Published : 30 Jun 2026, 12:18 PM
গোল করার পর সাধারণত বাঁধনহারা উল্লাসেই মেতে উঠতে দেখা যায় ফুটবলারদের। কিন্তু কোডি গাকপো মাঠেই মাথা নুইয়ে পড়েছিলেন। সময়টা যে উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়ার নয়! এক বুক বেদনা নিয়ে ম্যাচটি খেলতে নেমেছিলেন তিনি। গোলের পরও ছিল সেই আবেগের প্রকাশ। তবে ম্যাচের চিত্রনাট্যে শেষের নায়ক এ দিন ইসা জিওপ। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম গোলটি যেমন তিনি কখনও ভুলবেন না, ভুলবে না মরক্কোও।
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সকালের ম্যাচটি এই দুজনের গোলে ১-১ সমতায় শেষ হয় নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়। ঘটনাবহুল টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে জিতে শেষ ষোলোয় পৌঁছে যায় মরক্কো।
তবে গতবার সেমি-ফাইনালে খেলা দলটিকে বিদায়ের কিনারায় পৌঁছে দিয়েছিলেন গাকপো। ম্যাচের ৭২তম মিনিটে তার গোলে এগিয়ে নেদারল্যান্ডস।
যদিও এই ম্যাচে তার মাঠে নামাটাই ছিল এক বিস্ময়। গর্ভাবস্থার শেষ সপ্তাহে ছিলেন তার সঙ্গিনী নোয়া ফন দের বে। অনাগত ছেলের নামও ঠিক করে রেখেছিলেন তারা, এলিয়া রাফায়েল গাকপো। কিন্তু স্বপ্নের দিনটি আসার আগেই দুঃস্বপ্নের হানা। সেই সন্তান আর পৃথিবীর আলো দেখতে পারেনি।
৪৮ ঘণ্টাও হয়নি সেই দুর্ঘটনার। ম্যাচের আগে কৌতূহল ছিল, গাকপো আদৌ খেলবেন কি না। সংবাদ সম্মেলনে কোচ রোনাল্ড কুমান জানান, “একবারের জন্যও দল ছেড়ে যাওয়ার কথা উচ্চারণ করেনি কোডি।” অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক বলেন, “দলকে জেতাতে যেকোনো কিছুই করতে প্রস্তুত কোডি...।”
লিভারপুলের ফরোয়ার্ড তা করেছিলেন বটে। শোককে শক্তিতে রূপ দিয়ে দলকে শেষ ষোলোর দুয়ারে নিয়ে গিয়েছিলেন।

গোল করেই হাঁটু গেড়ে মাথা মাটিতে নুইয়ে রাখেন গাকপো। মাঠে থাকা সতীর্থরা তো বটেই, ডাগআউট থেকেও সবাই ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েন তার ওপর। সেই মুহূর্তটি যেন শেষই হচ্ছিল না!
একটু পর রেফারি বাঁশি বাজিয়ে তাড়া দেন। সবাই সরে গেলে উঠে দাঁড়ান গাকপো। তার চোখে তখন টলমল করছে জল। জার্সিতে মুখ ঢেকে চেষ্টা করলেন তা আড়াল করতে। ধারাভাষ্যকার তখন বলছিলেন, “কিছু গোল স্রেফ গোলের চেয়েও বেশি কিছু…।”
ফুটবল, আবেগ, দেশ আর জীবন, সব তখন মিলেমিশে একাকার।
গাকপোর এমন আবেগময় গোলে নেদারল্যান্ডস জিতলে কী দারুণ এক গল্পই না হতো!
তবে এ দিনই নিজের গল্প গোটা দুনিয়াকে শোনাতে চাইলেন জিওপ। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম গোলটির জন্য বেছে নিলেন তিনি এই ম্যাচকেই। অথচ বিশ্বকাপ শুরুর তিন মাস আগেও তিনি মরক্কোর ছিলেন না!
তার মা মরক্কোর বারবার আদিবাসী জাতীগোষ্ঠীর, বাবা সেনেগালিজ হলেও মূলত পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাম্বিয়া অঞ্চলের আদিবাসী নাইজার-কঙ্গো জাতিগোষ্ঠীর। তবে জিওপের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফ্রান্সের তুলুজে। তুলুজ ফুটবল ক্লাবের একাডেমিতে বেড়ে উঠে সেই ক্লাবের হয়েই পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু ২০১৫ সালে। ২০১৮ সালে পাড়ি জমান ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডে। ২০২২ সাল থেকে খেলছেন ফুলহ্যামে।
তখনও তিনি ফরাসিই ছিলেন। ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৮, অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২০, অনূর্ধ্ব-২১, সব দলেই খেলেছেন।

জাতীয় দলের ক্ষেত্রে বাবা দেশ, মায়ের দেশকে বেছে নেওয়ার সুযোগ তার ছিল। তিনি ২০১৮ সালে সিদ্ধান্ত নেন জন্মভূমি ফ্রান্সের হয়ে খেলার। কিন্তু সেই দুয়ার আর খোলেনি। অপেক্ষা কেটে যায় বছরের পর বছর। অবশেষে সিদ্ধান্ত বদল করে তিনি বেছে নেন মায়ের দেশকে। মরক্কোর হয়ে খেলার অনুমতি পান গত ২৬ মার্চ।
বিশ্বকাপের আগে স্রেফ দুটি ম্যাচ খেলেছেন তিনি এই দলের হয়ে। বিশ্বকাপের নকআউটে ডুবতে থাকা দলের আশা জিইয়ে রাখলেন তিনি ৯১তম মিনিটে গোল করে।
এরপর টাইব্রেকারের নাটক হয়েছে। সেখানে ভুলের মহড়া হয়েছে। ৩-২ গোলের রুদ্ধশ্বাস জয় পেয়েছে মরক্কো। বিদায় নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। তার পরও ম্যাচের দুই মূল চরিত্র জিওপ ও গাকপো।
শেষ পর্যন্ত জিওপ জিতেছেন। তবে গাকপোও হারেননি। জিতে গেছেন তো তিনি মাঠে নেমেই!