Published : 15 Jul 2026, 08:24 AM
লড়াইটা ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার। তারকার উপস্থিতি কোনো দলেই কম নেই। একদিকে বর্তমান সময়ের সেরাদের দুজন হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহ্যাম। অপরদিকে সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন লিওনেল মেসি। তবে এই দ্বৈরথ তো শুধু দল আর খেলোয়াড়দেরই নয়, ডাগআউটে টমাস টুখেল ও লিওনেল স্কালোনির লড়াইটিও হবে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমি-ফাইনালে বুধবার আটলান্টায় মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা, বিশ্বকাপে যে দুই দলের লড়াই সবসময়ই ছড়ায় বাড়তি উত্তেজনা।
কোয়ার্টার-ফাইনাল পর্যন্ত আসরের সর্বোচ্চ গোল আর্জেন্টিনার। ছয় ম্যাচে তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ীরা করেছে ১৭টি গোল। ইংল্যান্ডের গোল ১৩টি। তবে গোল হজম করার দিক থেকে দুই দলই আছে একই অবস্থানে, সমান ছয়টি করে।
তাই সামান্য ব্যবধান ও কৌশলগত পরিবর্তনই হয়তো নির্ধারণ করে দিতে পারে দুই দলের ম্যাচের ফল। কিন্তু জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে কোথায়?- এখানে যে পাঁচটি বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখতে পারে, দেখে নেওয়া যাক এক নজরে।
মেসিকে আটকানো
দুই দশক ধরে ফুটবলের সব তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ককে ধাঁধায় ফেলে রেখেছে একটি প্রশ্ন: মেসিকে কীভাবে থামানো যায়?
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কখনও না খেললেও, ইংলিশ ক্লাবগুলোর জন্য সবসময়ই আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন মেসি। আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো দলগুলোর বিপক্ষে আছে তার স্মরণীয় পারফরম্যান্স। ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে ৩৬ ম্যাচে ২৭টি গোল করার পাশাপাশি ৬টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি।
৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের কঠিন প্রতিরোধের মুখে পড়েন এবং চলতি বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ম্যাচে গোল করতে ব্যর্থ হন। এতে থেমে যায় বিশ্বকাপে টানা ৯ ম্যাচে তার গোল করার রেকর্ড যাত্রা।
কিন্তু ইন্টার মায়ামির এই ফরোয়ার্ডের গোলশূন্য পরিসংখ্যানও পুরো গল্পটা তুলে ধরছে না। কারণ, ম্যাচের প্রথম গোলটি আসে মেসির কর্নার থেকে, আলেক্সিস মাক আলিস্তেরের হেডে।
বল দখলে না থাকলে মেসিকে অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হয়। গতি ও সময়জ্ঞানের ওপর তার দারুণ নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রতিপক্ষ কখনোই পুরোপুরি প্রস্তুত থাকতে পারে না।
তবে রক্ষণভাগের ফাঁক কমানোর জন্য সুইজারল্যান্ডের সুশৃঙ্খল অবস্থানসহ লো ব্লক কৌশল বেশিরভাগ সময় দারুণভাবে কাজ করেছে, যা অনুসরণ করতে পারেন ইংল্যান্ড কোচ টুখেল।
মাঝমাঠের বিশৃঙ্খলা
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার গড়পড়তা পজিশনিংয়ের দিকে তাকালে একটি বিষয় চোখে পড়ে এবং তাদের খুব কম ব্যবহৃত ডায়মন্ড আকৃতির মিডফিল্ডের কথা বিবেচনা করলে এতে অবাক হওয়ারও কিছু নেই। সুইসদের বিপক্ষে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা মাঝমাঠ অনেকটা ঘিঞ্জি করে রেখেছিল, বিশেষ করে ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেস যখন নিচে নেমে আসছিলেন এবং লিসান্দ্রো মার্তিনেস রক্ষণভাগ থেকে বেরিয়ে আসছিলেন।
ফুল-ব্যাকে সংগ্রাম করা নাউয়েল মলিনাকে সমর্থন জোগাতে রদ্রিগো দে পলকে ডান দিকে আসতে দেখা যায়। এছাড়া মাঝমাঠ বিস্তৃত করার স্পষ্ট অভাব ছিল আর্জেন্টিনার।
টুখেলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে, ইংল্যান্ডের মাঝমাঠের ত্রয়ী জুড বেলিংহ্যাম, ডেক্লান রাইস ও এলিয়ট অ্যান্ডারসন মাঝমাঠে কোণঠাসা হয়ে পড়বেন কি না।
আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের জটলার মধ্য দিয়ে খেলা হয়তো সহজ হবে না। তাহলে কি টুখেল তার খেলোয়াড়দের আরও সরাসরি খেলার নির্দেশ দেবেন, অর্থাৎ মাঝমাঠের যুদ্ধক্ষেত্র এড়িয়ে তাদের পাশ কাটিয়ে বা বল ওপর দিয়ে খেলাবেন?
গর্ডন বনাম মলিনা
সুইসদের বিপক্ষে আতলেতিকো মাদ্রিদের রাইট-ব্যাক মলিনা খুব একটা ভালো করতে পারেননি। তার নড়বড়ে পারফরম্যান্সের প্রকটতা ফুটে ওঠে দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষের দান এনদোয়ের সমতা ফেরানো দুর্দান্ত গোলটিতে।
২৮ বছর বয়সী মলিনা মাঠে থাকা ৮৫ মিনিটে ৯ বার বলের দখল হারান এবং মাত্র একবার বল দখলের লড়াইয়ে জয়ী হন, যেখানে এনদোয়ে তার খেলা ৮৬ মিনিটে পাঁচটি ড্রিবল করেন এবং লক্ষ্যে শট রাখেন দুটি।
অন্যদিকে, বাম উইংয়ে টুখেলের প্রথম পছন্দের খেলোয়াড় অ্যান্থনি গর্ডন।
নরওয়ের বিপক্ষে তিনি আটটি ড্রিবল করেন, যা তার যেকোনো সতীর্থের চেয়ে দ্বিগুণ। ৭১ মিনিট খেলে তিনি সাতবার বল দখলের লড়াইয়ে জয়ী হন। বেলিংহ্যামের সমতা ফেরানো গোলে নিখুঁত এক অ্যাসিস্ট করেন তিনিই।
আর্জেন্টিনা কোচ স্কালোনি হয়তো মলিনার পরিবর্তে তার বদলি খেলোয়াড় গন্জালো মন্তিয়েলকে বেছে নিতে প্রলুব্ধ হতে পারেন, কিন্তু রিভার প্লেটের এই রাইট-ব্যাক ২০২৫-২৬ মৌসুমে চারটি আলাদা চোটে ভোগার পর এই বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচে ৪৫ মিনিটের বেশি খেলতে পারেননি।

বেলিংহ্যাম হুমকি
একসময় ইংল্যান্ড দলে বেলিংহ্যামের জায়গা নিয়ে উঠত প্রশ্ন। তবে সেসব এখন দূরের অতীত। এই বিশ্বকাপে দারুণ ছন্দে আছেন ২৩ বছর বয়সী অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার।
কোয়ার্টার-ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ে সমতা ফেরানো ও জয়সূচক গোল করে দলকে উদ্ধার করেন তিনি। আগের রাউন্ডে মেক্সিকোর বিপক্ষেও করেন জোড়া গোল। আসরে এখন পর্যন্ত হ্যারি কেইনের সঙ্গে যৌথভাবে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ ছয় গোল তার।
কিন্তু রেয়াল মাদ্রিদের এই খেলোয়াড় এখনও লিসান্দ্রো মার্তিনেস ও ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর মতো আগ্রাসী ও উদ্যমী সেন্টার-ব্যাক জুটির মুখোমুখি হননি।
দুজনই অনেক আগে থেকে বিপদ আঁচ করতে পারেন এবং আক্রমণে আসা প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের বলের জোগান আটকে দেওয়ারে চেষ্টা করেন।
কেইনকে আটকাতে পারবেন মার্তিনেস?
ইংল্যান্ড আন্তর্জাতিক ম্যাচে কখনও এমিলিয়ানো মার্তিনেসের মুখোমুখি হয়নি। তবে অ্যাস্টন ভিলার এই গোলরক্ষকের বিপক্ষে সাতবার খেলেছেন কেইন।
জয়-পরাজয়ের হিসাবে মার্তিনেসের (তিন) চেয়ে কেইন (চার) এগিয়ে থাকলেও, টটেনহ্যাম হটস্পারের সাবেক এই স্ট্রাইকার আর্জেন্টিনার মূল গোলরক্ষকের বিপক্ষে কখনও ওপেন-প্লে থেকে গোল করতে পারেননি।
তবে বায়ার্ন মিউনিখের এই খেলোয়াড় পেনাল্টি থেকে দুইবার মার্তিনেসকে পরাস্ত করেছেন, যার সবশেষটি ছিল ২০২৩ সালে টটেনহ্যামের হয়ে ২-১ গোলে হারের ম্যাচে।
এই দুজনের সবশেষ সাক্ষাৎটি ছিল ২০২৪ সালে ভিলা পার্কে বায়ার্নের ১-০ গোলের হারের ম্যাচে। ওই ম্যাচে শেষ মুহূর্তে অবিশ্বাস্যভাবে কেইনের একটি শট ফিরিয়ে দেন দুইবারের ফিফা বর্ষসেরা গোলরক্ষক মার্তিনেস।
এবার কি মার্তিনেস দেয়াল ভাঙতে পারবেন কেইন?