চারদিকে বিশ্বকাপের সুরের মূর্ছনা

সলিমুল্লাহ, সলিমুল্লাহ কোরাসের সুরে মেতে ওঠার অপেক্ষায় কাতার।

মোহাম্মদ জুবায়েরমোহাম্মদ জুবায়েরদোহা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 20 Nov 2022, 05:10 AM
Updated : 20 Nov 2022, 05:10 AM

মরুভূমির বিকেলটা বড্ড আবির রাঙা। নীলকাশে দিনভর হাঁটাহাঁটি শেষ করে সন্ধ্যেয় মরুদিগন্তে ঢলে পড়া সুর্যর বর্ণিল রঙছটা, আলো-আঁধারের ‍লুকোচুরি খেলা, হিমশীতল বাতাস, চারদিকে সে এক নৈস্বর্গীক আবহ। অদূরে যেন বিরামহীন, ক্লান্তিহীনভাবে বেজে চলেছে ‘সলিমুল্লাহ, সলিমুল্লাহ’ কোরাসের সুর। কাতারের ফুটবলপ্রেমীদের প্রিয় গান এখন এটি। হৃদয়ের গহীনে টোকা দেওয়া অদ্ভূত এক দ্যেতনা আছে এই কোরাসের সারগামে। 

আল বায়াত স্টেডিয়ামে রোববার যখন পর্দা উঠবে বিশ্বকাপের ২২তম আসরের, তখন হয়তো সারাবিশ্বের অলি-গলিতে পৌঁছে যাবে এই সুরও। 

এই কোরাসের সুরটুকু একান্তই কাতারিদের। মূলত এটি বিয়ের গান। ছেলে-মেয়ে উভয় পক্ষ খরতালের টুং টুং ছন্দে, ঢাউস সাইজের ঢোল বাজিয়ে অংশ নেয়। ছেলেরা ঐতিহ্য অনুযায়ী টুপি-জোব্বা পরে তরবারি নাচিয়ে, রক্ষণশীলতার প্রচীরে আটকে থাকা নারীরা ঘরোয়া পরিবেশে গানটি গেয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ফুটবলের সঙ্গে এর মিলন ঘপে কাতার ২০১৯ সালে এশিয়ান কাপের শিরোপা জয়ের পর। 

বিশ্বকাপের উন্মাদনা একেক দেশে একেকরকম। টুর্নামেন্টে অংশ না নিলেও বাংলাদেশে সব সময়ই তুমুল সাড়া ফেলে ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের আসর। খেটে খাওয়া শ্রমিকরাও ক্লান্তিকর দিন শেষে চায়ের দোকানে টিভির সামনে বসে। রাস্তার পাশে থাকা টিভির শো-রুমগুলোর উকিঁঝুঁকি দেয় ভবঘুরেরা। গ্রামে-গঞ্জে-শহরের ঘর-বাড়ি ছাদে, বারান্দায়-ব্যালকনিতে, গাছের মগডালে প্রিয় দলের বড়-ছোট-মাঝারি পতাকা উড়ে পত-পত করে। পুরো বাড়িটাই হয়তো ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে রাঙিয়ে ফেলেন সৌখিন কেউ। পাড়া-মহল্লার দোকানে চায়ের কাপে চুমুকে চুমুকে চলবে প্রিয় দল কিংবা প্রতিপক্ষ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের ঝড়। ছোটখাট হানাহানি, রেষারেশির দরজা ক্ষণিকের জন্য হলেও বন্ধ করে দেয় বিশ্বকাপ। 

বাংলাদেশের এই আবহ অবশ্য কাতারে নেই। সন্ধেয় ফ্যান জোনে, ফ্ল্যাগ প্লাজায় ভিড় করেন সমর্থকরা। সেখানেই রাতভর চলে হৈ-হুল্লোড়। উদযাপন। বাড়ির ছাদে, ব্যালকলিতে, রেলিংয়ে ভিন্ন দেশের পতাকা উড়তে দেখা গেল না তেমন একটা। তবে রাস্তার ধারে, মেট্রো স্টেশনে, বাসে, ক্যাবে বিশ্বকাপের ব্যানার, স্টিকার সাঁটা আছে বেশ। প্রথমবারের মতো কাতারে বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যেও কাজ করছে অন্যরকম রোমাঞ্চ। 

দোহার মিডিয়া সেন্টারে ঢোকার পথে দেখা নাদৌম খলিল নামের এক কুয়েতি সাংবাদিকের। কৌতূহলী হয়ে তিনি নিজেই বাংলাদেশ থেকে আসা গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিলেন। ইউরোপিয়ান ধাঁচে পোষাক পরা, গায়ে গেঞ্জি, পরনে হাফ-প্যান্ট। কৌতুহলবশত জিজ্ঞেস করা-এই পোষাকে কি তুমি কুয়েতে চলতে পার? তার উত্তর আরও কৌতুহল উদ্দীপক। 

“এখন তোমরা চাইলে সৌদি আরবেও এমন পোশাক পরে বাইরে বের হতে পারবে। অনেক কিছু বদলে যাচ্ছে। সবকিছু আর আগের মতো নেই। এখন ব্যাপারটা এমন, তুমি যদি আমাকে এই পোষাকে দেখতে না চাও, অন্যদিকে তাকিয়ে থাকো।” 

খলিলের দাবি এই ‘অন্য দিকে তাকিয়ে থাকার’ ব্যাপারটা করছে কাতারের প্রতিবেশী কিছু দেশ! সবাইকে টেক্কা দিয়ে মরুভূমিতে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজন তো নিশ্চিতভাবেই বড় এক কীর্তি। পৃথিবীর এই অংশ তো তেল সমৃদ্ধ ধনী দেশের অভাব নেই। তাই কাতারের এই জয়ে বাকি দেশগুলোর খচখচানি থাকাটাই স্বাভাবিক মনে করেন খলিল। 

“কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাকি দেশগুলোর মধ্যে ঈর্ষা আছে। কাতার সবার আগে পারছে (বিশ্বকাপ আয়োজন করতে), তারা কেন পারল না-এই মনোভাব তাদের মধ্যেও কাজ করছে।” 

কাতারের পারার কারণ জানাতে গিয়ে মধ্যবয়সী ওই সাংবাদিক জানালেন, পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগছে সর্বত্র। চিন্তা-চেতনায়, ধ্যান-ধারণার পিছিয়ে থাকা পুরনোদের জায়গা নিচ্ছে নতুনরা, তরুণের। তাদের কর্মস্পৃহা আর নিজেদের নতুন রূপে মেলে ধরার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষার ফল কাতার বিশ্বকাপ। 

“দেখো, কাতারে এই কাজগুলো তরুণেরা করেছে। যাদের সঙ্গে উপরের মহলের (রাষ্ট্রের) সম্পর্ক আছে, যোগাযোগ আছে। আমাদের এবং বাকিদের নেই বলে আমরা পারি না। তাছাড়া কাতার চায়, বিশ্বের বুকে নিজেদেরকে আরও শক্ত অবস্থানে তুলে ধরতে। এই মিডিয়া সেন্টারের কথাই ধরো, কী আলিশান আয়োজন করেছে ওরা।” 

একটুও বাড়িয়ে বলেননি ‍কুয়েতি ওই সাংবাদিক। কাতার আসলেই দেখিয়ে দিতে চাইছে-‘আমরাও পারি’। তা প্রমাণের যাত্রা শুরু হবে রোববার থেকে। ১৮ ডিসেম্বর লুসাইল স্টেডিয়ামের ফাইনাল পর্যন্ত প্রমাণ দেওয়ার এই পরীক্ষা চলবে। এরপরই মিলবে ‘সার্টিফিকেট।’ সফল হলে, নিশ্চিতভাবে ‘সলিমুল্লাহ, সলিমুল্লাহ’ কোরাসের সুরের স্রোত পারস্য সাগর পার হয়ে দারুণ এক বার্তা নিয়ে পৌঁছে যাবে বিশ্বের নানা প্রান্তে। ‘সলিমুল্লাহ, সলিমুল্লাহ’ কোরাসের এই সুর তখন আর শুধু কাতারের থাকবে না। হয়ে উঠবে সর্বজনীন। 

এই কোরাসের অর্থটা অবশ্য সর্বজনীনই, ‘মন্দটাকে ছুঁড়ে ফেল, ভালোটাকে বেছে নাও।’

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক