Published : 20 Jun 2026, 12:31 PM
ব্রাজিল-হাইতি ম্যাচের পর থেকেই প্রশ্নটি উঠতে শুরু করেছে। এবারের বিশ্বকাপের প্রথম দল হিসেবে যখন বাদ পড়ে গেল হাইতি, অনেকেরই মনে তখন বিস্ময়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছিল আলোচনা, সেরা তৃতীয় দলগুলির একটি হয়ে তো পরের ধাপে যেতে পারে হাইতি!
আদতে তা নয়। আনুষ্ঠানিকভাবেই শেষ হয়ে গেছে হাইতির সম্ভাবনা। যারা প্রশ্ন তুলছেন, তারা হয়তো নিয়ম পরিবর্তনের ব্যাপারটি জানেন না। আগের নিয়ম থাকলে হাইতির গাণিতিক সম্ভাবনা এখনও জিইয়ে থাকত। কিন্তু এবার বদলে গেছে নিয়ম।
এবারের বিশ্বকাপের জন্য লিগ টেবিল নির্ধারণের পদ্ধতিতে এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনটি এসেছে ফিফা এবং গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলোতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে এটি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথমবার, সমান পয়েন্টে থাকা দলগুলোর মধ্যে ‘টাইব্রেকার হিসেবে’ আগে বিবেচনা করা হবে ‘হেড টু হেড’ পারফরম্যান্স।
১৯৬৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দলগুলোকে আলাদা করার জন্য গোল অনুপাত ব্যবহার করা হতো। তখন কোনো দলের গোল করার সংখ্যাকে গোল হজমের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হতো। ১৯৭০ বিশ্বকাপ থেকে ফিফা গোল পার্থক্য ব্যবহার শুরু করে, যা এবারের আগ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।
এই নিয়মের পরিবর্তনে ফিফা এখন উয়েফাকে অনুসরণ করল। উয়েফা সবসময় দলগুলোর মধ্যকার ফলাফলকেই অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।
‘হেড টু হেড’ আগে বিবেচনার ক্ষেত্রে বড় যুক্তি হলো, দুটি দলের নিজেদের মধ্যে সরাসরি পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা বেশি ন্যায্য। কারণ, এতে একতরফা ম্যাচগুলির ফলাফল হিসেবে বাইরে চলে যাচ্ছে। এবার যেমন কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ৭-১ গোলে জিতেছে জার্মানি।
গোল পার্থক্যকে আগে বিবেচনা করার পক্ষে যারা, তাদের যুক্তি হলো, সামগ্রিকভাবে গোল পার্থক্য বিবেচনা করা ভালো, কারণ এটি গ্রুপের সব দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সকে তুলে ধরে।
গত ক্লাব বিশ্বকাপে ফিফা প্রথম এটি চালু করেছিল, যেখানে চেলসিকে পেছনে ফেলে গ্রুপ ডি-তে শীর্ষস্থানে ছিল ফ্ল্যামেঙ্গো।
এই বিশ্বকাপে এটি কীভাবে চিত্র বদলে দিচ্ছে, তা এখানে তুলে ধরা হলো।
মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে জানে, তারাই গ্রুপের সেরা
নতুন নিয়মের ফলে দলগুলোর পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়া প্রভাবিত হবে তো বটেই, পাশাপাশি গ্রুপের শেষ ম্যাচের আগেই গ্রুপ জেতার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে।
পুরোনো ফরম্যাট অনুযায়ী, দুটি ম্যাচ শেষে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করতে হলে একটি দলকে দ্বিতীয় স্থানাধিকারীর চেয়ে চার পয়েন্টে এগিয়ে থাকতে হতো। খুব কম সময়ই তা বাস্তবে হতো। কারণ এর জন্য গ্রুপের প্রথম দুই রাউন্ডের বাকি দুটি ম্যাচই ড্র হওয়া প্রয়োজন ছিল। এখন তিন পয়েন্টে এগিয়ে থেকেও প্রথম স্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।
এটা কয়েকটি উপায়ে ঘটতে পারে।
এটির জন্য হয় দুটি ম্যাচ ড্র করতে হবে, অথবা প্রথম স্থানে থাকা দলকে তিন পয়েন্টে থাকা দল(গুলো)কে হারাতে হবে।
‘এ’ ও ‘ডি’ গ্রুপে এর মধ্যেই এই উদাহরণ দেখা যাচ্ছে।
মেক্সিকো প্রথম দুটি ম্যাচ জিতেছে এবং ছয় পয়েন্টে রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে তিন পয়েন্টে এগিয়ে তারা, যেখানে চেকিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার পয়েন্ট এক।
যেহেতু মেক্সিকো এর মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়েছে, তাই উভয় দেশ ছয় পয়েন্টে শেষ করলেও মেক্সিকোকে আর ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং মেক্সিকো গ্রুপের শীর্ষে থাকা নিশ্চিত করেই ফেলেছে।
তারা জানে যে, শেষ ৩২-এর ম্যাচে তারা মেক্সিকো সিটিতে তৃতীয় স্থানে থাকা কোনো একটি দলের মুখোমুখি হবে।
এর একটি অন্য প্রভাবও রয়েছে।
আগামী বুধবার চেকিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সময় মেক্সিকোর কার্যত হারানোর কিছু থাকবে না। কাজেই তারা কয়েকজন ফুটবলারকে বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে বা নতুন কিছু পরখ করে দেখতে পারে।
সেক্ষেত্রে ব্যাপারটি এমন একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে, যা থেকে চেক প্রজাতন্ত্র লাভবান হতে পারে। যদিও তারা কেবল তখনই সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে, যদি দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে দক্ষিণ কোরিয়া হেরে যায়।
কিন্তু এমন একটি টুর্নামেন্টে যেখানে সেরা তৃতীয় স্থানে থাকা দলগুলো পরবর্তী পর্বে যায়, সেখানে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে অনেক ক্ষেত্রেই। কোনো দল আগেই শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে ফেললে শেষ ম্যাচকে যথেষ্ট গুরুত্ব নাও দিতে পারে, যা প্রতিপক্ষ দলকে বাড়তি ফায়দা দেবে।
যদিও এই পদ্ধতিটি ইউরোতেও ব্যবহৃত হয়, যেখানে সেরা তৃতীয় স্থানের দলগুলো পরবর্তী পর্বে যায়।
বাংলাদেশ সময় শনিবার সকালের ম্যাচে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে যাওয়ায় তুরস্কের বিদায়ও নিশ্চিত হয়ে গেছে এবং এই গ্রুপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ স্থানে থাকাও এখন নিশ্চিত।
অন্য যেসব দল দুই ম্যাচেই নিশ্চিত করতে পারে শীর্ষস্থান:
গ্রুপ ‘বি’ ও ‘সি’
এই দুই গ্রুপে কোনো দলই দুই ম্যাচে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করতে পারবে না। শেষ দিনে নির্ধারিত হবে গ্রুপের ভাগ্য।
গ্রুপ ‘ই’
একুয়েডর যদি কুরাসাওয়ের বিপক্ষে জিততে না পারে, তবে কোত দি ভোয়াকে হারাতে পারলেই জার্মানি গ্রুপে সেরা হওয়া নিশ্চিত করবে।
কুরাসাও যদি একুয়েডরকে হারাতে না পারে, তবে কোতা দি ভোয়া জিতলেই শীর্ষস্থান নিশ্চিত করবে।
গ্রুপ ‘ডি’
সুইডেন গ্রুপ বিজয়ী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে, যদি তারা নেদারল্যান্ডসকে হারায় এবং তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জাপান জিততে না পারে।
গ্রুপ জি’, ‘এইচ’ ও ‘আই’
এই গ্রুপগুলোয় কোনো দলই দুই ম্যাচে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করতে পারবে না। শেষ দিনে নির্ধারিত হবে গ্রুপের ভাগ্য।
গ্রুপ ‘জে’
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জিতলেই আর্জেন্টিনা শীর্ষস্থানে অটুট থাকবে, যদি আলজেরিয়াকে হারাতে না পারে জর্ডান।
জর্ডানের বিপক্ষে আলজেরিয়া জিততে না পারলে, অস্ট্রিয়াও আর একটি জয়ের মাধ্যমে গ্রুপের সেরা হতে পারে।
গ্রুপ ‘কে’
ডিআর কঙ্গোকে হারিয়ে কলম্বিয়া গ্রুপ জিতে নিতে পারে, যদি অন্য ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে পর্তুগাল জিততে না পারে।
গ্রুপ ‘এল’
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পানামা জিততে না পারলে, ঘানার বিপক্ষে জয় পেলেই ইংল্যান্ড গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হবে।
পানামাকে যদি হারাতে না পারে ক্রোয়েশিয়া, তাহলে ঘানার তাদের ম্যাচ জিতেই গ্রুপের সেরা হতে পারে।
পয়েন্ট সমান থাকা দলগুলিকে আলাদা করার ক্রম:
১. দুই দলের পয়েন্ট সমান হলে মুখোমুখি লড়াইয়ের ফল দেখা হবে আগে। যদি তিনটি দল জড়িয়ে থাকে সমীকরণে, তখন চতুর্থ দলের বিপক্ষে ফলাফলগুলো বাদ দিয়ে একটি ‘মিনি-লিগ’ তৈরি করা হবে।
২. মুখোমুখি লড়াইয়ের গোল পার্থক্য
৩. মুখোমুখি লড়াইয়ে বেশি গোল করা
৪. গ্রুপের গোল পার্থক্য
৫. গ্রুপে মোট গোলের সংখ্যা
৬. ফেয়ার প্লে (হলুদ কার্ড -১, দুটি হলুদ কার্ড থেকে লাল কার্ড -৩, সরাসরি লাল কার্ড -৪, হলুদ কার্ডের পর সরাসরি লাল কার্ড -৫)
৭. ফিফা র্যাঙ্কিং
৮. ক্রমান্বয়ে পুরোনো ফিফা বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে উন্নততর অবস্থান