Published : 07 Jul 2026, 06:27 PM
লিভারপুলে মোহামেদ সালাহ অবিসংবাদিত কিংবদন্তি। মিশরে তিনি রাজা। ভক্তদের প্রিয় ‘ইজিপশিয়া কিং।’ ফুটবল খেলাটি তো স্রেফ একজনের নয়। দেশের জার্সি গায়ে তাই আন্তর্জাতিক ফুটবল রাজত্ব করতে পারেন লম্বা সময় ধরে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন একটি ফুটবল-পাগল জাতির প্রত্যাশার ভার বহন করে, সঙ্গে সহ্য করেছেন বিশ্বকাপের বিষাদ, আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসের হৃদয়বিদারক পরাজয় এবং দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাথে প্রকাশ্য বিবাদ।
সেই সালাহ এবং মিশর মঙ্গলবার আটলান্টা খেলতে নামবেন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার আশায়। আর্জেন্টিনাকে হারানো কঠিন, খুবই কঠিন। তবে জিতলে পুরস্কারও বড়। ইতিহাসের অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে সালাহরা।
তবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচটিতে যা-ই ঘটুক না কেন, একটি ইতিহাস মিশর গড়ে ফেলেছে আগেই। সেখানে খোদাই হয়ে গেছে সালাহর নাম। এমন অর্জন ধরা দিয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে তার এবং মিশরের অধরা ছিল।
এবারের আগে বিশ্বকাপে কখনও একটি ম্যাচ জয়ের স্বাদও পায়নি ফারাও নামে পরিচিত দলটি। সেই দল এবার নকআউট পর্বে উঠেছে এবং আরও এক ধাপ এগিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিয়েছে। সেখানে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন সালাহ, দলের প্রেরণাদায়ী অধিনায়ক।
দ্বিতীয় রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পরই সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের উচ্ছ্বাস ও আবেগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল মাঠে।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে টলমল করে ওঠে সালাহর চোখ। আনন্দাশ্রুতে উদযাপনে শামিল হন তিনি। সতীর্থদের আলিঙ্গন করেন এবং সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান। বছরের পর বছর ধরে অল্পের জন্য হাতছাড়া হয়েছে সাফল্য, তার ব্যক্তিগত নৈপুণ্যকে দলীয় সাফল্যে রূপান্তরিত করতে মিশরের ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনায় বিদ্ধ করা হয়েছে। এত পথ পেরিয়ে এই অর্জন ছিল বাঁধনহারা আনন্দের। ছিল এক মুক্তির এক মুহূর্ত।
ম্যাচের পর মুখে হাসি আর চোখে পানি নিয়ে সালাহ বলেন, “এটা ইতিহাস।” দলের প্রতি তার বার্তাটুকুও তুলে ধরেছিলেন সেদিন।
“ম্যাচে আগে আমি ছেলেদেরকে বলেছিলাম, ‘বন্ধুরা, এটা তোমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। তাই শুধু উপভোগ করো। চাপের কাছে হার মানবে না এবং মুহূর্তটা উপভোগ করতে ভুলো না।’ আমি খুশি যে আমরা ম্যাচটা জিততে পেরেছি।

মাঠের অধিনায়ক, উদযাপনেও নেতা
মিশরের প্রতিটি জয়ের পর, দলের উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সালাহ। তাকে দেখা গেছে একটি পোর্টেবল স্পিকার বহন করতে। সতীর্থরা ড্রেসিংরুমে গান গাইতেন ও নাচতেন এবং এক পর্যায়ে সেই উদযাপনকে নিয়ে যেতেন টিম হোটেলে বাইরে।
টুকরো টুকরো দৃশ্যগুলো মিশরের বিশ্বকাপ অভিযানের স্মরণীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অধরা থাকা আন্তর্জাতিক সাফল্যকে মুঠোয় পেয়ে উপভোগ করছেন একজন অধিনায়ক। তার স্বতস্ফূর্ত আনন্দগুলো যেখানে দৃশ্যমান।
মাঠে তার পারফরম্যান্সেও সেই নেতৃত্বেরই প্রতিফলন পড়েছে। গ্রুপ পর্বে হ্যামস্ট্রিংয়ে টানা লাগা সত্ত্বেও, সালাহ গোল করেছেন, দুটি অ্যাসিস্ট করেছেন এবং ১৬টি সুযোগ তৈরি করেছেন। মিশরের এই যাত্রায় তার প্রভাবের কিছুটা ফুটে উঠছে এতে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩৪ বছর বয়সী ফুটবলার পুরো ১২০ মিনিট খেলার পর শুটআউটে প্রবল চাপের মধ্যে শান্তভাবে একটি পানেনকা শটে গোল করেন।
টাইব্রেকারে শট নেওয়ার স্নায়ুচাপ ধরে রাখার প্রশ্নটিতে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি জাত নেতা।
“খেলায় যদি কাউকে এই দায়িত্বটা নিতে হয়, তবে সেটা আমিই নেব, কারণ অন্যদের চেয়ে আমি বেশি অভিজ্ঞ, এবং আমি শুধু তাদের বিশ্বাস জোগাতে চাই।
সম্ভবত শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম। জানি না, এটা আমার শেষ বিশ্বকাপ কি না, কিন্তু আমাকে এটা করতেই হতো।”
বিশ্বের সেরা ফরোয়ার্ডদের একজন হওয়া সত্ত্বেও এবারের বিশ্বকাপের আগে সালাহর মিশরীয় ক্যারিয়ার প্রায়শই হতাশামায় ছিল।
২৮ বছরের অনুপস্থিতির পর তার গোলেই ২০১৮ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছিল মিশর। কিন্তু বিশ্বকাপে কয়েক সপ্তাহ আগে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে পাওয়া কাঁধের চোট নিয়ে তিনি রাশিয়ায় পৌঁছান এবং তার দল গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
তার সময়ে মিশর ২০১৭ এবং ২০২১ সালের আফ্রিকা কাপ অফ নেশন্সের ফাইনালেও হেরেছিল। এছাড়া, ইমেজ রাইটস, ভ্রমণ ব্যবস্থা এবং দলের ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে মিশরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সালাহর বেশ কয়েকটি প্রকাশ্য মতবিরোধ হয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চোট নিয়েই খেলার তার এই মানসিকতা মিশরে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। এবারের বিশ্বকাপে সালাহ এর মধ্যেই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ঘিরে প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছেন। মিশরকে তিনি এমন এক বিশ্বকাপ অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা তার পূর্বসূরিদের প্রজন্মগুলো অর্জন করতে পারেনি। দেশকে সাফল্য এনে দিয়েছেন তিনি বিশ্বমঞ্চে।
এখন লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নিজের কীর্তিময় পথচলায় নতুন মাত্রা যোগ করার হাতছানি তার সামনে।