২২ সালের ডিসেম্বর স্পেন কোচ হিসেবে দে লা ফুয়েন্তের নিয়োগের পর খুব কম মানুষই আশাবাদী ছিলেন তাকে নিয়ে। খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেছিল যে, এত অল্প সময়ের মধ্যে তার হাত ধরে নেশন্স লিগ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ শিরোপা আসবে।
দে লা ফুয়েন্তের নিয়োগের সময়টাও ছিল প্রতিকূল। কাতার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় মরক্কোর বিপক্ষে হেরে বিদায় নেয় স্পেন, লুইস এনরিকে দায়িত্ব ছাড়েন। এমন দুঃসময়ে স্পেনের হাল ধরলেন দে লা ফুয়েন্তে। বালাগুই তুলে ধরলেন ওই সময়ে স্পেন ফুটবল ফেডারেশনের পরিকল্পনার প্রেক্ষাপট।
“তারা দে লা ফুয়েন্তেকে বেছে নেয়, কারণ তিনি (স্পেনের) খেলার ধরন ও পদ্ধতিটা বুঝতেন। এটা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল-আমি মনে করি না, তখন কেউ ভেবেছিলেন তিনি এতটা সফল হবেন।”
কোচকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তার মূল কারণ ছিল, বড় কোনো ক্লাব পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল না তার। ১৯৯৪ সালে খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টেনে দেওয়ার পর এবং স্পেনের যুব দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত, তিনি ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন ক্লাবে, বিশেষ করে স্পেনের লিগের নিচের স্তুরে, বয়সভিত্তিক দলে, সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করেছিলেন।
স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার হুয়ান মাতা অবশ্য বিবিসি স্পোর্টে তুলে ধরেছেন, দে লা ফুয়েন্তের স্পেন কোচ হিসেবে কাজের সুবিধার দিকটি।
“এই খেলোয়াড়দের অধিকাংশকে দে লা ফুয়েন্তে চিনতেন একাডেমি থেকে এবং তারাই একটা দল হয়ে বেড়ে উঠেছে। এই দলটা শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতেরও।”
মুঠোভরে সাফল্য পাওয়া স্পেন এ মুহূর্তে ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত। ইউরোপিয়ান বা দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর ইতিহাসে যা রেকর্ড। তাদের এই দাপট যে সামনের দিকেও অব্যহত থাকবে, তা যেন দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছেন ফ্রান্সের হয়ে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয়ী থিয়েরি অঁরি।
“এই পরিকল্পনা এবং তারা যেভাবে সেটা প্রয়োগ করেছে, সেজন্য তাদের কৃতিত্ব দিতে চাই। কেননা, স্পেন আগে কখনই এভাবে জেতেনি এবং এখন তারা সব পর্যায়েই জিতে চলেছে।”
