Published : 30 Jun 2026, 03:13 PM
কয়েক সপ্তাহ ধরেই কথাটি বলে আসছিলেন কার্লো আনচেলত্তি। সবার প্রতি তা ছিল বার্তা, নিজ দলের প্রতি সতর্কবার্তা। ব্রাজিল কোচ বারবারই বলছিলেন, এমন দীর্ঘ ও জটিল একটি বিশ্বকাপের ভাগ্য নির্ধারিত হবে দলগুলির মানসিক দৃঢ়তা, হার না মানা মনোভাব ও ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতায়। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচে সেটিরই একটি প্রামাণ্য চিত্র মেলে ধরল যেন তার দল।
হিউস্টনে এই ম্যাচে ব্রাজিরের পারফরম্যান্স দেখে মনে এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল, কোচের তত্ত্বকে চূড়ান্তভাবে পরীক্ষা করতে যেন বদ্ধপরিকর গোটা দল!
স্কোরলাইনে আসলে ম্যাচের পুরো চিত্র ফুটে উঠছে না। স্রেফ ২-১ গোলের সাধারণ জয় তো এটি নয়! বরং বলা যেতে পারে, আনচেলত্তির চিরায়ত চিত্রনাট্য, যেখানে নিয়ন্ত্রণ যেমন ছিল, টালমাটাল অবস্থা ছিল। আত্মঘাতী বিপদ ছিল এবং তারপর, অতিরিক্ত সময়ে যখন যাবতীয় যুক্তিগুলো মিলিয়ে যাওয়ার পালা, তখন শেষ মুহূর্তে এমন এক চমকপ্রদ আখ্যান রচিত হলো, যেখানে কৌশল যেমন ছিল, তেমনি ছিল হৃদয়েরও সংযোগ।
আনচেলত্তির সাফল্যের চেনা রেসিপিই এটি।
রেয়াল মাদ্রিদে কোচ থাকার দিনগুলো থেকে এমন দীর্ঘ ও জটিল টুর্নামেন্টের ভেতর-বাহির জানেন আনচেলত্তি। তার কোচিংয়ের সেরা সময়টাতেও রেয়াল সবসময় অপ্রতিরোধ্য ও দুর্দমনীয় ছিল না, অপরাজেয় কিংবা নিখুঁত ছিল না। তবে এসবের চেয়েও বিপজ্জনক কিছু একটা ছিল, সেটি হলো দৃঢ় বিশ্বাস ও হাল না ছাড়ার প্রতিজ্ঞা। শেষের আগে কিছুই শেষ নয়, এই প্রবল বিশ্বাস।
জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিলের পারফরম্যান্সেও সে সাদৃশ্যগুলো উপেক্ষা পরিষ্কার ফুটে উঠেছে।
২০২২ সালে রেয়াল মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার পথে পিএসচি, চেলসি এবং ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে একের পর এক ম্যাচে যেভাবে পেছন থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, অকল্পনাীয় সব পরিস্থিতি থেকে এমনভাবে তারা নিজেদের উদ্ধার করেছিল, বারবার বিদায়ের দুয়ার থেকে সাফল্য আদায় করেছিল, তা হঠাৎ করেই হয়নি।
খুব গোছানো ও পরিপাটি কিছু অবশ্যই নয়। বরং বেশ এলোমেলোই ছিল কখনও কখনও। কিন্তু এটি ছিল নির্মমভাবে কার্যকর, যে দর্শনের চালিকাশক্তি ছিল এরকম প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টের স্নায়ুচাপ, অস্থিরতার মরধ্যও স্বচ্ছতা এবং লোকে খালি চোখে যা দেখছে, সেই সম্ভাব্য পরিণতি মেনে না নেওয়া। শেষ পর্যন্ত লড়াই করা, এমনকি যখন এসবের কোনো মানে নেই, তখনও।
একটা সময় বিশ্বকাপের ব্রাজিলকে ঘিরে এরকম আবহ ও আভা ছিল। প্রতি চার বছর পর পর টুর্নামেন্টটি যেন তাদের সম্পত্তি, তাদের মঞ্চ, তাদের স্বাভাবিক বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে উঠত। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রেয়াল মাদ্রিদের মতো, তারা শুধু এতে খেলত না, বরং এটিকে জয় করে নিত। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলার মধ্যে সবসময় এই অনুভূতি কাজ করত যে, টিকে থাকতে হলে তাদেরকে হারাতেই হবে।
জাপানের বিপক্ষে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা আনচেলত্তির ধরনের উভয় দিকই ফুটিয়ে তুলেছিল।

শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করেছিল ব্রাজিল এবং তারাই ছিল তুলনামূলকভাবে ভালো দল। কিন্তু কিছু ভুলের কারণে তারা নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল এবং গোল হজম করে পিছিয়ে পড়েছিল, যে ভুলগুলো খুবই অনুমেয়, পরিচিত এবং কখনও কখনও বিপজ্জনক। রেয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার সিটি এবং জুভেন্টাসের হয়ে ফুল-ব্যাক হিসেবে খেলে এখন সেন্টার-ব্যাক হিসেবে খেলছেন যিনি, সপ্তাহ দুয়েক পরই ৩৫ বছর পূর্ণ করতে যাওয়া দানিলো পেছন থেকে খেলা গড়ে তোলার চেষ্টায় সাধারণ একটি পাস ভুল জায়গায় দিয়ে বসেন।
আনচেলত্তির আরেক বিশ্বস্ত পুরোনো সৈনিক কাসেমিরোর ঘাটতির জায়গাটিও ফুটে ওঠে এখানে। ৩৪ বছর বয়সী মিডফিল্ডার গতির লড়াইয়ে পেরে ওঠেনি জাপানিদের সঙ্গে। যেটি মনে করিয়ে দেয়, অভিজ্ঞতা অকে সময় কর্তৃত্ব এনে দিতে পারে, তবে গতিময়তা নয়।
ওই সময়টায় মনে হচ্ছিল, ব্রাজিল বুঝি তাদের অতীত ও বর্তমানের মাঝে আটকা পড়েছে। তখনও আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু হয়নি অবশ্যই, তবে অস্বস্তিতে পড়ার যথেষ্ট উপকরণ ছিল।
এটা আদর্শ কিছু নয় কখনোই। তবে এখানেই আনচেলত্তির দলগুলো সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এই ইতালিয়ান কোচ কখনোই নিষ্ফল আধিপত্য বিস্তারের প্রতি আচ্ছন্ন ছিলেন না। তার কোচিংয়ে দলগুলি সেরা সময়েও প্রায়শই এক ধরনের দোলাচলে থাকে, যেখানে খেলাটি হয়ে ওঠে আবেগময়, কিছুটা এলোমেলো এবং আদিম।
এবং প্রায় শেষ মুহূর্তে, জাপান যখন উদ্বেগের নিয়ে অতিরিক্ত সময়ের দিকে তাকাচ্ছিল, ব্রাজিল তাদের নিজেদের পথ খুঁজে পেল। আনচেলত্তির দল যা করে থাকে।
তরুণ হায়ান অবিরাম চাপ সৃষ্টি করে বল কেড়ে নিলেন এবং আনচেলত্তির দলের প্রাণস্পন্দন ব্রুনো গিমেরেসকে বল দিলেন।
গিমেরেস খুঁজে নিলেন জাপানি ডিফেন্ডারদের জটলার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসা বদলি খেলোয়াড় গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে এবং তিনি এমন দারুণভাবে কাজ শেষ করলে, একটি দলকে যা চূর্ণ করে দেয় নিষ্ঠুরভাবে এবং অন্য দলকে বুঝিয়ে দেয় যে, তারাই এখানে সেরা।
জাপানের জন্য এটা ছিল ভেঙে পড়ার মতো। ব্রাজিলের জন্য এটা ছিল প্রায় ঘুরে দাঁড়ানোর মতো।
এটা অবশ্যই ব্রাজিলের সেরা রূপ নয়, সবচেয়ে পরিপূর্ণও নয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, নিখুঁত খেলে বিশ্বকাপ জেতা যায় কম সময়ই। আনচেলত্তি যেমনটা মনে করিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বকাপ জেতে সেই দলগুলো, যারা তাদের খারাপ সময়গুলো কাটিয়ে ওঠে, নিজেদের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেয় এবং শেষ বেলায়ও বিশ্বাস রাখে যে, আরও একটি মুহূর্ত বাকি আছে।
আনচেলত্তি এই ছবি আগেও দেখিয়েছেন। এখন ব্রাজিল সেই ছবিকেই আপন করে নিতে চাইছে।