Published : 08 Jul 2026, 08:20 PM
জীবনের পথচলা কতভাবেই না বদলে যায়! ইসা জিওপ একসময় রীতিমতো ঘোষণা দিয়েছিলেন, ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলবেন না কখনই। সেটা করতে হলে, তা হবে ভণ্ডামি। কিন্তু সেই তিনিই এখন ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ! অভিজ্ঞ এই সেন্টার ব্যাক বস্টনে থাকবেন মরক্কোর রক্ষণভাগে। দায়িত্ব থাকবে, কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলেদের আটকে রাখার।
আসলে জিওপের সামনে খোলা ছিল অনেক পথ। তার বাবা সেনেগালের। মা মরোক্কান। কিন্তু তার জন্ম, বেড়ে ওঠা ফ্রান্সের তুঁলুজে। জিওপের দাদা ছিলেন সেনেগালের প্রথম জাতীয় দলের কোচদের একজন। ফলে, সেনেগালের মতো মরক্কোর দুয়ার সদাই খোলা ছিল ২৯ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডারের সামনে। কিন্তু একটা সময় ওই দুয়ারগুলোর দিকে ফিরেও চাননি জিওপ।
স্বপ্ন ছিল ফ্রান্স জাতীয় দলে খেলার। তাই, সেনেগাল ও মরক্কোর ডাক উপেক্ষা করে ছিলেন দীর্ঘদিন। ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেলার সুবাদে জিওপ ছিলেন জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার দুয়ারেও। কিন্তু সে দুয়ার খোলেনি।
২০১৮ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলের রক্ষণ সামলেছেন জিওপ। সাত বছর আগে, অনূর্ধ্ব-২১ দলে খেলার সময় টেলিভিশন কানাল প্লাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জোর গলায় বলেছিলেন, ফ্রান্স জাতীয় দলই তার আসল ঠিকানা।
“আমি ফরাসি। আমি ফ্রান্সে জন্ম নিয়েছি। ফ্রান্স আমাকে সবকিছু দিয়েছে। ফ্রান্সের জাতীয় দলে যোগ দিতে না পারার কারণে, অন্য কোনো দল বেছে নেওয়া মানে, আমি ভণ্ডামি করছি। এটা অনেকটা গতানুগতিক পছন্দ করার মতো বিষয় হবে।”
ওই সাক্ষাৎকারই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছিল গত মার্চে, যখন তিনি মরক্কো দলকে বেছে নেন। বিশ্বকাপ দলেও জায়গা পান। এবার জিওপ মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ফ্রান্সেরই।
মূল দায়িত্ব রক্ষণ সামলানো হলেও, বিশ্বকাপে এসে মরক্কোর হয়ে প্রথম গোলও পেয়েছেন জিওপ। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ বত্রিশের ম্যাচে। তার যোগ করা সময়ের গোলে হার এড়িয়ে, মরক্কো ম্যাচটি টেনে দিতে পারে টাইব্রেকারে। সেখানে শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানের জয়ে উঠে আসে শেষ ষোলোর মঞ্চে।
জিওপ আসলে মরক্কোর রাডারে, বিশেষ করে কোচ মোহামেদ ওয়াহ্বির নজরে ছিলেন আগে থেকে। আট মৌসুম ধরে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডে ও ফুলহ্যামে খেলা এই ডিফেন্ডারকে খুব করে দলে পেতে চাইছিলেন ওয়াহ্বি।
গত মার্চে জিওপকে পেয়েও যায় মরক্কো। একুয়েডরের বিপক্ষে প্রীতিম্যাচ দিয়ে জাতীয় দলের জার্সিতে হয়ে যায় অভিষেক। এরপর থেকে ক্রিস্টাল প্যালেসের চাদি রিয়াদের সাথে তিনি মরক্কোর রক্ষণের প্রথম পছন্দের খেলোয়াড়।
নিশ্চিতভাবে, ফ্রান্সের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জিওপের কাঁধে রক্ষণের ভার, বিশেষ করে গোলমেশিন এমবাপেকে আটকানোর দায়িত্ব তুলে দেবে মরক্কো। দলটির কোচ, ওয়াহ্বি বলেছেন, অতীত নিয়ে পড়ে থাকার পক্ষে নন তিনি।
“আমি এমন একজনকে পেতে চাইছিলাম, যে দলের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, মরক্কোতেও কিছুটা সময় থেকেছে এবং প্রায়ই দেশটিতে যাতায়াত করে (জিওপ সেই জন)। আমাদের অতীত নিয়ে খুব বেশি পড়ে থাকা উচিত নয়, বরং ভবিষ্যতের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
“মাঠে জিওপের মনোভাব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি নিশ্চিত, মরক্কোর জন্য সে খুবই ইতিবাচক প্রভাব রাখবে এবং আমি তাকে সাদরে গ্রহণ করেছি।”
এখন অগ্নিপরীক্ষার সামনে জিওপ। নেদারল্যান্ডস ম্যাচে তিনি গোল পেয়েছেন, কিন্তু ফ্রান্স ম্যাচে রক্ষণ ছেড়ে, তেড়েফুঁড়ে উপরে ওঠার সুযোগ কমই থাকবে তার সামনে। চলতি আসরের সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণভাগের মুখোমুখিও হতে হবে তাকে। সঙ্গে নিজের আবেগের সাথেও তো লড়তে হবে ‘ফরাসি’ থেকে ‘মরক্কান’ হয়ে যাওয়া জিওপকে।