Published : 11 Jul 2026, 09:18 PM
‘ওখান থেকে যদি বেঁচে ফিরতে পারি, তাহলে যেকোনো কিছুই সামলাতে পারব’, উক্তিটি নরওয়ের কোচ স্তলে সুরবাকেনের। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে কথাটি বললেও, এটা মূলত তার পুরো জীবনকে এক বাক্যে ফুটিয়ে তোলে। ২৫ বছর আগে মৃত্যুর দুয়ার থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে এসেছিলেন তিনি। আর এখন তার কাঁধে ভর করেই বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস নতুন করে লিখছে নরওয়ে।
২০২১ সালের ১৩ মার্চ, সুরবাকেনের জন্য ছিল ভয়াবহ একটি দিন। তখন কোপেনহেগেনের খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। সেদিন ডেনমার্কের ক্লাবটির হয়ে অনুশীলনের সময় হুট করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তার হৃৎস্পন্দন বন্ধ ছিল সাত মিনিট! ওই সময় তাকে ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’ ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর তার হৃৎস্পন্দন ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর ২৬ ঘণ্টা কোমায় ছিলেন তিনি।
ছেলের কাছে পাগলের মতো ছুটে আসার সময় অনেক কিছু ভাবছিলেন সুরবাকেনের মা। প্রকৃত অবস্থা না জেনেই ছেলের শেষকৃত্য কীভাবে করবেন, সেটাও নাকি ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলেন তিনি।
ভয়ঙ্কর সেই অভিজ্ঞতার কথা পরে ড্রিভক্রেফট পডকাস্টে বলেন সুরবাকেন, “আমার মনে আছে, একটি নীল আলো দেখেছিলাম এবং তারপর একটি সুড়ঙ্গের মতো কিছু একটা দেখতে পাই। মনে আছে, ওই সময় আমি ভাবছিলাম, আরও কিছুটা সময় বেঁচে থাকতে চাই।”
ওই ঘটনায় পুরোপুরি বদলে যায় সুরবাকেনের জীবন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চিকিৎসকরা তার হার্টে একটি জন্মগত ত্রুটি খুঁজে পান এবং তাকে ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে তার বুকে পেসমেকার বসানো হয়।
মাত্র ৩৩ বছর বয়সে খেলোয়ড়ি জীবনকে বিদায় বলে দেন সুরবাকেন। এর পরপরই শুরু করেন কোচিং ক্যারিয়ার। মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসার ঠিক এক বছর পর তিনি ডাগআউটে দাঁড়ান কোচের ভূমিকায়।
২৬ বছরের কোচিং ক্যারিয়ারে ডেনিস, ইংলিশ ও জার্মান লিগে কাজ করেন সুরবাকেন। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে নরওয়ে দলের দায়িত্ব নেন তিনি। ঠিক তখনই আর্লিং হলান্ড ও মার্টিন ওদেগোরদের নিয়ে দেশটির নতুন প্রজন্ম উঠে আসছিল।
কিন্তু নরওয়ের কোচ হিসেবে শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না সুরবাকেনের। তার কোচিংয়ে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ও দুই বছর পরের ইউরোতে জায়গা করে নিতে পারেনি নরওয়ে। এমনকি হলান্ডের মতো তারকাকে বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলাতে না পারার জন্যও তাকে দায়ী করা হচ্ছিল তখন। চাকরি হারানোর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি।
২০২৪ সালের ইউরোতে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়ার পর সুরবাকেন বলেছিলেন, “আমি আর একবার চেষ্টা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সম্ভবত সেটাই হবে আমার শেষ চেষ্টা।”
এরপরই শুরু হয় সুরবাকেনের হাত ধরে নরওয়ের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ইতালিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পায় নরওয়ে। গ্রুপে দুই লেগেই চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হারায় তারা, ৩-০ ও ৪-১ ব্যবধানে। ১৯৯৮ সালের বিশ্ব আসরে ইতালির বিপক্ষে হেরে হৃদয় ভেঙেছিল নরওয়ের।
২৮ বছর আগের ওই বিশ্বকাপে খেলেছিলেন সুরবাকেনও। সেবার শেষ গ্রুপ ম্যাচে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছিল নরওয়ের। পরে ইতালির বিপক্ষে ১-০ গোলে হেরে আসর থেকে বিদায় নেয় তারা। ওই দুই ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নেমেছিলেন মাঠে সুরবাকেন। এবার কোচ হিসেবে বাছাই পর্বে ইতালিকে হারিয়ে সেই হতাশার প্রতিশোধ নিলেন তিনিও। যেন পূর্ণতা পেল তার দীর্ঘ ফুটবল-যাত্রার এক বিশেষ অধ্যায়।
এবারের বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে আট ম্যাচের সবগুলো জিতে, গ্রুপ সেরা হয়ে মূল আসরে খেলছে নরওয়ে। ২৮ বছর পর সুরবাকেনের হাত ধরে বিশ্ব মঞ্চে ফিরেই কেবল অংশগ্রহণেই সন্তুষ্ট থাকেনি দলটি, উপহার দিয়ে চলেছে একের পর এক স্মরণীয় পারফরম্যান্স।
গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচে ইরাক ও সেনেগালকে হারিয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় নরওয়ে। পরে শেষ বত্রিশে তারা হারায় আইভরি কোস্টকে। সবচেয়ে বড় চমক দেখায় দলটি শেষ ষোলোয়, যেখানে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিদায় করে টুর্নামেন্ট থেকে।
নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম কোয়ার্টার-ফাইনালে উঠেছে নরওয়ে। দলটির এই রূপকথার মতো পথচলার মূল কারিগর সুরবাকেন। যার দিক নির্দেশনা, কৌশলে এত দূর যেতে পেরেছে ইউরোপের দেশটি।
যদিও সুরবাকেন কৃতিত্ব দিচ্ছেন দলের খেলোয়াড়দের। দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের শেয়ার করা একটি ভিডিওতে হলান্ড, ওদেগোরদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে তিনি বলেন, “এই ছেলেরা শুধু নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসই বদলায়নি, তারা পুরো দেশের ইতিহাস বদলে দিয়েছে।”
এখন আরও বড় স্বপ্নের পথে ছুটছে নরওয়ের। ইতিহাসের আরেকটি পাতায় নাম লেখানোর দুয়ারে দাঁড়িয়ে তারা। প্রথমবার বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ১২ জুলাই বাংলাদেশ সময় ৩টায় (এএম) ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে নরওয়ে।
নরওয়ের এই স্বপ্নের পথচলায় টাচলাইনে দাঁড়িয়ে সুদক্ষ নাবিকের মতো পথ দেখাচ্ছেন সুরবাকেন, যিনি একদিন মৃত্যুকেও পরাজিত করেছিলেন।