Published : 15 Jul 2026, 08:16 AM
১৯৬৬ বিশ্বকাপে আন্তোনিও রাতিন। দিয়েগো মারাদোনা ১৯৮৬ সালে। ডেভিড বেকহ্যাম ১৯৯৮-তে। ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার আটলান্টার ম্যাচ নিয়ে তাই প্রশ্নটা থাকছে, দল দুটির লড়াইয়ে বারবার জন্ম নেওয়া বিতর্কের গল্পে এবার যোগ হবে কার নাম?
কেননা, এই দুই দলের ম্যাচ যে কখনোই স্রেফ একটা ফুটবল ম্যাচ ছিল না। তাই, পুঞ্জিভূত দ্বন্দ্বের দাবানল সুযোগ পেলেই জ্বলে ওঠার অতীত ফিরে-ফিরে আসছে। নতুন বৈরিতা শুরুর শঙ্কা নিয়ে!
সেই ম্যাচগুলো ফুটবলের ইতিহাসের পাতায় যেন চিরন্তন গল্প-গাঁথা। সেখানে, আনন্দ-উল্লাসের বিপরীতে আছে বিষাদের করুণ সুর, হারানোর ব্যথা। আছে বিরোধ, বিতর্ক, দ্বন্দ্ব। যে দ্বন্দ্বের তীব্রতা ফুটবলের সবুজ আঙিনা থেকে ছুটেছে ফকল্যান্ডের যুদ্ধের ময়দান অবদি। এবারের রণক্ষেত্র, যুক্তরাষ্ট্র। সেখানেও তিক্ত, বিতর্কিত অতীত আছে আর্জেন্টিনার।
বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে এই প্রথম দেখা হচ্ছে দুই দলের। ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, ম্যাচটি আর্জেন্টিনার জন্য শিরোপা ধরে রাখার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ। ইংল্যান্ডের জন্য উপলক্ষ হারানো মুকুট ফিরে পাওয়ার। স্রেফ এতটুকুই। কিন্তু এর বাইরে, নিঃশব্দে ঠিকই বয়ে চলেছে, দুই দলের মধ্যে যুগ যুগ ধরে চলা ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের চোরাস্রোত।
যে বৈরিতার ‘আনুষ্ঠানিক’ শুরুটা সম্ভবত রাতিনকে দিয়ে। এই সপ্তাহেই যিনি পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে। আরও অনেক কিছুর সাথে, বুধবারের ম্যাচটি ফিরিয়ে আনছে সেই স্মৃতি। রাতিনের জন্য যা ছিল, হৃদয়ভাঙা কষ্টের, হতাশার। আর্জেন্টিনার জন্য ছিল অপমানের।
১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। ইংল্যান্ড ছিল আসরের আয়োজক। রাতিন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে একটি ফাউলের প্রতিবাদ করেন তিনি এবং এজন্য তাকে মাঠ থেকে বহিষ্কার করেন জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলেইন।

রেফারিদের তখন কার্ড ব্যবহারের প্রচলন ছিল না, বরং খেলোয়াড়দের মৌখিকভাবে জানিয়ে দিতেন যে, তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। আর্জেন্টিনা অধিনায়ক মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালেন। দুই দলের বিরোধের গল্পের প্রথম পাতাটি খোলা হয়ে গেল।
রাতিন দাবি করেন, রেফারি স্প্যানিশ বলতে না পারায়, তিনি সিদ্ধান্তটি বুঝতে পারেননি। কিন্তু, পরে মাঠ ছাড়ার সময় তিনি প্রতিবাদ উগরে দিলেন। রাগে-ক্ষোভে ফুঁসতে-ফুঁসতে ইংল্যান্ডের পতাকার নকশা করা একটি কর্নার ফ্ল্যাগ মুচড়ে দেন এবং এরপর রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্য সংরক্ষিত লাল গালিচায় বসে পড়েন। ইংলিশ সমর্থকেরা তার দিকে ছুঁড়তে থাকে বিয়ারের ক্যান, পরবর্তীতে বলেছিলেন রাতিন।
ওই ঘটনায়, ম্যাচের উত্তাপ পৌঁছায় চরমে। ম্যাচটি শেষ হয়েছিল ইংল্যান্ডের ১-০ গোলের জয় দিয়ে। পরে তারা বিশ্বকাপের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত সবশেষ শিরোপার স্বাদ পেয়েছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য তা ছিল খুব কষ্টের। তিক্ততা আরও বাড়ে ইংল্যান্ড কোচ আলফ রামজির সেই কুখ্যাত মন্তব্যে। রাতিনদের তিনি বলেছিলেন-পশু! এই অপমান কখনই ভোলেনি আর্জেন্টিনা।
২০ বছর পর, দুই দলের ফের দেখা মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আসতেকা স্টেডিয়ামে। আবারও বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে। রাতিনের ওই ঘটনার ক্ষোভের আগুন তো ছিলই, সেখানে ঘি ঢেলেছিল দুই দেশের মধ্যে দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা সংক্ষিপ্ত সময়ের যুদ্ধ।
১৯৮২ সালের সেই যুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন এবং বৃটিশদের ২৫৫ জন সৈনিক প্রাণ হারিয়েছিল। যুদ্ধে ঝরে যাওয়া সাধারণ মানুষের কথা কে মনে রাখে? কিন্তু আর্জেন্টাইনরা রেখেছিল মালভিনাসদের। ফকল্যান্ড দ্বীপটি আর্জেন্টিনার কাছে মালভিনাস নামে পরিচিত। সেই যুদ্ধের ফলে, ফুটবল মাঠের লড়াইয়ের সাথে যোগ হয়ে যায় রাজনৈতিক বিরোধ।
ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসে দুটি কারণে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে এবং অবশ্যই বির্তক, বিস্ময় নিয়ে। ফুটবল ইতিহাসের তর্কসাপেক্ষে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মারাদোনা দুই গোল করে ছিটকে দেন ইংল্যান্ডকে। প্রথমটি তিনি করেছিলেন শুন্যে লাফিয়ে, হাত দিয়ে। ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে যে গোলটি ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, ইংল্যান্ডের জন্য চিরকালীন ক্ষত। সমর্থক-বোদ্ধাদের জন্য বিতর্কের অনুসঙ্গ।
দ্বিতীয় গোলটি ছিল অপার সৌন্দর্য, মুগ্ধতা, বিস্ময়ের অবিশ্বাস্য প্রদর্শনী। ইংল্যান্ডের পাঁচ খেলোয়াড় এবং গোলকিপার পিটার শিলটনকে কাটিয়ে জাল খুঁজে নিয়েছিলেন মারাদোনা। ফুটবলের ইতিহাসে যেটিকে সর্বকালের সেরা ধরা হয়; ফিফাও এটিকে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ স্বীকৃতি দেয়। গোলটি নিয়ে উচ্ছ্বাস ইংল্যান্ড ছাড়া বাকি বিশ্বের।

বর্তমান সময়ের ভিএআর থাকলে, নিশ্চিত প্রথম গোলটি পেতেন না মারাদোনা। রেফারির চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল বলেই, আসতেকার হাত দিয়ে গোলটি করতে পেরেছিলেন তিনি। পেরেছিলেন বলেই, গল্প লেখা হয়েছিল। ইংল্যান্ডের কাছে ওই গোল ‘প্রতারণা’ হলেও মারাদোনা এবং আর্জেন্টাইনদের কাছে তা ছিল অন্যরকম প্রাপ্তির। তাদের কাছে তা ছিল, ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ। অভিজাতদের বিপক্ষে দুর্বলের পাওয়া স্মরণীয়, স্বর্গীয় জয়।
আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘এল দিয়েগো’-তে মারাদোনা তুলে ধরেন সেই ম্যাচ, সময়ের অনুভুতি: একটা ফুটবল দলকে হারানোর চেয়েও এটি বেশি কিছু, এটা ছিল একটা দেশকে হারানো। অবশ্যই, ম্যাচের আগে আমরা বলেছিলাম যে, মালভিনাস যুদ্ধের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু আমরা জানতাম, সেখানে অসংখ্য আর্জেন্টিনা শিশু মারা পড়েছিল, ছোট পাখির মতো তাদেরকে গুলি করে মারা হয়েছিল। এটা ছিল প্রতিশোধ।”
দুটি দেশের মধ্যে ভালবাসা-ঘৃণার সম্পর্কের শুরু অবশ্য আরও আগে থেকে। ইতিহাসের একটি অংশে, ১৯ শতকে বৃটিশ অভিবাসী, যারা মূলত ছিলেন রেলওয়ের শ্রমিক, তারাই ফুটবল নিয়ে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনায়। দেশটির কয়েকটির ক্লাবের বৃটিশ আদলে নাম রিভার প্লেট, লিওনেল মেসির শুরুর দল নিওয়েল’স ওল্ড বয়েজ- সেই ইতিহাসেরই প্রতিফলন।
কিন্তু, আর্জেন্টিনার ফুটবল প্রথাগতভাবে স্কুল মাঠে, ক্রীড়া শিক্ষকের দেখভালে বিকশিত হয়নি। বরং গরু-ছাগলের চারণভূতি, নোংরা, এবড়ো-থেবড়ো মাঠে বেড়ে উঠেছে। জোনাথন উইলসন তার ‘অ্যাঞ্জেল উইথ ডার্টি ফেসেস: দ্য ফুটবলিং হিস্ট্রি অব আর্জেন্টিনা’ বইয়ে তুলে ধরেছেন সেই গল্প।
ফুটবলের সাথে ব্যাংক, বিনিয়োগ কাঠামো, রেলওয়ে, রাগবিসহ আরও অনেক কিছুই আর্জেন্টিনায় নিয়ে গিয়েছিল বৃটিশরা। কিন্তু সবই ছিল স্বার্থসংশ্লিষ্ট; দুই দেশের মধ্যেও ছিল উপনিবেশিক সম্পর্ক। একসময়, বৃটিশ রাজদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমতে শুরু করে আর্জেন্টাইনদের মধ্যে। তাদে ক্ষোভে বিস্ফোরণে দেশটি ছাড়ে বৃটিশরা। সে অন্য বিতর্ক, আরেক গল্প।
১৯৯৮ বিশ্বকাপে, শেষ ষোলোয় আবার ফুটবল মাঠে দেখা ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার। ম্যাচটি স্মরণীয় হয়ে আছে, বেকহ্যামের সেই আলোচিত লাল কার্ডের কারণে। এখানে বলে রাখা ভালো, রাতিনের ওই কাণ্ডের পর ফুটবলে হয়েছিল, হলুদ ও লাল কার্ডের প্রচলন।
ম্যাচটি টাইব্রেকারে জিতেছিল আর্জেন্টিনা, কিন্তু বেকহ্যামের অবিশ্বাস্য কাণ্ড আজও ভুলতে পারেনি ইংলিশরা। ম্যাচে তখনও এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড। নাটক জমল দ্বিতীয়ার্ধে। দিয়েগো সিমেওনের ফাউলের শিকার হলেন বেকহ্যাম, কিন্তু মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় তিনি লাথি মেরে বসলেন সিমেওনেকে। সরাসরি লাল কার্ড পেয়ে, নত মুখে ছাড়লেন মাঠ। ১০ জনের ইংল্যান্ড পেরে ওঠেনি শেষ পর্যন্ত। ২-২ সমতায় শেষের পর, পেনাল্টি শুটআউটে ধরাশায়ী হয়েছিল ‘থ্রি লায়ন্স’রা।
চার বছর পর, ২০০২ বিশ্বকাপে অবশ্য ‘শাপমোচন’ করেছিলেন বেকহ্যাম। গ্রুপ পর্বের দেখায়, তার একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল ইংল্যান্ড। ওই হারে, টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় ঘণ্টা বেজে গিয়েছিল আলবিসেলেস্তেদের।
২০২৬ এর বিশ্বকাপে এসে ফের মুখোমুখি দুই দেশ। মঞ্চটা আরও বড়, সেমি-ফাইনাল। এই ম্যাচ ঘিরে, ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব টেনে আনছেন না। প্রকাশ্য আলাপে আর্জেন্টিনাও উড়িয়ে দিয়েছে অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো। উইলসনের মনে, আগের চেয়ে অনেক বেশি আর্জেন্টাইন ফুটবলার ইউরোপে খেলায়, এখন মতপার্থক্য কমেছে অনেকটাই।
আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি যেমন, বাংলাদেশ সময় ১৬ জুলাই ১টায় (এএম) শুরু হতে যাওয়া ম্যাচ নিয়ে, দিয়েছেন ভিন্ন বার্তা।

“এটা একটা ফুটবল ম্যাচ…(নতুন এক) অধ্যায়…এর বেশি কিছু নয়। এই ম্যাচের মধ্যে অন্য কিছু না খুঁজি।”
কিন্তু সময় দেয় ভিন্ন বার্তাও। ফুটবল ম্যাচের পরিচিত এক চিত্র- শেষের বাঁশি বাজার পরই খেলোয়াড়রা ছুটে যান সমর্থকদের কাছে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লাফাতে-লাফাতে গাইতে থাকেন। বুয়েনস এইরেসের গ্যালারিতে প্রায়ই শোনা যায়, এমন একটা কোরাস: যদি তুমি না লাফাও, তুমি ইংলিশ!
আর্জেন্টিনার লকার রুমের এবারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে চাউর হয়েছে। সেখানেও শোনা যাচ্ছে একটি নতুন গান; যেখানে ১৯৯৪ সালে তাদের কাছ থেকে বিশ্বকাপ ‘চুরি’ করে নেওয়ার প্রতিশোধের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। ওই আসরে, মারাদোনা ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। এবারের মতো সেই আসরের আয়োজকও ছিল যুক্তরাষ্ট্র।
এই গানেও মিশে আছে সেই ফকল্যান্ড যুদ্ধ, “এই জয় হবে মালভিনাসদের জন্য, দিয়েগোর জন্য, লিওর (মেসি) শেষের জন্য।”
আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার রদ্রিগো দে পলও পুরনো প্রসঙ্গ টেনেছেন। তবে, শান্ত সুরে, সেখানে প্রতিশোধ, বৈরিতার ঝাঁঝ নেই একটুও।
“অবশ্যই, দিয়েগো (মারাদোনা) যা করেছেন (আর্জেন্টিনার ফুটবলের জন্য) এবং ওই সময় (১৯৯৪ বিশ্বকাপে) যা হয়েছিল, তা ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ এবং অনেক স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। কিন্তু, আমাদের বুঝতে হবে, এটা একটা ফুটবল ম্যাচ…যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি করে, আমরা এই ম্যাচটি জিতে ফাইনালে উঠতে চাই।”
দে পলের ১৯৯৪ স্মৃতি পেড়ে বসা মানে, প্রতিশোধের স্ফুলিঙ্গ আছে ছাইচাপা হয়ে। স্রেফ দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠার অপেক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের মাঠ, প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড-এমন যুদ্ধের মঞ্চে ‘শান্ত’ থাকবে আর্জেন্টিনা?