Published : 15 Jul 2026, 08:56 AM
লিওনেল স্কালোনিকে চেনেন? প্রশ্নটি এখন হাস্যকর শোনাতে পারে, কিন্তু যদি প্রশ্নটি আপনাকে ছয় বছর আগে করা হতো, তাহলে ‘না’ উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনাই ছিল প্রবল। এখন তাকে সারা বিশ্ব চেনে বিশ্বজয়ী কোচ হিসেবে। বোদ্ধাদের দৃষ্টিতে যিনি এক নিরব বিপ্লবী।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিলবাও সামিটে নিবন্ধন করেছিলেন স্কালোনি। সেখানে বসেছিল কোচদের মেলা। ব্রাজিলের কোচ চিচে ছিলেন দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে। ফাবিও কাপেলো, উনাই এমেরি এবং এরনেস্তো ভালভের্দেরা মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন।
এর মাস তিনেক আগেই আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্কালোনি। ওই আয়োজনে কিছুটা যেন উপেক্ষিতই ছিলেন তিনি।
মধ্যাহ্নভোজ শুরু হলো। টেবিলে এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা, স্কালোনি একটু স্বচ্ছন্দ্য হতে চেষ্টা করলেন। সহজাত আলাপচারিতায় মেতে ওঠার চেষ্টায় মন দিলেন। তার উষ্ণ এবং রসবোধ টেবিলে প্রাণ ফেরাল। এমনকি, মাঠে ‘কড়া কোচ’ বলে পরিচিত কাপেলের মুখে তুলে দিল হাসির রোল।
ছয় বছর পর, সেদিনের সেই ‘উপেক্ষিত’ এবং পাজুতোর ছোট্ট শহর থেকে উঠে আসা স্কালোনির হাত ধরে, আর্জেন্টিনা আবার সেমি-ফাইনাল খেলতে যাচ্ছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। আটলান্টায় ম্যাচটি শুরু হবে ১৬ জুলাই ১টায় (এএম)।
টানা দ্বিতীয় ফাইনাল খেলা থেকে স্রেফ এক কদম দূরে আর্জেন্টিনা, এবং তাদের সামনে ১৯৬২ সালের পর টানা দুই শিরোপা জয়ের হাতছানি। স্কালোনির কোচিংয়েই ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জিতে, ৩৬ বছরের খরা কাটিয়েছিল আলবিসেলেস্তারা।
বিলবাওয়ের ওই সামিটের আগে, স্কালোনির পরিচিতি ছিল, সাবেক আর্জেন্টাইন ফুল-ব্যাক হিসেবে; যিনি খেলোয়াড়ি জীবনে ছিলেন ভীষণ পরিশ্রমী, ক্লাব ক্যারিয়ার গড়েছিলেন স্পেনের দেপোর্তিভো লা করুনা এবং রেসিং সান্তান্দেরে, ইংল্যান্ড ও ইতালির ক্লাব ফুটবলে তার স্মৃতি অনুজ্জ্বল। আর কোচ হিসেবে পরিচিতি বলতে, ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে, আর্জেন্টিনা কোচ হোর্হে সাম্পাউলির সহকারী ছিলেন। ব্যস, এতটুকুই।
রাশিয়া বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনা ছিটকে যায় শেষ ষোলো থেকে। তাতে, ক্লাবের সাফল্য জাতীয় দলের জার্সিতে লিওনেল মেসির টেনে আনতে না পারার পুরনো অভিযোগ ফের ওঠে তেড়েফুঁড়ে; ক্ষোভে-হতাশায় তিনিও জাতীয় দল থেকে দূরে সরে যান। কোচের পদ ছাড়েন সাম্পাউলি।
মাউরিসিও পচেত্তিনো, দিয়েগো সিমেওনে এবং অন্যান্য কোচেরা আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। বলে দেন, এফএ’র ‘বিষাক্ত’ পরিবেশে কাজ করতে অপারগ তারা। এমন প্রেক্ষাপটে, আর্জেন্টিনার ডাগআউটে প্রধান কোচ হিসেবে আগমণ স্কালোনির। ততদিনে কোচ হিসেবে, পুঁজি বলতে, সাম্পাউলির সহকারী হিসেবে করা কাজটুকুর অভিজ্ঞতা।

চারদিকে হৈ-হৈ রৈ-রৈ পড়ে গেল। খোদ দিয়েগো মারাদোনা ধুয়ে দিয়েছিলেন এফএ কর্তাদের। তখন, আসলে খুব কম মানুষই অনুভব করতে পেরেছিলেন, স্কালোনি একদিন হবেন, দেশের ফুটবল ইতিহাসের সফল কোচদের একজন।
স্কালোনি নিজেও তা অনুভব করেছিলেন কিনা, কে জানে? তবে, পাবলো আইমার, ওয়াল্তার সামুয়েলের মতো সাবেক সতীর্থ ও সহকর্মীদের তিনি পেয়েছিলেন, কঠিন পথচলার শুরু থেকে। সবার সহযোগিতায় স্কালোনি তার প্রথম তরুপের তাসটি চাললেন, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, ফিরিয়ে আনলেন মেসিকে।
কিন্তু বিগড়ে বসল সময়। কোভিড মহামারী এলো। কোপা আমেরিকার আসর স্থগিত হলো। তাতে কি উল্টো একটু সুবিধেই হয়েছিল স্কালোনির? নিজের কৌশল ঝালিয়ে নিতে আরেকটু বেশি সময় যে পেয়েছিলেন তিনি। এরপর এলো ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা। রিও দে জেনেইরোর ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামের সেই দিন বদলে দিল সবকিছু।
দিনটি ছিল, ১০ জুলাই। ম্যাচের ২১তম মিনিটে আনহেল মারিয়া খুঁজে নিলেন ব্রাজিলের জাল। সেই গোলটি শেষ পর্যন্ত যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিদের কান্নায় ভাসিয়ে জিতল আর্জেন্টিনা। বড় কোনো শিরোপার ২৮ বছরের খরাও কাটল। জাতীয় দলের হয়ে মেসি পেলেন বড় কোনো ট্রফির অনির্বচনীয় স্বাদ। কিন্তু সেটা ছিল স্রেফ স্ফুলিঙ্গ। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে এসে তা হয়ে উঠল ঝলমলে আলো।
স্কালোনি এখানেই যেন অন্যদের চেয়ে আলাদা। মেসিকে বা আর্জেন্টিনাকে তিনি তার কাজের স্বীকৃতি আদায়ের পথ হিসেবে দেখেননি কখনও। আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জিতেছেন, বিশ্বজয় করেছেন, কিন্তু তিনি কখনও নিতে চাননি এই সাফল্যের একক মালিকানা।
এই সংযমই স্কালোনির শক্তি। ফুটবল সংস্কৃতিতে এটিকে অনেক সময় অহংকার হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়; কিন্তু স্কালোনি বরাবর নিজেকে আড়ালে রেখে, আবেগের বন্ধনে দৃঢ় একটি দল দাঁড় করিয়েছেন। এবার সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগেও তিনি তুলে ধরেন, কোচ হিসেবে তার ভিন্ন দর্শন।
“আমি কোচ নই, কেননা, আমি ৪-৩-৩ ফরমেশন পছন্দ করি। আমি সহকর্মীদের সাথে দলবদ্ধ হয়ে থাকতে পছন্দ করি, তাদের সঙ্গে পান করি, আসাদো (বারবিকিউ) খাই, তাস খেলি…আপনি যদি শুধু ম্যাচ নিয়েই ভাবেন, তাহলে শেষ হয়ে যাবেন, ক্লান্ত হয়ে পড়বেন।”
একটি আর্জেন্টাইন কোচিং স্কুলের সাথেও আছেন স্কালোনি। যে স্কুলটি দক্ষিণ আমেরিকা তো বটেই, বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি বিশ্বকাপে, কনমেবল অঞ্চলের বাছাইয়ে ১০ দলের আটটির কোচ ছিলেন আর্জেন্টাইন। আর ছয় আর্জেন্টাইন দাঁড়িয়েছেন এবারের বিশ্বকাপের ডাগআউটে।
বিপরীতে, বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় সবচেয়ে বাজে ফল করেছে ব্রাজিল। শেষ ষোলো থেকে তারা ছিটকে যায়, নরওয়ের বিপক্ষে হেরে। এবার ১১তম হয়েছে সেলেসাওরা। এবারের বিশ্বকাপে কোনো ব্রাজিলিয়ান প্রধান কোচও ছিল না, এর আগে যা কখনও দেখা যায়নি। এবার ব্রাজিলের দায়িত্বেই ছিলেন ইতালির কার্লো আনচেলত্তি।
আর্জেন্টিনার এই বদলে যাওয়া এবং এর পেছনে স্কালোনির ভূমিকা নিয়ে, দুই বছর আগে নিজের অভিমত জানিয়েছিলেন সিলভিনিয়ো। বার্সেলোনা ও ব্রাজিলের এই সাবেক ফুল-ব্যাক বলেছিলেন, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা আগেভাগেই তাদের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতি ও ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে শুরু করে।

ক্লাব ফুটবলে, একসময়ের প্রতিপক্ষ স্কালোনিকে নিয়ে সিলভিনিয়ো বলেন, তার সেন্তা ভিগোর সতীর্থ এদুয়ার্দো কুদেতের সাথে স্কালোনি নিয়নিত মাদ্রিদে যেতেন, স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের কোচিং কোর্সে অংশ নিতে। অথচ, তখনও খেলতেন স্কালোনি।
এটাই আসলে বলে দিচ্ছে, সান্তা ফের কৃষিভিত্তিক ছোট একটি শহর থেকে উঠে আসা স্কালোনির দায়িত্ববোধ ও কাজের প্রতি আগ্রহ কতটা ছিল। এমনকি, বিশ্বজয়ী কোচ হওয়ার পরও তা আজও অটুটু।
অথচ, নিজেকে পাদপ্রদীপের আলোয় আনার সব পথই এখন খোলা তার সামনে। কিন্তু তিনি সবসময় আড়ালে থাকতে আগ্রহী। মেসি ও অন্যদের থাকতে দিয়েছেন মূল নায়কের ভূমিকায়।
মিশরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের পর, স্কালোনির ঝরা অশ্রুও বলে দেয় অনেক কিছু। এই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে, গনসালো মন্তিয়েলের নির্ণায়ক পেনাল্টির পরের মুহূর্তটিঃ নিশ্চল, নিশ্চুপ, অঞ্জলিতে ঢাকা মুখ, যেন তিনি আড়াল করতে চাইছেন আনন্দাশ্রু, যেন নিশ্চিত হতে চাইছেন, বাস্তবতা তার সাথে লুকোচুরি খেলছে কিনা।
স্কালোনির বড় কৃতিত্ব মেসিকে সামলে, আগলে রাখতে পারা। মহাতারকার ব্যক্তিত্ব এবং তাকে সামলানোর চাপে পিষ্ট না হয়ে, বরং তার কাছ থেকে সেরাটা নিংড়ে বের করে আনতে পারা। ৪৮ বছর বয়সী এই কোচের হাত ধরে আর্জেন্টিনা হয়ে উঠেছে, মেসিকে কেন্দ্রে রেখে গড়ে ওঠা দলের চেয়েও বেশি কিছু।
তাতে দলের বাকিরাও, তাদের আদর্শ মেসি দ্বারা অনুপ্রাণিত হচ্ছেন; অভিন্ন লক্ষ্যে ছুটছেন দুর্বার গতিতে। মিডফিল্ডার লেয়ান্দ্রো পারেদেসের কণ্ঠে তারই প্রতিধ্বন্তি।
“আমরা খেলি, যাতে মেসির শেষ ম্যাচ কখনও না আসে।”
মেসিও খেলছেন, আর্জেন্টিনাও জিতছে আর বিলবাওয়ের সেই সামিটে খ্যাতিমান কোচদের ভিড়ে ‘অচেনা’, ‘উপেক্ষিত’ স্কালোনি, এখন সবার চেয়ে বড় হয়ে উঠছেন; অর্জনের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে।